সূচনায় পড়লে ধরা, ক্যানসার রোগ যায় যে সারা

  অদ্বৈত মারুত

০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্যানসার শুধু রোগ নয়, একটি মরণব্যাধি। আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতির সঙ্গে এটির রয়েছে গভীর সম্পর্ক। ধূমপান, মদ্যপান যেমন ফুসফুস, মুখ ও কণ্ঠনালি এবং যকৃৎ বা লিভার ক্যানসারের কারণ, তেমনি পান-সুপারি, জর্দা, লাল মাংস, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ইত্যাদি খাবারও ক্যানসারের কারণ। এমনকি শারীরিক পরিশ্রম কম করলেও হতে পারে কর্কট রোগ। মরণঘাতী এ রোগ নিয়ে কথা হয় জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইয়াকুব আলীর সঙ্গে।

অদ্বৈত মারুত : ক্যানসার হওয়ার মূল কারণ কী?

ডা. ইয়াকুব আলী : ক্যানসার মূলত জিনগত একটি রোগ। এটি কখনো ভাইরাসের কারণে, কখনো রাসায়নিক বিকিরণসহ নানা কারণে ক্যানসার হতে পারে। ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে জিনের মিউটেশন ঘটে। কোষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কোষের আকার, আয়তন এবং আচরণে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এ কোষগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর মারা যায়। মৃত কোষের স্থানে জন্ম নেয় নতুন কোষ। সাধারণত কোষগুলো নিয়ন্ত্রিত এবং নিয়মমতো বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয়। এ কোষগুলো কোনো কারণে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকলে ত্বকের নিচে মাংসের দলা বা চাকা দেখা যায়, যার নাম টিউমার। এ টিউমার বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই হলো ক্যানসার। এ রোগের বিকাশপ্রক্রিয়ার গতি খুব ধীর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বছরের পর বছর সূর্যের আলোয় চামড়া পুড়লে তা এক সময় ত্বকের ক্যানসারের কারণ হতে পারে। ক্যানসার কোষে অন্তত তিন ধরনের জিন রয়েছে। যেমনÑ অনকোজিন এবং টিউমার সাপ্রেসর। এগুলো গাড়ির এক্সেলেরেটর ও ব্রেকের মতো কাজ করে। অনকোজিনের কাজ অনেকটা গাড়ির এক্সেলেরেটরে চাপ দিয়ে ধরে রেখে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো। ফলে কোষের বৃদ্ধি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। টিউমার সাপ্রেসর ব্রেকের মতো কাজ করে। যখন এ জিন কোনো কারণে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির হার তখন আর বন্ধ করা সম্ভব হয় না। সম্ভবত মাত্র একটি কোষের মাধ্যমে ক্যানসারের উৎপওি হয়ে থাকে। যথাসময়ে বিস্তৃতি আটকানো না গেলে পরিণামে মৃত্যু ঘটায়।

অদ্বৈত মারুত : এটি কি কোনো সংক্রামক ব্যাধি?

ডা. ইয়াকুব আলী : ক্যানসার সংক্রামক ব্যাধি নয়। এটি কোনো জীবাণুর মাধ্যমেও সৃষ্টি হয় না। ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান, হরমোন, তেজস্ক্রিয়তা, পেশা, অভ্যাস (ধূমপান, তামাক, সেবন, মদ্যপান, ইত্যাদি), সদা ঘর্ষণ, আঘাত, অতিরিক্ত প্রজনন এবং বিকৃত যৌনাচার, দূষিত বাতাস গ্রহণ ও পানি পান, খাদ্য (অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার), জীবনযাপন পদ্ধতি, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত প্রভাব, ‘প্যারাসাইট’ ও ‘ভাইরাস’ সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত ক্যানসার সৃষ্টির কারণ।

অদ্বৈত মারুত : বাংলাদেশ ক্যানসার রোগের প্রকোপ কি খুব বেশি?

ডা. ইয়াকুব আলী : বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক প্রায় দুলাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে থাকে।

অদ্বৈত মারুত : এ রোগ বেড়ে যাওয়ার বিশেষ কোনো কারণ আছে কী?

ডা. ইয়াকুব আলী : দেখুন, ক্যানসার বা কর্কট রোগটির ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরনো। প্রাচীন মিসর ও প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসকরা ক্যানসারের উপসর্গ বর্ণনা করে গেছেন। আজ থেকে ৩ হাজার বছর আগের মানবজীবাশ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আধুনিক বিজ্ঞানীরা ক্যানসারের লক্ষণও খুঁজে পেয়েছেন। এটির ইতিহাস মানবজাতির মতোই সুদীর্ঘকালের। তবে ক্যানসার হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার হতে পারে। ক্যানসার হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলোÑ আমাদের বদলে যাওয়া জীবনযাপন। এ কারণে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমে বাড়ছেই। অতিরিক্ত উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার, যেমনÑ ফাস্টফুড, খাবারতালিকায় ফাইবার জাতীয় খাদ্যের পরিমাণ কম রাখা ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বয়স্ক এবং শিশুদের মধ্যে স্থূলত্ব বা ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে (অতিরিক্ত পরিমাণে চিনিমিশ্রিত খাবার খাওয়া)। এটিও ক্যানসারের একটি কারণ। ধূমপান, পরিবেশ দূষণও ক্যানসার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

অদ্বৈত মারুত : আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত কোন ধরনের ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে?

ডা. ইয়াকুব আলী : পুরুষের ক্ষেত্রে মুখগহ্বর ও ফুসফুসের (এগুলো তামাক সম্পর্কিত ক্যানসার) ক্যানসার। এ ছাড়া লিউকেমিয়া, ব্রেইন, প্রস্টেট, হাড়, কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। নারীর ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার, জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। পিত্তথলির ক্যানসারের রোগীর সংখ্যাও কম নয়।

অদ্বৈত মারুত : ক্যানসারের লক্ষণগুলো কী কী?

ডা. ইয়াকুব আলী : অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ বা রস নিঃসরণ (প্রস্রাব বা মলের মধ্যে রক্ত, শরীরের কোনো অংশ থেকে রস নিঃসরণ, যেমনÑ স্তনবৃন্ত, লিঙ্গ ইত্যাদি); যে ক্ষত সারছে না (দীর্ঘদিন ধরে সারছে না, ক্রমে তা বড় হচ্ছে, ব্যথ্যা বাড়ছে, রক্তপাত হচ্ছে); মল ও মূত্রের পরিবর্তন (মলের আকার, পরিমাণ এবং রঙ পরিবর্তনÑ ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য হলে, মল ও মূত্রে রক্তের উপস্থিতি); স্তন বা শরীরের অন্য অংশে মাংসপি- দেখা দিলে (নিজে পরীক্ষা করে যদি স্তনে কোনো মাংসপি- পাওয়া যায়, অ-কোষে নিজে পরীক্ষার সময় যদি মাংসপি- পাওয়া যায়, শরীরের অন্য কোনো অংশে যদি মাংসপি- দেখতে পাওয়া যায়); খুসখুসে কাশি (যদি গলা বা স্বরে কর্কশ ভাব আসে, কাশি যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, কফের সঙ্গে যদি রক্ত আসে); আঁচিলের মধ্যে যদি কোনো পরিবর্তন আসে (আঁচিলের চারটি পরিবর্তনের ওপর নজর রাখতে হবে। যেমনÑ অসাম্য : আঁচিলটি এবড়ো-খেবড়ো কিনা; ধার : আঁচিলের ধার সুচালো না ফাটাফাটা; রং : আঁচিলটির রং কেমন; আকার : আঁচিলটির আকার একটি পেন্সিল ইরেজার থেকে ছোট না বড়); গিলতে কষ্ট (কোনো খাবার গিলতে গেলে গলা বা বুকে চাপ অনুভব করা, অল্প খাবার খেলে পেট ভার লাগা ইত্যাদি)।

অদ্বৈত মারুত : ক্যানসারের চিকিৎসা কী?

ডা. ইয়াকুব আলী : ক্যানসার চিকিৎসার মূলকথা হলোÑ ‘সূচনায় পড়লে ধরা, ক্যানসার রোগ যায় যে সারা’। অর্থাৎ শুরুতেই ধরা পড়লে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ক্যানসারের সার্বিক প্রতিরোধ, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা খুব জরুরি।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে