আল্ট্রাসনোগ্রাফির প্রয়োজনীয়তা

  অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ্

০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাউন্ড মানে শব্দ। কম্পমান বস্তু থেকে শব্দ উৎপন্ন হয়। শব্দ এক ধরনের শক্তি। আমরা শব্দ শুনতে পাই। কোনো উৎসে শব্দ উৎপন্ন হয়ে তা বাতাস বা অন্য মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঢেউ আকারে প্রবাহিত হতে থাকে। এ ঢেউ আমাদের কানে এসে পৌঁছলে আমরা শব্দ শুনতে পাই। সব শব্দই কিন্তু আমরা শুনতে পাই না। শব্দ উৎপন্ন করার সময় কম্পমান বস্তুটি প্রতি সেকেন্ডে কত সংখ্যক কম্পনের সৃষ্টি করে, তার ওপর নির্ভর করে শব্দটি আমরা শুনতে পাব কিনা। প্রতি সেকেন্ডে একবার কম্পন হলে তার নাম এক হার্জ (ঐবৎঃু)। এমন ২০ হার্জ থেকে ২০ হাজার হার্জ পর্যন্ত শব্দ আমরা শুনতে পাই। শব্দের কম্পাঙ্ক প্রতি সেকেন্ডে ২০ হার্জের কম হলে বা ২০ হাজারের বেশি হলে সে শব্দ আমরা শুনতে পাই না। ২০ হার্জের কম কম্পাঙ্ক হলে সে শব্দের নাম ইনফ্রাসাউন্ড। আর ২০ হাজারের বেশি কম্পাঙ্ক হলে সে শব্দের নাম আল্ট্রাাসাউন্ড। এ আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের ছবি তোলা যায়। এ পদ্ধতির নাম আল্ট্রাসাউন্ড ইমেজিং বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি কিংবা সনোগ্রাফি। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে আসলে বিশ হাজার হার্জের চেয়েও অনেক বেশি কম্পাঙ্কের শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ জন্য প্রয়োজন হয় একটি আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন বা স্ক্যানার। এ মেশিনে থাকে মাইক্রোফোন আকৃতির একটি ট্রান্সডিউসার বা প্রোব, যা একটি ক্যাবল বা তার দিয়ে মূল মেশিনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এ প্রোবটিতে বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে কম্পন সৃষ্টি করে অনেক বেশি হার্জের আল্ট্রাসাউন্ড উৎপন্ন করা হয়ে থাকে।

১৯৩০ সালের শেষদিকে অস্ট্রিয়ান চিকিৎসক উৎ. কধৎষ ঞযবড়ফড়ৎব উঁংংরশ মেডিক্যাল আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে মস্তিষ্কের টিউমার নির্ণয়ের ওপর গবেষণা করেন। তার এ গবেষণার ফল তিনি ১৯৪২ সালে এক গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেন। ১৯৪৭ সালের দিকে আমেরিকান চিকিৎসক উৎ. এবড়ৎমব খঁফরিম আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে পিত্তথলিতে পাথর নিরূপণ করতে সক্ষম হন। আর পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে স্কটল্যান্ডের চিকিৎসক চৎড়ভ. ওধহ উড়হধষফ আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহারিক প্রযুক্তি উন্নয়ন করে প্রসুতিবিদ্যায় এটির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করেন। আমাদের দেশে মেডিক্যাল আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে।

আল্ট্রাসাউন্ড বাতাসের ভেতর দিয়ে বা হাড়ের মতো শক্ত কঠিন পদার্থের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে না। শরীরের হাড় বা ফুসফুসের বাতাস ভেদ করে যেতে পারে না। শরীরের ত্বকে জেল লাগিয়ে তার ওপর প্রোবটি হাত দিয়ে ধরে বসালে এ আল্ট্রাসাউন্ড শরীরের ভেতর প্রবেশ করে। শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে এ শব্দ সাধারণ শব্দের মতো প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে সেই প্রোবটিতে। আল্ট্রাসাউন্ডের সেই প্রতিধ্বনি প্রোব থেকে ক্যাবল দিয়ে চলে যায় মূল স্ক্যানারে এবং সেখানে তা মনিটরের পর্দায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের চলমান ছবি হিসেবে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে ওঠে। আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানারের মনিটরটি দেখতে টিভির মনিটরের মতোই। এতে শরীরের ভেতরের কোনো অঙ্গে ক্ষত, পাথর, টিউমার, ফোড়া, পানি, রক্তপ্রবাহ ইত্যাদি ছবি হিসেবে ফুটে ওঠে। গর্ভবতীর গর্ভস্থ বাচ্চার অবস্থান, সংখ্যা, বাচ্চার নড়াচড়া ও শারীরিক অবস্থাÑ এসবও নির্ণয় করা যায় আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা রোগীর জন্য খুব উপকারী। এ পরীক্ষায় কোনো রেডিয়েশন নেই, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। রোগী কোনো ব্যথা পায় না। শরীরেরও কোনো ক্ষতি হয় না। খুব অল্প সময়ে এ পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়। আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার খরচও খুব কম।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান

কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ

কমিউনিটি বেজড্ মেডিক্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে