আপনার স্বর এবং সুরের যতœ নিন

  অনলাইন ডেস্ক

২০ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৬ এপ্রিল ছিল বিশ্ব কণ্ঠ দিবস। প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলÑ ঝযধৎব ণড়ঁৎ ঠড়রপব. ২০০৮ সাল থেকে আমাদের দেশে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশের ৩০ শতাংশ মানুষের ক্যানসার নাক-কান-গলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ স্বরকণ্ঠের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। যারা কণ্ঠ ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন (শিক্ষক, গায়ক, অভিনেতা, বিক্রয় প্রতিনিধি, আইন বিশেষজ্ঞ এমনকি রাজনীতিবিদ), তাদের কণ্ঠের মাধ্যমে মানুষের কাছে যেতে হয়। বিশ্ব কণ্ঠ দিবসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, কণ্ঠ ও কণ্ঠনালির সমস্যা দূরীকরণ এবং সেই সঙ্গে কীভাবে তা সুস্থ রাখা যায়, সে সম্পর্কে জানানো। এ নিয়ে লিখেছেনÑ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক-কান-গলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান তরফদার এবং আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজের নাক-কান-গলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী

শব্দযন্ত্রের মাধ্যমে কথা বলা : মানুষের গলার সামনে ল্যারিংস বা শব্দযন্ত্র অবস্থিত। এতে দুটি ভোকাল কর্ড থাকে। এ কর্ডের মাধ্যমে শব্দ তৈরি হয়। শ্বাস- প্রশ্বাসের সময় ফুসফুস থেকে প্রবাহিত বাতাস ভোকাল কর্ডে কম্পনের সৃষ্টি করে। কথা বলা বা গান গাওয়ার সময় এর পরিমাণ প্রতি সেকেন্ডে ১০০ থেকে ১ হাজার বার । একজন বয়স্ক মানুষ দিনে এক মিলিয়ন বার ভোকাল কর্ড দুটির সংস্পর্শে আসে। তাই কণ্ঠ সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখা প্রয়েঅজন।

কণ্ঠনালির সমস্যার কারণ : সমস্যার উপকরণগুলো হলোÑ গলাব্যথা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, কাশি, কিছু গিলতে অসুবিধা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। যদি ঘন ঘন কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয় এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে ভালো না হয়, তা হলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।

কণ্ঠনালির যত সমস্যা : বিভিন্ন কারণে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন হতে পারে। যেমনÑ

কণ্ঠনালির প্রদাহ : এ প্রদাহ দুধরনের। যেমনÑ তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি ল্যারিনজাইটিস। কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের প্রধান কারণ কণ্ঠনালির ভাইরাসজনিত তীব্র প্রদাহ। শ্বাসনালির ভাইরাস প্রদাহে কণ্ঠনালি ফুলে যায়, যা কণ্ঠনালির কম্পনে সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে স্বর পরিবর্তন হয়। আবহাওয়া পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণেও কণ্ঠনালির প্রদাহ হতে পারে। প্রচুর পানি পান এবং কণ্ঠনালি বিশ্রাম পেলে তা ভালো হয়ে যায়। তীব্র প্রদাহ অবস্থায় জোরে কথা বললে কণ্ঠনালির ওপর চাপ পড়ে। যেহেতু তীব্র কণ্ঠনালির প্রদাহ ভাইরাসজনিত, তাই অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না। যদি ব্যাকটেরিয়ার কারণে কণ্ঠনালিতে ইনফেকশন ও শ্বাসকষ্ট হয়, তখন চিকিৎসা দরকার। পূর্ণমাত্রায় সঠিক অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে। তীব্র কণ্ঠনালি প্রদাহে ঠিকমতো চিকিৎসা না করালে দীর্ঘমেয়াদি ল্যারিনজাইটিস হতে পারে। পাকস্থলীর অ্যাসিড রিফলাক্সের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কণ্ঠনালির প্রদাহ হতে পারে। ধূমপান, অতিরিক্ত চা বা পানীয় পান করলে, হাঁপানির জন্য ইনহেলার ব্যবহার বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের দীর্ঘমেয়াদি ল্যারিনজাইটিস হতে পারে।

ভোকাল কর্ড অপব্যবহারের কুফল : অধিক জনসমাবেশে ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে জোরে কথা বলা, অতিরিক্ত এবং দীর্ঘ সময় ফোনে কথা বলা, ঘাড় ও কানের মাঝে ফোন চেপে ধরে কথা বলায় ঘাড় ও শব্দযন্ত্রের মাংসপেশিতে টান লাগে। উচ্চৈস্বরে বা চিৎকার করে কথা বলা, জনসমাবেশে বা বড় ধরনের লেকচার গ্যালারিতে মাইক ছাড়াই জোরে কথা বললেও ভোকাল কর্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা কণ্ঠস্বরের জন্য ক্ষতিকর।

কণ্ঠস্বরের অতিব্যবহার : কথা বলার সময় কণ্ঠনালির সঙ্গে আশপাশে অবস্থিত মাংসপেশিরও সাহায্য লাগে। কণ্ঠনালির সঠিক ও নিয়মের বাইরে ব্যবহার করা, অতি উচ্চৈস্বরে অতিরিক্ত কথা বলা, দীর্ঘমেয়াদি বা পরিবর্তিত স্বরে কথা বললে কণ্ঠনালির প্রদাহ হতে পারে। গলা ও শব্দযন্ত্রের মাংসপেশির সংকোচন এবং কথা বলার সময় ঠিকমতো শ্বাস না নিলে শ্বসযন্ত্রের অবসাদ হয়, কথা বলতে কষ্ট হয়। ফলে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হতে পারে এবং ভোকাল কর্ডে পলিপ বা নডিউল এমনকি রক্তক্ষরণ হতে পারে।

কম ক্ষতিকারক কণ্ঠনালির রোগ : বার বার অথবা দীর্ঘমেয়াদি কণ্ঠনালির অপব্যবহারে যে ক্ষতি হয়, তা পরে কণ্ঠনালির কম্পন মাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে। এতে পলিপ, নডিউল বা সিস্ট হতে পারে। নডিউল সাধারণত কণ্ঠশিল্পীদের বেশি হয়। রাজনীতীবিদ, শিক্ষক, আইনজীবী, বেশি সন্তানের জননী, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার ছাত্র ও হকারদের মধ্যে এ রোগ হতে পারে। চিকিৎসা হলোÑ অপারেশন। যেমনÑ মাইক্রোলেরিংগোসকপি ও ভয়েস থেরাপি।

ভোকাল কর্ড প্যারালাইসিস : ভোকাল কর্ড বা ল্যারিংস নার্ভের দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো সমস্যায় কণ্ঠনালি পরিবর্তন হতে পারে। ভাইরাসজনিত প্রদাহে নার্ভ দুর্বল হয়ে পড়ে। সাধারণত একদিকের নার্ভেই প্যারালাইসিস হয়। দুদিকের নার্ভ একইসঙ্গে আক্রান্ত হয় না। একদিকের নার্ভ প্যারালাইসিসের কারণÑ বাইরাস ইনফেকশন, টিউমার, ক্যানসার ও থাইরয়েড অপারেশন। কণ্ঠনালির প্যারালাইসিসের জন্য ফেসফেসে আওয়াজ হয়। এটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। কয়েক মাসের মধ্যে একদিকের প্যারালাইসিস ভালো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ প্যারালাইসিস ভালো হয় না। তখন উত্তম চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

কন্ঠনালীর ক্যান্সারঃ আমাদের দেশে গলার ক্যান্সার বা কণ্ঠনালির ক্যান্সারের প্রকোপ অনেক বেশি। গলার স্বর পরিবর্তনের পনের (১৫) দিনের মধ্যো ভালো না হলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া দরকার। রোগীর ইতিহাস প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার নির্নয় করা গুরুত্বপূর্ণ। গলার ক্যান্সার বা কন্ঠনালীর ক্যান্সারকে মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়। কারন কন্ঠনালীর ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্নয় করে চিকিৎসা করলে সম্পূর্ন ভালো হয়ে যায়এবং এ রোগের সব ধরনের চিকিৎসা যেমন- সার্জারী, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি আমাদের দেশে বিদ্যমান।

স্বর সুরক্ষায় করণীয় : গলা জোড়ে বা বেশি চাপ দিয়ে পরিষ্কার করা থেকে বিরত থাকুন। যতটা সম্ভব কাশি দেওয়া এড়িয়ে চলুন। নিচুস্বরে স্পষ্ট করে কথা বলুন। চিৎকার বা উচ্চৈস্বরে কথা বলা এড়িয়ে চলুন। রেডিও বা টেলিভিশন দেখা বা শোনার সময় কম ভলিউমে শুনুন। মিউজিক কনসার্টে উপস্থিতির সময় কানে ইয়ার প্লাগ বা তুলা ব্যবহার করুন। ব্যায়ামের সময় বিশেষ করে ভারোত্তলন বা এ জাতীয় ব্যায়ামের ক্ষেত্রে ঘরে বাতাস চলাচলের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখুন। প্রচুর পানি পান করুন, যাতে স্বরযন্ত্রে পানিশূন্যতা দেখা না দেয় (দৈনিক কমপক্ষে ৮ গ্লাস পানি পান করুন)। ধূমপান থেকে নিজেকে বিরত রাখুন এবং ধোঁয়া পরিবেশ থেকে দূরে থাকুন। হঠাৎ করে যদি স্বরের পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, তা হলে দ্রুত নাক-কান-গলা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যদি লক্ষ্য করেন, ক্রমে আপনার স্বর পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু দুসপ্তাহের মধ্যে কণ্ঠস্বর উন্নত হচ্ছে না, তা হলে তাড়াতাড়ি নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যদি কথা বলতে গিয়ে বা গান করতে গিয়ে লক্ষ্য করেন, আপনার স্বর কর্কশ রূপ ধারণ করেছে বা অসুবিধা হচ্ছে, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে অন্তত সাতদিনের জন্য কথা বলা বন্ধ রাখুন।

শিল্পীদের জন্য অতিরিক্ত করণীয় : অনুষ্ঠান শুরুর আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন। প্রয়োজন না হলে আপনার স্বর বিশ্রামে রাখুন। কথা বলার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিন (যদি ইতোমধ্যে না নিয়ে থাকেন)। অভিনেতা বা অভিনেত্রীরা আবেগপূর্ণ ভাষা এবং আবেগ প্রকাশের সময় সতর্ক থাকুন। আপনার কণ্ঠের জন্য ভালোÑ এমন কৌশল অবলম্বন করুন। কারণ আপনার পেশার সাফল্য নির্ভর করে সুন্দর কণ্ঠের ওপর। কণ্ঠের সুরক্ষার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। আপনার কণ্ঠের যে কোনো সমস্যার শুরুতেই নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে যথাযথ পরামর্শ গ্রহণ করুন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে