ডায়াবেটিস ও গর্ভধারণ এবং করণীয়

  ডা. শাহজাদা সেলিম

১৯ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সন্তান গর্ভে ধারণ মায়ের জন্য একটি বড় ঘটনা। এটি স্ট্রেসেরও কারণ। এ সময় মায়ের স্বাভাবিক দৈহিক মিথস্ক্রিয়া, হরমোনের পরিমাণ, এ কারণে উদ্দীপনা এবং এটির গভীরতার তারতম্য হয়। গর্ভস্থ শিশু নিজেই একটি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির (হরমোন নিঃসরণকারী গ্রন্থি) মতো আচরণ করে। প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে নিঃসৃত হয় হরমোনÑ এইচসিজি, এইচপিএল, ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন ও মায়ের দেহনিঃসৃত স্টেরয়েড ও প্রোটিন হরমোন ইত্যাদি মিলে মায়ের ওপর ডায়াবেটিস হওয়ার অনুকূলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় অংশে (৩-৬ মাস) সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে শর্করা বিপাকের ওপর। এ সময় অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণের হার কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু অনেকেরই ইনসুলিনের কার্যকারিতা বহিস্থ কোষগুলোয় বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। তাই সন্তান গর্ভধারণ ইনসুলিনের মজুদের ওপর এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে বাচ্চার বৃদ্ধিতে সহায়তা হয় এবং বাচ্চার জন্য গ্লুকোজের সরবরাহও বাড়ে। গর্ভাবস্থার শেষ দিকে এটি দূরীভূত হয়। কারো কারো শুধু গর্ভধারণকালেই রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকে। এর আগে তা হয়তো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে আগে থেকেই টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভোগার ইতিহাস থাকতে পারে।

গর্ভধারণকারীর রক্তে গ্লুকোজ পরিমাপের জন্য যে বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করা হয়, তার নাম জিটিটি (গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট)। এতে প্রথমে খালি পেটে গর্ভধারণকারীর রক্ত ও মূত্র নিয়ে গ্লুকোজের পরিমাণ দেখা হয়। এরপর ৫০ গ্রাম গ্লুকোজ ২০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পান করার (৫ মিনিট ধরে) ২ ঘণ্টা পর আবার রক্ত ও মূত্র নিয়ে তাতে গ্লুকোজের পরিমাণ দেখা হয়। খালি পেটে (কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পর) রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক পরিমাণ ৩.৫ থেকে ৫.৫ মিলিমোল/লিটার; ৫০ গ্রাম গ্লুকোজ ২০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পাঁচ মিনিট ধরে খাবার ২ ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক পরিমাণ হবে ৭.৮ মিলিমোল/লিটারের কম। যদি খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ৫.৫ থেকে ৬.৯ মিলিমোল/লিটার বা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাবার ২ ঘণ্টা পর ৭.৮ থেকে ১১.১ মিলিমোল/লিটার হয়, তাকে বলা হবে গ্লুকোজ অসহিষ্ণুতা (ওসঢ়ধৎবফ এষঁপড়ংব ঞড়ষবৎবহপব)। গর্ভধারণের চিন্তা-ভাবনা শুরু করার প্রথম থেকে নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা উচিত। আর গর্ভধাণের পর অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে। গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহ সময়ের মধ্যে বিশেষভাবে ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করতে হয়।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে মা ও শিশুÑ উভয়ের জন্যই অনেক ক্ষতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।

মায়ের ঝুঁকি : মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যায়। হার্ট ফেইলিউর ছাড়াও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

গর্ভস্থ শিশুর ঝুঁকি : উন্নত বিশ্বে এটি কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও আমাদের দেশে এখনো ডায়াবেটিস রোগীর বাচ্চাদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। মরা বাচ্চা প্রসব ও অস্বাভাবিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ বাচ্চা জন্মানোর হার বেশি; কোনো কোনো শিশুর হৃৎপি- ঠিকমতো গঠিত হয় না, কারো কারো মাথা ছোট হয়, মেরুদ- নিচের দিকে জোড়া লাগানো থাকে না, ঠোঁট কাটা, ওপরের তালু কাটা, মলদ্বার তৈরি না হওয়াসহ বিবিধ সমস্যা দেখা যায় এসব শিশুর। যে কোনো সময় বাচ্চা প্রসব হয়ে যেতে পারে। মায়ের পেটে বাচ্চার মৃত্যু ঘটতে পারে। বাচ্চার ওজন অস্বাভাবিক রকম বেশি হয়। এসব শিশু পরবর্তীকালে দৈহিক স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও বিভিন্ন ধরনের স্নায়ুরোগে ভোগে।

চিকিৎসা : প্রথমেই গর্ভবতীকে খাদ্যগ্রহণ সম্পর্কে আশঙ্কা আছে, এমন মায়ের জন্য বিশেষ ধরনের ব্যবস্থাপত্র দিতে হবে, অর্থাৎ গর্ভধারণকালের মধ্যে মোট ১০ কেজি ওজন বৃদ্ধি অনুমোদন করা যাবে অর্থাৎ প্রতিমাসে .৪৫ কেজি ওজন বৃদ্ধি। এ জন্য প্রতিদিন তাকে মোট খাদ্যের ৪০-৪৫ শতাংশ শর্করা (১৫০-২০০ গ্রাম), ১৮-২০ শতাংশ আমিষ (৭৪ গ্রাম) এবং চর্বি জাতীয় খাদ্য ৩০ শতাংশের কম খেতে হবে। আদর্শ খাদ্যগ্রহণ যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দিতে হবে আর সমগ্র খাবার ৬ ভাগ করে প্রতিদিন খেতে হবে। প্রচুর ফলমূল খেতে হবে ।

গর্ভধারণকারী নারীর ডায়াবেটিস চিকিৎসা করতে গিয়ে কখনো তাকে মুখে খাবার ওষুধ দেওয়া যাবে না। তার জন্য একটাই ওষুধÑ ইনসুলিন। যাদের গর্ভধারণের আগে থেকেই ডায়াবেটিস ছিল এবং তারা মুখে খাবার ওষুধ খেয়ে ভালো ছিলেন, তাদেরও ইনসুলিন শুরু করতে হবে গর্ভধারণ করার পর থেকেই। সম্ভব হলে বাচ্চা পেটে আসার আগে থেকেই তা করতে হবে। ইনসুলিন নিলে কারো কারো হাইপোগ্লাইসিমিয়া হতে পারে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এবং বাচ্চা প্রসব ও প্রসব-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক ও দক্ষতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি।

গর্ভকালীন যাদের প্রথম ডায়াবেটিস ধরা পড়ল, তাদের ৫০ শতাংশের বেশি পরবর্তী এক বছরের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীতে পরিণত হবেন। ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে যদি রক্ত পরীক্ষা না করা হয়, তবে হয়তো কোনোভাবেই সন্দেহ করার মতো কোনো লক্ষণ দেখা যাবে না। কিন্তু রক্ত পরীক্ষা করলেই তাদের ডায়াবেটিস আছে বলে প্রতীয়মান হবে। গর্ভবতীর ডায়াবেটিস শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি বড় হুমকি। তাই এটি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য মা-বাবাসহ সবাইকে জানানো জরুরি।

লেখক : হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ

সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

চেম্বার : কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার

গ্রিনরোড, ঢাকা । ৮১২৪৯৯০, ০১৯১৯০০০০২২

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে