নতুন স্বর নির্মাণের কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ

  মামুন রশীদ

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ষাট দশকের কবি- আবদুল মান্নান সৈয়দ। শুরুতেই চমকে দিয়েছিলেন বাংলা কবিতার পাঠক। কারণ তার পরাবাস্তব কবিতা। আবদুল মান্নান সৈয়দ বলতেই জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ বা পরাবাস্তব কবির তকমা আঁটা একটি অবয়ব ভেসে ওঠে। তবে নির্দিষ্ট গ-িতে তিনি নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। প্রতিনিয়ত নদীর পাড় ভাঙার মতো নিজেকে ভেঙেছেনÑ নতুন করে নির্মাণ করেছেন। আর এই ভাঙা, নির্মাণের মধ্য দিয়েই প্রতিভাষিত হয়েছে তার বহুমাত্রিকতা। ষাটের দশকে বাংলাদেশের কবিতায় যে রাজনীতিমুখিতা, উচ্চস্বর, স্লোগান- শিল্পের বিচারে তা কখনো কখনো মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া, এর কোনো কিছুই আবদুল মান্নান সৈয়দকে ছুঁয়ে যায়নি। তিনি বরং কবিতা-ধ্বনির মধ্যে স্থির, একটি নতুন স্বর নির্মাণ, বাঁক ফেরানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। যার ফসল জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ। বাংলা কবিতার প্রথম আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পর বাংলা কবিতা থেমে থাকেনি। এগিয়েছে- বাংলা কবিতার সেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে কারণ, কবিরা তাদের কবিতায় পরিবর্তনের দিকে নজর দিয়েছেন। আঙ্গিকের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাতন্ত্র প্রমাণের জন্য সচেষ্ট থেকেছেন। ফলে এগিয়েছে বাংলা কবিতা। কারণ বিষয়গত দিক থেকে বাংলা কবিতার যে অগ্রগতি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশসহ ত্রিশের অন্যান্য কবির হাতে, তার থেকে বাইরে আসা আর সম্ভব হয়নি বললেই চলে। আমাদের যা কিছু স্বাতন্ত্র্যতা তা আঙ্গিককে ঘিরেই। এক্ষেত্রে আবদুল মান্নান সৈয়দ তার ভঙ্গিটি বাংলা কবিতার পাঠকদের চিনিয়েছেন পরাবাস্তব কবিতার মধ্য দিয়ে। কবিতায় তিনি যে প্রতিভা এবং পরিশ্রম ঢেলেছেন, নির্মাণ করেছেন নিজেকে, সেখানে পাঠক-সমালোচক তাকে দেখেছে পরাবাস্তবতার আয়নায়। উপমা, চিত্রকল্প, শব্দব্যবহার এবং পঙ্ক্তি নির্মাণে তিনি নিঃসন্দেহে নতুনত্ব দিয়ে ভুলিয়েছেন পাঠক। যা তাকে সার্বভৌম কবি হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। আবদুল মান্নান সৈয়দ সচেতনভাবে যেমন পরাবাস্তব কবিতা লিখেছেন, তেমনি প্রেমের কবিতাও লিখেছেন। প্রেমকে তিনি জীবনের অপরিহার্য উপাদান হিসেবেই দেখেছেন। প্রেমের শাশ্বত রূপ তার কাছে ধরা দিয়েছে চিরন্তন ও সর্বজনীন হয়ে। তার কবিতা স্পর্শযোগ্য। মনকে আবেগে আপ্লুত করে। জীবনকে, বাস্তবকে তিনি শব্দে রূপ দেন। তাই পরাবাস্তব কবিতায়Ñ বিশেষত জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছে তিনি যেমন কবিতা থেকে ব্যক্তি আমিকে আড়াল করে ফেলেন, ফলে আমিত্ব থাকলেও পাঠক সেখানে ব্যক্তি আবদুল মান্নান সৈয়দকে খুঁজে পায় না। খুঁজে পায় রহস্যময়তা, খুঁজে পায় দুর্বোধ্য এক আবদুল মান্নান সৈয়দকে। কিন্তু এক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তার প্রেমের কবিতা। এখানে তিনি অবলীলায় নিজেকে উন্মোচন করেন। কোনো কুয়াশা, কোনো আড়াল তাকে আচ্ছন্ন করে না।

প্রেমের কবিতা রচনায় আবদুল মান্নান সৈয়দের কাব্যভাষায় অলঙ্কারের আতিশয্য নেই, বরং তিনি সরল এবং গতিশীল। তবে আগাগোড়াই শব্দ প্রয়োগে তার সংযমী ও রুচিশীল ভাব বজায় থাকে। তার প্রেমের কবিতামাত্রই আবেগাক্রান্ত। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি (আবদুল মান্নান সৈয়দ) অনন্ত আবেগাক্রান্ত না হয়ে কবিতা লিখতে পারি না- এবং নিরাবেগ কবিতাকে কবিতা হিসেবে মূল্য দিতে চাই না।’ (সুহিতা সুলতানা ও রনক মুহম্মদ রফিক সম্পাদিত ষাটজন কবির কাব্যচিন্তা, ১৯৯৫)। প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে এই আবেগকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন আরও বেশি করে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছে’ ‘গাধা এবং আমি’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন,

‘আমাকে তিনটি স্তনের একজন

মেয়ে মানুষ তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ এই

তাড়ানো নারী প্রেমে এবং শরীরী

বাসনাকেই তিনি প্রেমের কবিতার উপজীব্য

করেছেন। তার ‘প্রেম ভোগেরই নামান্তর’।

তিনি নিঃসঙ্কোচে যেমন যৌনচেতনাগন্ধি শব্দ ব্যবহার করেছেন, তেমনি আত্মস্বীকারোক্তিতে প্রেম ও নারীকে বর্ণনা করেছেন। সেখানে অন্তর্মুখিতা নয় বরং বিব্রতিমূলক ও আত্মস্বীকারোক্তিই হয়ে উঠেছে তার প্রেমের কবিতা। নারীর দৈহিক সৌন্দর্যকেই তিনি অনাবৃত করেছেন শব্দের খেলায়। সেখানে অপ্রাপ্তিজনিত হতাশাবোধ যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাপ্তির আনন্দ। তাই তার প্রেমের কবিতা হয়ে ওঠে কামনা-বাসনার নিবিষ্ট প্রকাশ। বাংলাদেশের ষাটের দশকের কবিদের ভেতর নারীর রূপের গুণগান তেমন নেই, যতটা আছে শরীরী বর্ণনা। অস্থিরতা থেকে গভীরতাবোধ জাগে না, বরং তখন তাৎক্ষণিক প্রাপ্তিই সন্তুষ্ট করে। সেক্ষেত্রে কবিদের বর্ণনাতেও উঠে এসেছে সম্ভোগ-ইচ্ছা। আর সেক্ষেত্রে রূপ নয়, শরীরই প্রধান হয়ে উঠেছে। আর সে শরীরও উঠে এসেছে আত্মনির্মাণের তাগিদ থেকে। আবদুল মান্নান সৈয়দও ব্যতিক্রম নন। বরং এ দশকের অন্যদের তুলনায় তিনিই নারীকে কামজ করে তুলেছেন, তিনি সচেতনভাবে নারীকে রমণীয় করে তুলেছেন। নারী ও রমণী শব্দের চেতনাগত পার্থক্য সম্পর্কেও তিনি ছিলেন সজাগ। আবদুল মান্নান সৈয়দ শুরু থেকেই সচেতন নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে। সেই সচেতনতা থেকেই তিনি নিজেকে পাল্টেছেন। তিনি যেমন শুরু করেছিলেন জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ দিয়ে।

আবদুল মান্নান সৈয়দ নামটি আজ শুধুই কবিতায়, শুধু তার সৃষ্টিতে। শরীরে না থেকেও তিনি রয়ে গেছেন কবিতার মাঝে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে