আরাকানে বাংলা সাহিত্য

  আলম তালুকদার

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আরাকান? কোথায়? শুনেই খাড়াকান। তাই না? চলেন ঘুরে ঘুরে একটু দূরে মানে ভাটিতে যাই না। গাড়িতে গাড়িতে বা হাঁটিতে হাঁটিতে টেকনাফ। থামেন। দিবেন না লাফ। ভালো নয় ওদিকের মনোভাব। আমাদের পরিচিত আরাকান আর নেই। ওখানে যারা ছিলেন বা এখনো আছেন, তারা তাড়া খেয়ে নিত্য মারা যান। অর্থাৎ যেখানে ছিল আরাকানি তারা সু চির আঘাতে মারা যানই!

তো আমার আলোচনা হলো ওই আরাকানে এক সময় বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা হয়েছিল। যখন পৃথিবীর মানুষরা এত কঠিন নিষ্ঠুর আধুনিক ছিল না। তখন নোবেলের বেইল উঠেনি। তখন ওই খানে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা হয়েছিল। আবার সেই সাহিত্য শুধু রাজাগোজাদের নিয়ে লেখা নয়, সেটা সাধারণ মানব-মানবীর জীবনকে নিয়ে রচিত হয়েছিল। এসব তথ্য গবেষকগণ কঠিন গবেষণা করে বের করেছেন। এই গবেষণার পুরোধা ব্যক্তি হলেন, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে আরাকানের মুসলিম সংস্কৃতি বাংলাদেশের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র হলেও মানবিক চেতনায় তা ছিল অনেকভাবেই সমৃদ্ধ।

আমরা ‘মগের মুল্লুক’ এই শব্দটির সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। মগেরা এই আরাকানের বাসিন্দা ছিল। তারা একসময় যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে ডাকাতি, অত্যাচার, লুণ্ঠন চালাতো। আমাদের একটা কৌতূহল থাকতে পারে, এই মগের মুল্লুকে কিভাবে সাহিত্য চর্চা হতে পারে? বাংলাসাহিত্যে এই আরাকানকে ‘রোসাং’ বা ‘রোসাঙ্গ’ নামে বলা হয়েছে। বার্মার উত্তর-পশ্চিম সীমায় এবং টেকনাফের সঙ্গে সমুদ্রের তীরে এই রোসাং। রোসাং এলাকায় যারা বসবাস করে তাদের রোহিঙ্গা বলা হয়। আরাকানিরা তাদের ভাষায় রোসাংকে ‘রখইঙ্গ’ নামে অভিহিত করত। ‘রক্ষ’ শব্দ হতে এই শব্দটির উৎপত্তি বলে জানা যায়। ওদের ভাষায় ‘রখইঙ্গ’ শব্দের মানে ‘দৈত্য বা রাক্ষস’। আর সে কারণেই ওই দেশকে ‘রখইঙ্গ তঙ্গী’ বা রাক্ষসভূমি বলা হতো। বলা হয় এই ‘রখইঙ্গ’ হতেই ‘রোসাঙ্গ’ শব্দের উৎপত্তি। আবার ঐদিকে আইন-ই-আকবরীতে এই দেশকে ‘আকরঙ’ নামে অভিহিত করেছে। ড. মুহম্মদ এনামুল হক এই ‘রখইং’ শব্দের ইংরেজি অপভ্রংশ ‘আরাকান’ বলে পরিচিত বলে জানিয়েছেন। আরাকানের অধিবাসীরা সাধারণভাবে বাংলাদেশে ‘মগ’ নামে পরিচিত। এই ‘মগ’ বা ‘মঘ’ শব্দটি ‘মগধ’ শব্দজাত এবং শব্দটি আরাকানি ও বৌদ্ধ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বিবেচিত।

ইতিহাস বলে, খ্রিস্টীয় অষ্টম-নবম শতাব্দীতে আরাকানরাজ মহতৈং চন্দয় (৭৮৮-৮১০) এর আমলে আরবীয় বণিকরা বাণিজ্য করতে আসা শুরু করেন এবং তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের মাধ্যমে প্রথমে ওই এলাকায় ইসলাম প্রচার শুরু হয়। একই সময়ে চট্টগ্রামেও ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছিল। ফলে ধর্মীয় বন্ধনে উভয় এলাকার লোকের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধনের সূত্রপাত হয়। গবেষকদের মতে ওই সময় আরাকানরাজারা দেশধর্মের প্রভাবের ঊর্ধ্বে একটি সর্বজনীন সংস্কৃতির অধিকারী হয়েছিলেন এবং সেখানে ছিল মুসলমানদের ব্যাপক প্রভাব। মেঙৎ-চৌ-মৌন-এর আমলে ১৪৩০ থেকে ১৪৩৪ সাল পর্যন্ত রোসাঙ গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দিন শাহর করদরাজ্য রূপে বিদ্যমান ছিল।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে মূল বার্মা হতে এটা কেন স্বাধীন রাজ্য ছিল? কারণ বার্মার মূল ভূখ- ও আরাকানের মধ্যে আছে দুরতিক্রম্য পর্বত। এই পর্বতই আরাকানের স্বাতন্ত্র ও স্বাধীন সত্তার এবং সমুদ্রসান্নিধ্য তা সমৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ইতিহাস বলে, একসময় আরাকানরাজ নরমিখলা বার্মা রাজার ভয়ে ১৪৩৩ সালে চট্টগ্রামের রামু বা টেকনাফের শত মাইলের মধ্যে অবস্থিত ‘মোহঙ’ নামক স্থানে তার রাজধানী স্থাপন করেন। সে সময় থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত তিনশ বছর ‘মোহঙ’ আরাকানের রাজধানী ছিল। এই ‘মোহঙ’ শব্দ হতেই রোসাঙ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।

রোসাঙের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। এই সময় থেকে তারা নিজেদের বৌদ্ধ নামের সঙ্গে এক একটি মুসলমান নাম ব্যবহার করতেন। তাদের প্রচলিত মুদ্রার একপিঠে ফারসি অক্ষরে কলেমা ও মুসলমানি নাম লেখার রীতিও প্রচলিত ছিল। ইসলামী নামের নমুনা; কলিমা শাহ, সুলতান সিকান্দর শাহ, সলীম শাহ, হুুসেন শাহ প্রভৃতি। মোট কথা ১৪৩৪ হতে ১৬৪৫ পর্যন্ত দুই শতাধিক বৎসর ধরে আরাকান রাজাগণ মুসলমানদের ব্যাপক প্রভাব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ড. মুহম্মদ এনামুল হক তার ‘মুসলিম বাঙ্গলা সাহিত্য’ গ্রন্থে মনতব্য করেছেন যে, ‘এই শত বৎসর ধরিয়া বঙ্গের (মোগল-পাঠান) মুসলিম রাজশক্তির সহিত স্বাধীন আরাকান-রাজগণের মোটেই সদ্ভাব ছিল না, অথচ তাহারা দেশে মুসলিম রীতি ও আচার মানিয়া আসিতেছেন। ইহার কারণ খুঁজিতে গেলে মনে হয়, আরাকানি মঘসভ্যতা, রাষ্ট্রনীতি ও আচার ব্যবহার হইতে বঙ্গের মুসলিম-সভ্যতা রাষ্ট্রনীতি ও আচার-ব্যবহার অনেকাংশে শ্রেষ্ঠ ও উন্নত ছিল বলিয়া আরাকানি রাজগণ বঙ্গের মুসলিম প্রভাব হইতে মুক্ত হইতে পারেন নাই’।

বাঙালি মুসলমানরা আরাকানে সেনাবাহিনী হতে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজপদে নিযুক্তি লাভ করেছিলেন। রাজারা বৌদ্ধ হলেও তাদের অভিষেক মুসলিম প্রধানমন্ত্রীর দ্বারাই সম্পন্ন হতো।

এই প্রভাব সপ্তদশ শতাব্দীতে চরমে উঠে। আরাকানের রাজাদের মধ্যে মেঙৎ-চৌ-মৌন, থিরি-থু- ধুম্মা (শ্রীসুধর্মা) নরপদিগ্যি (নৃপতিগিরি বা নৃপগিরি), সান্দ থুধম্মা (চন্দ্র সুধর্মা), থদো মিন্তার (সাদ উমাদার) প্রভৃতি রাজার সভায় মুসলমানরা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আরাকানে মুসলমান প্রভাব সম্পর্কে লস্কর উজির আশরাফ খানের প্রসঙ্গে দৌলত কাজীর মন্তব্য স্মরণযোগ্য।

“মসজিদ পুস্কর্নী ছিল বহুবিদ দান

মক্কা মদিনাতে গেল প্রতিষ্ঠা বাখান

সৈয়দ, কাজী, সেক, মোল্লা, আলিম ফকির

পূজেন্ত সে সবে যেন আপন শরীর।

বৈদেশী, আরবী, রুমী, মোগল, পাঠান

পালেন্ত সে সবে যেন শরীর সমান”।

আরাকানের মগরাজারা বাংলা ভাষায় কতটুকু বুৎপন্ন ছিলেন তা নিশ্চিত জানা না গেলেও তাদের পৃষ্ঠপোষকতাই মুসলমান কবিগণ কাব্যরচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং তাদের এই উদারতার কারণে বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য নিদর্শন।

ড. আহমদ শরীফ মন্তব্য করেছেন, ‘তাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রয়োজন পূর্তির জন্য, মানসচাহিদা পূরণের জন্য, মনের রসতৃঞ্চা মিটানোর জন্য সেখানে গুণীজন দিয়ে গান-গাথা-রূপকথা-প্রেমকথা জানানোর, রসকথা শুনানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে, সৃজনশীল কেউ কেউ নতুন সৃষ্টি দিয়ে তাদের রসতৃঞ্চা নিবৃত্ত করেছে’।

মুসলমান প্রভাবকে আরাকানের বৌদ্ধরাজরা তখনকার সময়ে খুব সহজে গ্রহণ করেছিলেন বলে তাদের সভাসদকর্তৃক বাংলা সাহিত্যচর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা দান সম্ভব হয়েছিল। ওই সময় তথাকথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সু চিদের মতো রাজা থাকলে কী হতে পারতো একবার ভাবেনতো?

ওই সময়ে দৌলত কাজী রচনা করেন, ‘সতীময়না’। কবি মরদন রচনা করেন ‘নসীরানামা’ প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের সহযোগিতায় কবি আলাওল ‘পদ্মাবতী’ কাব্য রচনা করেন। তারপর রচনা করেন, সপ্তপয়করনামা’, ‘সেকান্দরনামা’ ও ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান’। এ ছাড়া আরও ছিলেন, আব্দুল করীম খোন্দকার, শমশের আলী প্রমুখ।

আরাকান রাজসভার কবিগণ কাব্যরচনায় বিবিধ বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছেন। ড. সুকুমার সেনের মতে এই কবিরা ছিলেন, ‘ফারসি সাহিত্যের মধুকর এবং ভারতীয় সাহিত্যের রস সন্ধানী’। তারা ফারসি ও হিন্দি উৎস থেকে কাব্য রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মানবীয় প্রণয়কাব্য রচনা করে আরাকান রাজসভার কবিগণ বিশিষ্টতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশে মোগল-পাঠানের সংঘর্ষের ফলে অনেক অভিজাত মুসলমান আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তারা ছিলেন সুফি মতাবলম্বী। তাদের প্রভাবে আরাকান রাজসভায় আরবি-ফারসি বিদগ্ধ ও সুফিবাদের অনুরক্ত কবিগণের বিস্তার ঘটে।

গবেষকদের মতে, ‘আরাকানের বাংলা সাহিত্যে দুটি ধারা লক্ষণীয়। একটি ধর্মীয় বিষয় এবং অপরটি হলো ধর্মনিরপেক্ষ রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের ধারা। ইসলাম ধর্মের ব্যাপক সম্প্রাসারণ ও উপলদ্ধির যথার্থ উপকরণ নিয়ে ধর্মীয় কাব্য রূপ লাভ করেছে। রোমান্টিক গাথা ও মর্মস্পর্শী গীতিসাহিত্য। তবে হিন্দি প্রণয়কাব্যের মধ্যে নিহিত সুফি মতাদর্শের প্রভাবে প্রণয়কাব্যের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ লাভ সম্ভব হয়েছিল।’

ইতিহাসের আলোকে অনেক গবেষক বলেছেন, মধ্যযুগের আরাকানের বাংলাভাষার কবিরা যা লিখেছেন তা বাংলা ভাষার কবিরা আপন দেশে লেখতে পারেনি। মধ্যযুগকে বাংলাভাষার অন্ধকার যুগও কেউ কেউ বলে থাকেন।

তো আজকের দিনে ওই আরকান নিয়ে এত কিছু হচ্ছে তাই আমি অতীতের কিছু বিষয় পাঠকদের মাঝে হাজির করতে গিয়ে মনে হচ্ছে, আসলে ওই আরাকান আমাদের সীমানার মধ্যে কেন নেই? মধ্যযুগের অবস্থান বিচার করলেতো দেখা যায়, বাঙালিরাই ওই দেশ শাসন করেছে। ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে। আর বার্মা হয়েছে ১৯৪৮ সালে। আমাদের নেতারা কী ওই সব মানুষের কথা ভাবেনি? চিটাগাংএর নেতারা তাদের কথা কেন চিন্তা করেনি? ইতিহাস বলে, ওই আরাকান বাংলাভাষার দেশ কাজেই হয় ওরা স্বাধীন থাকবে নতুবা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে। ব্রিটিশ বেনিয়ারা দেশটা এমন ভাবে ভাগ করেছে যাতে তিনটা প্রধান ধর্মের মানুষরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় থাকে এবং অবিশ্বাস নিয়ে একটা ভয়ংকর পরিবেশে বাস করে সৃষ্টিশীলতা হারায়! কী রকম বেইমান এই ইংরেজরা, আমাদের শাসন করলো, শোষণ করলো, যা করার তাই করে যাওয়ার আগে একটা চিরকালের প্রতিদ্বন্ধী করে পালালো! এই না হলে ব্রিটিশ! প্রকৃতির বিরুদ্ধে পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশ-বার্মা ভাগ হয়েছে। মানে করা হয়েছে, যাতে আমরা কেউ শান্তিতে না থাকতে পারি। এখন সময় এসেছে পুনঃভাগের, রাগের বা অনুরাগের বিষয় নয়।

মধ্যযুগের বৌদ্ধরাজারা কতটা উদার এবং ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন তার প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যাচ্ছে। আধুনিক এই ডিজিটাল যুগে বার্মার সামরিক জান্তা আর পশ্চিমাদেশের তথাকথিত শিক্ষিত সু চি কতটা নির্মম আর সাম্প্রদায়িক স্বৈরাচার! সু চির সামনে মধ্যযুগের আরাকান রাজ্যের শাসন ব্যবস্থার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন। সু চিদের মতো আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তারা কতটা আধুনিক এবং উদার শাসক ছিলেন। ধর্ম তখনো ছিল এখনো আছে। শুধু ধর্মের কারণে আজ লাখো রোহিঙ্গা গৃহহীন অন্নহীন দিশেহারা! একবার যদি মধ্যযুগের সাহিত্য দর্শনটা ওই সু চি নামক ভ- দানবিক মহিলাকে বুঝানো যেত তাহলে হয়তো একটু মানবিক হওয়ার আগ্রহ দেখাতো।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে