সৈয়দ হকের বুনোবৃষ্টির নন্দন

  শহীদ ইকবাল

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক বছর হলো চলে গেছেন সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬)। মনে হয় এখনো আছেন ইংল্যান্ডে বা গুলশানেÑ তার পড়ার ঘরে। কিন্তু আশ্চর্য বছরখানেক তিনি নেই। কিন্তু কীসে আছেন? কী রেখে গেছেন? বাংলার মাঠ-প্রান্তর, মুক্তিযুদ্ধ, মজিবর-নূরলদীন আর প্রান্তিক মানুষের নায়কদেরÑ তার কথায় যিনি ‘গণনায়ক’, আর সম্ভাবনার এই চিরসবুজ প্রান্তরে তিনি রয়ে গেছেন। রেখেও গেছেন। মূলত তিনি কবি। তাই তো কবিতাশিল্পেরই নানা অঙ্গে ঘটেছে বিচিত্র অভিযোজন। আর তুমুল সম্প্রসারণ। এবং তা হয়ে উঠেছে চিরনন্দিত শিল্প। এখানে তার সাহিত্যের কবিতা ও কাব্যনাট্যের চৌম্বক দিকটিই আমরা তুলে ধরব। যেখানে সৈয়দ শামসুল হককে হয়তো পূর্ণ করে পাওয়া যেতে পারে। তার কবিতা-যাপন শুরু হয় গত শতকের পঞ্চাশের শেষে। জন্ম তার ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর। নিবাস বাংলাদেশের উত্তর-বাংলার কুড়িগ্রাম জেলায়। সাহিত্যে তিনি সব্যসাচী খ্যাতি পান সর্বদিকে অবাধ হওয়ায়। কবিতা, কাব্যনাট্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, কলাম, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, অনুবাদ নিয়ে আমাদের সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ তাস বের হয় ১৯৫৪ সালে। এরপর ১৯৫৯-এ লেখেন দেয়ালের দেশ উপন্যাস। তবে কাব্যগ্রন্থ বুনোবৃষ্টির গানও প্রায় ওই সময়েই প্রকাশ পায়। সবকিছুর মধ্যে তার মাস্টারপিস কাব্যনাট্যসংগ্রহ (১৯৯১)Ñ যেখানে রয়েছে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬)ও নূরলদীনের সারাজীবন (১৯৮২) গ্রন্থ দুটি। সে বিষয়ে আমরা পরে আসছি। তিনি আমেরিকান ঔপন্যাসিক সল বেলোর ঐবহফবৎংড়হ ঃযব জধরহ করহম (১৯৫৯) অনুবাদ করেন শ্রাবণ রাজা (১৯৬৯) নামে। এটি একটি অসামান্য কাজ। এ ছাড়া উর্দু কবিতা, স্পেনিশ কবিতার প্রাঞ্জল অনুবাদও রয়েছে। কলাম হৃৎকলমের টানের কথা আমরা সবাই জানি। যেমনটা আগেই বলেছি, কাব্যনাটক তার সবচেয়ে প্রশংসিত শিল্পকর্ম কিন্তু খেলারাম খেলে যা (১৯৭৩), নীলদংশন (১৯৮১), নিষিদ্ধ লোবান (১৯৮১), রক্তগোলাপ (১৯৮১), মহাশূন্যে পরান মাস্টার (১৯৯০), আয়না বিবির পালা (১৯৯০) প্রভৃতিও জনপ্রিয় রচনা। আরও অনেক আছে। তবে বাংলাদেশের কবিতায় পরানের গহীন ভিতরে (১৯৮১) সনেটগুচ্ছ এবং বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা (১৯৮১)ও অসম্ভব আকর্ষণীয় রচনা। যেটি বিশেষ ভাষায় উদ্যত এবং আবৃত্তিতেও সুখকর-সমৃদ্ধিজ্ঞাপক। এই নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক। তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত, অভিভাকহীন এখন। অপূরণীয় ক্ষতি।

বিভাগোত্তর পূর্ববাংলা, মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরের বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেন তিনি কবিতায়। এ পর্যায়ে তার নতুন রূপ পলিমাটির প্রান্তজিজ্ঞাসা। প্রত্যন্ত হয়ে ওঠা। তাতে উত্তর-ঔপনিবেশিক (ঢ়ড়ংঃ-পড়ষড়হরধষ) তত্ত্ব-বীক্ষার রূপ স্পষ্ট। ‘রংগপুর’, কুড়িগ্রাম, নাগেশ্বরীর ওইসব কৈশোর গ্রাম, তার নাগরিক সত্তাটিতে আশ্রিত।

সৈয়দ শামসুল হকের লোকান্তরের বাণী বিশেষ পরিধি অর্জন করলে অপার আলোকরেখায় তার বিপ্রতীপ অনুধ্যানটিও বর্তায়। ‘স্তব্ধ স্বপ্ন প্রণয়ের, চোখ যেন অরণ্যে আঁধার’ কিংবা ‘এ সংসার-পূর্ণিমার ক্ষত,/ বাজায় বিনোদ-কালে নিঃসঙ্গ সেতার’ এমনটা কী দিনগত পাপক্ষয়? স্বকাল কিন্তু চিরকালের আখরÑ ‘অনুজার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে’, ‘পহেলা মার্চ ১৯৭১’, ‘একাত্তরের পঁচিশে মার্চের অসমাপ্ত কবিতা’, ‘শামসুর রাহমান, আপনার পঞ্চাশত্তম জন্মদিনে’, ‘স্বাধীনতা’, ‘পঁচিশে মার্চ’, ‘হাসান হাফিজুর রহমানের জন্যে’, ‘কমরেড ফরহাদ/ একটি লোকগাথা’, ‘টিএসসি সড়কদ্বীপে শয়ান আলমগীর কবিরকে’, ‘আমি জন্মগ্রহণ করিনি’, ‘ফিরে এসো রক্তাক্ত বাংলাদেশ’, ‘মুজিবের রক্তাক্ত বাংলায়’Ñ এমন অনেক কবিতায়।

কবি বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালায় (১৯৬৯) লেখেন আটষট্টি হাজার গ্রামের ধ্রুপদী গল্প :

আমারও সংসার হবে/ শিল্পের সংসার। চন্দ্রাবতী হবে বোন,/ কালিঘাটে আত্মীয় আমার। আমি জানি/ মনসার ক্রোধে মানে মানুষের জয়,/ চাঁদ রাজা হার মানে। লৌহ বাসরের/ কালছিদ্রে চোখ রেখে আমি কালরাতে/ পূর্ণিমা ধবল দেহে আজো জেগে আছি।

কাব্যনাট্য নিয়ে ঈষৎ আলাদা বলতেই হয়। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬) কিংবা নূরলদীনের সারাজীবন (১৯৮২)-এ তার অধিষ্ঠান বাড়িয়ে নেওয়া যায়। পাঁচটি কাব্যনাট্যের মধ্যে প্রথমটি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৫)। কাব্যনাট্যের ভূমিকায় সৈয়দ হক বলেন, ‘শিল্পক্ষেত্রে আমার আর এক সংসার নাটক।’ এতে তিনি বৃহত্তর ও ব্যাপক মানুষকে তুলে আনেন ভিন্নধর্মী এক ভাষার মধ্য দিয়ে; তড়িৎপ্রবাহের মতো এ ভাষা ভূসংলগ্ন মানুষের নৃতত্ত্ব¡-ইতিহাস-সংস্কার-পুরাণ প্রসঙ্গকে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় দর্পিত করে তোলে। গণমানুষদের সমস্যা, ক্ষয় শুধু নয়Ñ মূল্যবোধের মাত্রা এবং সম্ভাবনার-স্বপ্নের পথও বয়ান করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যের উদ্দিষ্ট আকর মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গোটা দেশÑ বাংলাদেশ আর স্বপ্নালু প্রবহমান মানুষের স্রোত; যেখানে তার স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বাস্তবতার তীব্রতায় অভিব্যঞ্জিত। তিনি বলেন : ‘আমি লক্ষ্য না করে পারি না যে, আমাদের নাট্যবুদ্ধিতে কাব্য ও সংগীতই হচ্ছে নাটকের স্বাভাবিক আশ্রয়।’ এমন শিল্পচিন্তার ভেতর দিয়ে মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত জঙ্গমী মানুষের স্বপ্নচিন্তা কাব্যনাট্যে প্রতীকায়িত করেন।

সৈয়দ শামসুল হক ‘উৎসারিত আলো’র জাগরণÑ সম্ভাবনার প্রতীক। তিনি নিঃশেষ নন। ‘সৌন্দর্যময় দীর্ঘশ্বাস’ তার সাহিত্যের আধুনিক মাত্রা। অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময়ের গদ্যে, সনেটে, পয়ারে, প্রবন্ধে, কাব্যনাট্যে তিনি মোহনীয়Ñ আলোকিত। ধ্রুপদী তার কবিজীবন। প্রথম প্রয়াণ দিবসে তাকে অন্তরস্থিত শ্রদ্ধা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে