প্রকৃতির সন্তান প্রকৃতিতেই মিশে থাক

  লাবণ্য লিপি

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেদিন ছিল প্রচ- খরতাপ। ঠিক দুপুরের একটু আগে গিয়েছিলাম তার কাছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বেশ হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। বউদি দরজা খুলে তার পড়ার ঘরটা দেখিয়ে দিতেই গিয়ে বসেছিলাম। চোখ বুলিয়ে নিলাম ঘরের চারপাশটা। না, দামি আসবাবে মোড়ানো নয় ঘরটা। খুব পরিপাটি করে গোছানোও নয়, বরং একটু যেন এলোমেলো। এখানে সেখানে স্তূপ করে রাখা বই। বইয়ের আলমারিটাও ধারণক্ষমতার অনেক বেশি বই আগলে রেখেছে যতœ করে। এটাই এই ঘরের সবচেয়ে বড় ঐশ্চর্য। মহামূল্যবান বইগুলো যেন আলোকিত করে রেখেছে ঘরটা। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। তিনি এলেন। প্রকৃতিবিদ দ্বিজেন শর্মা। কতদিন টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি এ মুখ; অনুষ্ঠানের মঞ্চেও দেখেছি দূর থেকে। এত কাছ থেকে, পাশে বসে তো দেখা হয়নি কখনো। তাও আবার আজ শুধু আমার সঙ্গেই কথা বলবেন। অন্য কেউ ধাক্কাধাক্কি করে আমাকে সরিয়ে দেবে না। তাই বেশ একটা অধিকারবোধ জন্মে গেল মনে। তখনই চা চলে এলো। গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।

চোখে কালো চশমা থাকায় কারণ জানতে চাইলাম। ঠিক যেভাবে খুব কাছের মানুষকে, আত্মীয়র কাছে জানতে চাওয়া যায়! প্রশ্রয়ের স্বরেই বললেন, চোখে খুব সমস্যা হচ্ছে। তোমার সঙ্গে কথা বলা শেষ হলেই ডাক্তারের কাছে যাব। তবে তাড়া নেই। তুমি বলো কী জানতে চাও! কতই তো বলেছি। নতুন আর কী বলব।

আমি কিন্তু সেই অধিকারবোধে অটল। বললাম, আমাকে তো বলেননি। আমি জানতে চাই আপনার ছেলেবেলার গল্প। প্রকৃতির সঙ্গে আপনার এই যে আত্মীয়তা, বন্ধুত্বÑ এ নিশ্চয়ই অল্পদিনে হয়নি! আমার কথা শুনে তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দেখা গেল। পরক্ষণেই একটু যেন অন্যমনস্ক হলেন। হয়তো ফিরে গেলেন ছেলেবেলার সেই দিনগুলোয়। তার পর ঘোরলাগা গলায় যেন দূর থেকে ভেসে আসছে এমন স্বরে বলতে শুরু করলেন, প্রকৃতিবেষ্টিত পরিবেশেই কেটেছে আমার ছেলেবেলা। পাতারিয়া পাহাড়ের খুব কাছেই আমাদের বাড়ি। গ্রামের নাম শিমুলিয়া। মৌলভীবাজারের বড়লেখা জেলায় এই গ্রাম। খুব প্রত্যন্ত গ্রাম। আমার বাবা- দাদারা তিন পুরুষ ধরে কবিরাজি করতেন। কবিরাজদের চিকিৎসার প্রধান উপকরণ তো গাছগাছালির পাতা, শিকড়-বাকড়। ফলে আমাদের বাড়িটা ছিল গাছগাছালিতে ভরা। নানারকম ফল-ফুলের গাছ তো ছিলই। বাড়তি ছিল ঔষধি গাছ। সেসব গাছ পাহাড় থেকে সংগ্রহ করে এনে লাগিয়েছিলেন আমার বাবা-দাদারা। আমি তো ওই সব গাছের সঙ্গেই বড় হয়েছি। তখন রাস্তাঘাট এখনকার মতো পাকা ছিল না। পাহাড়ঘেঁষা মেঠোপথে হাঁটতাম আমরা। অদূরে একটা রেললাইন ছিল। সেই রেললাইনের পাশে ছিল আমাদের পাঠশালা। প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পথে দেখা হওয়া গাছগুলো একসময় আত্মীয়র মতো হয়ে গেল। গাছ, পাতা, ফুল, ফল, গন্ধÑ এর মধ্যেই বড় হয়েছি আমি। পাতারিয়া পাহাড়ে আমাদের একটা বাগানবাড়ি ছিল। আমি সেই বাড়িতে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকতাম। কত রকম গাছ যে ছিল সে পাহাড়ে! আর ছিল নানারকম পাখপাখালি। ময়না, টিয়া, ঝুঁটি শালিখ, সরাইল, নানা জাতের হাঁস। আমাদের ওই বাগানবাড়ি দেখাশোনা করতেন এক আদিবাসী বয়সী ভদ্রলোক। সবাই তাকে ডাকত সুবাবুড়া নামে। তার ছিল শিকার করার জন্য নানারকম তীর, ধনুক এবং আরও কত অস্ত্র! সেই সুবাবুড়াই আমার প্রথম শিক্ষক। আর দ্বিতীয় শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ। আমি আর একজন মু-া আদিবাসী ছেলেÑ এই দুজন ছিলাম সুবাবুড়ার শিষ্য। বুড়া আমাদের পাখি ধরার ফাঁদ পাততে শেখাতেন, তীর ছুড়তে শেখাতেন। বনে ফুল ফুটলে কত রকম পাখি যে আসত। ভীমরাজ নামের লম্বা লেজ ওয়ালা নীল রঙের পাখি আসত। কী যে মিষ্টি ছিল তার গানের গলা! এ ছাড়া তিতির, বনমোরগ, মায়া হরিণ, সম্বর, সজারু, বনরুই, রামকুত্তা, স্থলকচ্ছপ, শঙ্খচূর সাপ আরও কত রকম জীবজন্তু। পাখি ধরা খুব কঠিন ছিল। আমরা বনরুই ধরতাম। ঢিল ছুড়লেই লম্বা লেজ গুটিয়ে মাছটা গোল হয়ে যেত। আমরা তখন ধরে ফেলতাম। একবার একটা বড় স্থলকচ্ছপও ধরেছিলাম। প্রকৃতির এই পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা, মানস গঠন। প্রকৃতি থেকে তাই কখনো বিচ্ছিন্ন হতে পারিনি আমি।

মাধ্যমিক পাস করে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে এসে বরিশাল বিএম কলেজে শিক্ষকতা শুরু করি। তার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পাস করে নটর ডেম কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দিই। ছাত্রদের পড়াতে পড়াতেই নটর ডেম কলেজের ওই বাগান করেছিলাম। তখন তো ঢাকায়ও এত লোহালক্কড়ের দালানকোঠা ছিল না! আজকের এই দালানকোঠার জঙ্গলে তখন অনেক গাছগাছালিও ছিল। এত পরিবেশ দূষণও ছিল না। অথচ এই পরিবেশ দূষণের জন্য আমরাই দায়ী। শিল্পায়নই আমাদের ক্রমেই প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। আমরা প্রকৃতিকে অধীনস্ত করতে চেয়েছি, আঘাত করেছি। প্রকৃতি তাই এখন আমাদের প্রত্যাখ্যান করছে। প্রতিঘাত করছে। উন্নয়নের প্রলোভনে আমরা ক্রমাগত প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছি। এই অতিরিক্ত নগরায়ণ আস্তে আস্তে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। আমার বড়দা বলতেন, গাছের সঙ্গে মানুষের একটা বোঝাপড়া হয়; গাছ ও মানুষের বন্ধুত্বও হয়। কিন্তু শহরের এই যান্ত্রিক শব্দ মানুষের স্নায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে। আমরা তো শহরে উপসী জীবনযাপন করি। প্রকৃতির রঙ-রূপ-রস-গন্ধহীন! গাছ, ফুল, ফল, পাখি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যÑ এসব শিশুদের মানস গঠনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অথচ শিশুদের আমরা জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছি লোহালক্কড়ের খোঁয়াড়ে। ওরা প্রকৃতির স্পর্শ পাচ্ছে না। গাছ চেনে না, পাখির গান শোনে না, বৃষ্টির শব্দ শুনতে পায় না। এই যান্ত্রিক জীবন ওদের রোবট বানিয়ে ফেলবে!

আবার ফিরে এলেন প্রসঙ্গে, বলেছি না আমার দ্বিতীয় শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ। সুবাবুড়ার কাছে শৈশবে যা পেয়েছিলাম তা ছিল আনপ্রসেসড। আর রবীন্দ্রনাথের কাছে পেয়েছি প্রসেসড উপকরণ। রবীন্দ্রনাথই তো চিনিয়ে দিলেন প্রকৃতির নিগূঢ় সৌন্দর্য। প্রকৃতির রূপ-রসের সঙ্গে যে আমাদের হৃদস্পন্দনের সম্পর্কÑ এটা তো রবীন্দ্রনাথের কাছেই শিখলাম। রবীন্দ্রনাথ শুধু আমার কেন, আমাদের পুরো জাতীর শিক্ষক তিনি। তিনি আমাদের মুখের ভাষা দিয়েছেন। সত্যি বলতে কী, রবীন্দ্রনাথের আগে তো আমরা শিল্পীতভাবে প্রেম নিবেদন করতেও শিখিনি। আমাদের জীবনের এমন কোনো সময়ের অনুভূতি নেই, যেখানে আমরা রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাই না। জীবনের সব অবস্থাতেই তার সৃষ্টির কাছে আশ্রয় নিই।

কথা বলতে বলতে একসময় তার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। আমাকেও ফিরতে হবে কর্মস্থলে। মনে এক অন্যরকম অনুভূতি নিয়ে আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকলাম। কেবল প্রকৃতিপ্রেম নয়, প্রকৃতি রক্ষায় অসামান্য অবদান রেখেছেন এই উদ্ভিদবিজ্ঞানী। তার মোট বইয়ের সংখ্যা ১৬টি। শ্যামলিনী স্বর্গ, গাছের কথা ফুলের কথা, নিসর্গ নির্শাণ ও নান্দনিক ভাবনা, প্রকৃতি মঙ্গল ইত্যাদি তার প্রকৃতিবিষয়ক বই। মৌলভীবাজারের বড়লেখা জেলার শিমুলিয়া গ্রামে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গ-ি পেরিয়ে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বিএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় এমএসসি পাস করেন তিনি। শুরু করেন শিক্ষকতা। ছাত্রদের নিয়ে নেমে পড়েন মাঠে, ছুটে যান গাছের কাছে। প্রমাণ করে দিলেন বিজ্ঞানের পাঠও হতে পারে মাঠে মাঠে। প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি, ২০০২ সালে শিশু একাডেমি, ২০১১ সালে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন থেকে প্রকৃতি সংরক্ষণ পদকসহ আরও অনেক পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। শিক্ষক, লেখক, অনুবাদকÑ সর্বত্রই তিনি ছিলেন স্বনামখ্যাত। নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি ‘তরু পল্লব’ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শুক্রবার রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রকৃতির এই পরম বন্ধু। গুণীর মৃত্যু হয় না। দ্বিজেন শর্মাও বেঁচে থাকবেন। মিশে থাকবেন প্রকৃতিতেই!

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে