নোবেল বিজয়ী কাজুও ইশিগুরোর সাতকাহন

  মাইনুল ইসলাম মানিক

০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সকল অপেক্ষা ও জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঘোষিত হলো ২০১৭ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম। নগুগি, হারুকি, কুন্ডেরাদের মতো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের পেছনে ফেলে এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো। ইশিগুরোর নোবেল পুরস্কার পাওয়াটা দুনিয়াজোড়া পাঠকদের কাছে একটি চমক হিসেবে কাজ করছে। কারণ নগুগি ওয়া থিয়োং‘ও, কো উন, কুন্ডেরা, অ্যাটউড, মুরাকামি, ফসে, মারিয়াস, কাদারে, রথ বা ওটসদের নাম বেশ কয়েক বছর ধরে খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হলেও ইশিগুরোর নাম খুব একটা আলোচনায় উঠে আসেনি। ইশিগুরো নবম ব্রিটিশ সাহিত্যিক এবং আটাশতম ইংরেজি ভাষার লেখক হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। এর আগে রুডইয়ার্ড কিপলিং (১৯০৭), জন গলসওর্দি (১৯৩২), টিএস এলিয়ট (১৯৮৪), বার্ট্রান্ড রাসেল (১৯৫০), প্যাট্রিক হোয়াইট (১৯৭৩), উইলিয়াম গোল্ডিং (১৯৭৩), হ্যারল্ড পিন্টার (২০০৫) এবং ডরিস লেসিং (২০০৭) ব্রিটিশ সাহিত্যিক হিসেবে এ বিরল সম্মান অর্জন করেন।

কাজুও ইশিগুরো মূলত জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক। ১৯৫৪ সালে জাপানের নাগাসাকিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে তার পিতা সপরিবারে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তিনি কেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর লেখালেখিতে মনোনিবেশের জন্য তিনি এক বছর শিক্ষা বিরতি দেন। ১৯৮০ সালে তিনি ইস্ট অ্যাংলিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮২ সালে ব্রিটিশ সরকার ইশিগুরোকে সে দেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। তিনি এ পর্যন্ত মোট চারবার ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন এবং ১৯৮৯ সালে তিনি ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৮ সালে টাইমস ম্যাগাজিনের জরিপে ১৯৪৫ সাল-পরবর্তী শ্রেষ্ঠ পঞ্চাশ ব্রিটিশ সাহিত্যিকের তালিকায় তিনি ৩২তম স্থান অর্জন করেছিলেন।

ইশিগুরোর প্রথম উপন্যাস ‘অ্যা প্যাল ভিউ অব হিলস’ ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই ফাবের অ্যান্ড ফাবের প্রকাশনীর পক্ষ থেকে তাকে অগ্রিম এক হাজার ডলার রয়ালিটি প্রদান করা হয়। ১৯২ পৃষ্ঠার এই বইটি প্রকাশের বছরেই ‘উইনিফ্রেড হল্টবাই মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে। বইটি একজন মধ্যবয়সী জাপানি নারীকে নিয়ে রচিত। ইংল্যান্ডে বসবাসরত এ নারীর নিঃসঙ্গ জীবনের টানাপড়েন বইটিতে লেখক অসাধারণভাবে চিত্রায়িত করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় ইশিগুরোর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোয়টিং ওয়ার্ল্ড’। এ বইটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত হয়। উপন্যাসের চরিত্রে রয়েছেন একজন চিত্রশিল্পী যিনি যুদ্ধে তার সব অর্জনকে হারিয়েছেন। তার অর্জন আর বিসর্জনের দ্বন্দ্ব নিয়ে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোতে থাকে ২০৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি। এ উপন্যাসে মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনও চমৎকারভাবে ধরা পড়ে। উপন্যাসটি ১৯৮৬ সালের ম্যান বুকার অ্যাওয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। ম্যান বুকার পুরস্কার না পেলেও এ বইটি ‘হুইটব্রেড বুক অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে।

নোবেল কমিটি ইশিগুরোর ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ বইটির জন্য তাকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করেন। বইটি ১৯৮৯ সালে প্রকাশের পর একই বছর ম্যান বুকার অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেছিল। এ বইটি অ্যান্টনি হপকিন্স ও ইমা থম্পসনের অভিনয়ে ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হয় এবং দুনিয়াজোড়া তুমুল সাড়া ফেলে। এ চলচ্চিত্রটি এ পর্যন্ত আটটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়। ইশিগুরোর প্রথম দুটি উপন্যাসের মতোই এ উপন্যাসটিও উত্তম পুরুষে রচিত। উপন্যাসের মূল চরিত্র স্টিভেন্স লর্ড ডার্লিংটনের অনুগত একজন খানসামা হিসেবে সারা জীবন পার করে দেন। উপন্যাসটি শুরু হয় স্টিভেন্সের পুরনো এক কলিগ, মিস কেনটনের লেখা একটি চিঠি প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। চিঠিতে কেনটন তার বৈবাহিক জীবনে অসুখী পরিণতির কথা ইঙ্গিত দেন। চিঠিটি পেয়ে স্টিভেন্স পুনরায় তাদের পুরনো সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ উপলব্ধি করেন। স্টিভেন্স বুঝতে পারেন, যদি কেনটনকে পুনরায় তার চাকরিতে বহাল করা যায় তবে এ সম্পর্ক গড়ে ওঠার সমূহ সুযোগ তৈরি হতে পারে। কয়েকদিন পর স্টিভেন্সের নতুন মালিক তাকে তার গাড়িটি ধার দেয় এবং স্টিভেন্স বুঝতে পারে এটাই তার জন্য সেরা সুযোগ পুরনো কলিগের সঙেমগ দেখা করার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ঘটনাক্রমে স্টিভেন্সকে তার মালিকের চরিত্রে তার যথাযথ যশসহ অভিনয় করে যেতে হয় এবং একই সঙ্গে কেনটনের সঙ্গে তার নিজের চরিত্রে অভিনয় করে যেতে হয়। বইিিটর কাহিনি যতই সামনের দিকে এগোয় ততই কেনটনের সঙ্গে পুরনো দিনের পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট হতে থাকে। যেহেতু যুদ্ধ চলতে থাকে, স্টিভেন্স ও কেনটন কেউই পরস্পরকে তাদের প্রকৃত অনুভূতির কথা বলতে পারে না। দুজনের কথোপকথনে রোমান্স থাকলেও তাদের সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত অসংজ্ঞায়িত থেকে যায়। মিস বেন নামে একজন যখন কেনটনকে জানায় তার স্টিভেন্সকে বিয়ের কথা বলতে ভুল করা উচিত নয়, তখন কেনটন বেনকে জানিয়ে দেয়, সে শুধু তার পুরনো স্বামীকেই ভালোবাসার কথা ভাবতে চায় এবং সে তার অনাগত নাতনির পৃথিবীর মুখ দেখার অপেক্ষায় আছেন। এর পর মালিকের সেবার দিকেই অবশিষ্ট দিনগুলোকে সমর্পণ করেন স্টিভেন্স। এভাবেই চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ উপন্যাসটি।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় ইশিগুরোর চতুর্থ উপন্যাস ‘দ্য আনকনসোলড’। এ উপন্যাসটিও আগের তিনটি উপন্যাসের মতো একই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’র মতো সাড়া জাগাতে না পারলেও সাহিত্যবোদ্ধাদের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ৫৩৫ পৃষ্ঠার বইটি সেলটেনহাম পুরস্কার জিতে নিতে সক্ষম হয়। বইটি বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ পঞ্চাশটি ব্রিটিশ উপন্যাসের তালিকায় স্থান করে নিতে সক্ষম হয়। ইশিগুরোর ‘হোয়েন উই অয়ার অরফানস’ বইটি প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। এ বইটিও ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। তবে ইশিগুরোর দুর্বল বইয়ের তালিকায় সমালোচকরা এটিকে স্থান দিয়েছেন। ইশিগুরো নিজেও বলেন, ‘এটা আমার সেরা সৃষ্টিকর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় ইশিগুরোর ‘নেভার লেট মি গো’ বইটি। এ বইটিও ম্যান বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল। এ বইটি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করতে সমর্থ হয় এবং চলচ্চিত্রায়িত হয়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তার সর্বশেষ উপন্যাস ‘দ্য বারিড জায়ান্ট’।

ইশিগুরো এ পর্যন্ত বেশ কিছু চিত্রনাট্যও রচনা করেছেন। তার চিত্রনাট্যও বিশ্বজোড়া খ্যাতি বয়ে এনেছে তার জন্য। ‘দ্য স্যাডেস্ট মিউজিক অব দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘দ্য হোয়াইট কাউন্টেস’ তার অন্যতম চিত্রনাট্য। এ ছাড়াও তার ৫টি গল্পগ্রন্থও রয়েছে যেগুলো যে কোনো পাঠককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবে। এর বাইরেও রয়েছে তার লেখা অসংখ্য গান যা শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। সুতরাং এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়, বিশ্বব্যাপী আলোচিত অনেক যোগ্য লেখক নোবেল পুরস্কারবঞ্চিত হলেও এ বছরের পুরস্কার কোনো অযোগ্যর হাতে ওঠেনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে