‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আছে’

  সেলিনা হোসেন

০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেলিনা হোসেন। বাংলা ভাষার প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। তার লেখা উপন্যাসে উঠে আসে সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব- সংকট। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তার লেখায় যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। তার লেখায় আমরা খুঁজে পাই বিপন্ন মানুষের জীবন-সংকট। তার সাহিত্যকর্ম, বর্তমান লেখালেখি, রোহিঙ্গা সংকট ইত্যাদি নানা বিষয় উঠে এসেছে এ সাক্ষাৎকারে। আলাপচারিতায় ছিলেনÑ লাবণ্য লিপি

বাড়িতে ঢুকতেই কেমন এক ধরনের প্রশান্তি ছুঁয়ে যায়। উঠোনে এক টবের বাগান একটু যেন দাঁড়িয়ে যেতে বলে। বসার ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে দেয়ালে টানানো লারার ছবি। সেলিনা হোসেনের ছোট মেয়ে ফারিয়া লারা। ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণরত অবস্থায় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয় লারা। এ বিষয়ে কথা বলছিলাম আবু সুফিয়ান কবির ভাই-এর সঙ্গে। হাসিমুখে ঘরে ঢুকলেন সেলিনা হোসেন। দিনের এ সময়টাতে তিনি লেখালেখিতেই ডুবে থাকেন। তখনো লিখছিলেন। আলাপ শুরু হয় এ প্রসঙ্গেই।

এখন কী লিখছেন? ‘সাত মার্চের বিকেল’-এর খবর কী?

ওই উপন্যাসটাই লিখছি। এখন ওটা নিয়েই কাজ করছিলাম। আসলে ইতিহাসনির্ভর লেখায় অনেক সময় দিতে হয়। অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে হয় তো! আমি ক্রমাগত তথ্য সংগ্রহ করছি আর লিখছি। তাই সময় লাগছে। গত বছর মানে ’১৭ বইমেলায় বইটা প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ করতে পারিনি। সামনের বইমেলায় তো বইটা বের করতেই হবে। তাই লেখাটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আগে যা লিখেছিলাম সব ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করেছি। ১০০ পৃষ্ঠার মতো লেখা হয়েছে।

এটা তো মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতেই লেখা?

মুক্তিযুদ্ধ তো বটেই। আমার মূল লক্ষ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। সাত মার্চের সেই ভাষণে কারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের চিন্তা-চেতনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। বুদ্ধিজীবী থেকে একেবারে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষÑ প্রত্যেকেরই তো নিজস্ব ভাবনা ছিল। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, পথচারী, ভিক্ষুক, রিকশাওয়ালা, বাদাম বিক্রেতাÑ এরাই আমার উপন্যাসের চরিত্র। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে ওইসব সাধারণ মানুষের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলÑ এটা দেখাতে চেয়েছি আমি। আমি নিজেও সেদিন উপস্থিত ছিলাম রেসকোর্সে। আমার মনে আছে, বঙ্গবন্ধু মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছেন। তিনি কিন্তু ভাষণে একবারও পাকিস্তান বলেননি। বারবারই বলেছেন বাংলাদেশ। মঞ্চে হোসনা বানু গান গেয়েছিলেন, ‘ও আমার দেশের মাটি/ তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’ রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির এই যে সমন্বয়Ñ এটা যেন তিনি আমাদের শিক্ষা দিলেন। একটা গান দিয়ে, সুর দিয়ে হাজার হাজার মানুষের হৃদয় ছোঁয়া যায়, আবেগে নাড়া দেওয়া যায়Ñ এটা তিনি দেখিয়ে দিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা শুনতে চাই।

আমি তো তখন বাংলা একাডেমিতেই কাজ করি। ২৫ মার্চের সারারাত হানাদার বাহিনীর তা-ব, গোলাগুলির শব্দ শুনেছি। তার পর তো কারফিউ ছিল। ২৭ মার্চ বের হয়েছি বাংলা একাডেমির আশপাশে, রমনা কালীমন্দির, শহীদ মিনার সব ঘুরে দেখছিলাম। তখন দেখা হলো শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে। তার সঙ্গে ওটাই আমার শেষ দেখা। বিদেশি সাংবাদিকদের ঘুরে ঘুরে তিনি শহরে পাক বাহিনীর ধ্বংসলীলা দেখাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, এই অবস্থার মধ্যে তুমি কেন বেরিয়েছ? যাও! যাও! বাসায় ফিরে যাও! আমি কি আর ফিরি! আশপাশে চষে বেরিয়েছি।

আপনার লেখায় আমরা সব সময় বিপন্ন মানুষের জীবনচিত্র খুঁজে পাই। বর্তমানের রোহিঙ্গা সংকট কি আপনার লেখায় পাব? এই সংকট সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

হ্যাঁ, রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আছে আমার। সত্যি বলতে কী, আমি এটা ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি যে, ৫০ বছর পর এই সমস্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। আমি সত্যিই আতঙ্কবোধ করি। এই নয় লাখ নাগরিকের কী হবে? এদের ভবিষ্যৎই বা কী! ৫০ বছর পর এদের সংখ্যা কততে গিয়ে দাঁড়াবে! ওরা তো এক জায়গায় স্থির থাকবে না। ধীরে ধীরে মিশে যাবে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে। তখন তাদের আলাদা করবে কেমন করে? এটা ঠিক যে, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এর তো একটা স্থায়ী সমাধান হতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে মিয়ানমার ওদের পিটিয়ে আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ওদের আশ্রয় দিলে আমাদের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে।

আপনার লেখালেখির শুরুতে কবিতাও লিখতেন। তার পর ওটা থেমে গেল কেন?

ভালো কথাই বলেছ। সাহিত্যের এই মাধ্যমটা আমার খুব পছন্দের। যখন লিখেছি তখন তো লিখতে ভালো লাগত খুব। কিন্তু যখন আমি খুব ভালো করে বুঝতে শিখলাম, অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী হতে থাকল তখন মনে হলো, আমি যা বলতে চাই তা বলার জন্য আমার বড় প্লট চাই। বিস্তারিত বলতে চাই। আর সেই মাধ্যমটা উপন্যাসই হতে পারে। তার পর থেকেই উপন্যাস লেখায় মনোযোগী হই। তবে সব সময় উপন্যাসের বিষয়বস্তুর দিকে খেয়াল রেখেছি। একটা থেকে আরেকটা যেন আলাদা হয়Ñ এ বিষয়ে সচেতন থেকেছি।

আপনার শুরু তো ছোটগল্প দিয়ে। এখনো উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্প লিখছেন। এই সময়ের ছোটগল্পের ধারা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

আমার প্রথম গল্পের বই ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। তখনকার আর এখনকার ধারা তো আর এক থাকবে না। লেখার ফর্ম ভাঙবে, নতুন ফর্ম তৈরি হবে। এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। কিছু হয়নি বলে উড়িয়ে দেওয়ারও কিছু নেই। আমি তো নতুন লেখকদের লেখা পড়ি এবং অনেকের লেখা আমার ভালোও লাগে। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলি। ওদের জানার আগ্রহ দেখে আমি আশান্বিত হই। মনে মনে ভাবি, জায়গাটা এখনও শূন্য হয়ে যায়নি। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই আসবে। এখন এই যে ইন্টারনেট, ফেসবুক নিয়ে মেতে আছে মানুষ, তাই বলে কি বই পড়া বাদ দিয়েছে? বইমেলায় বইও কিন্তু কম বিক্রি হয় না। নতুন যারা লিখছে তাদের উদ্দেশে আমি বলব, গল্পটা বলতে জানতে হবে। গল্প পেলে পাঠক তা গ্রহণ করবেই। লেখার জন্য পড়াটা খুব জরুরি। যা লিখবে সেটা সম্পর্কে ভালো করে জানতে হবে, দেখতে হবে। লেখকের দেখা হবে সর্বাঙ্গীণ, খুঁটিয়ে। আমি যখন যে উপন্যাস লেখা শুরু করেছি, আগে প্লটটা সম্পর্কে জেনে-বুঝে একটা স্পষ্ট ধারণা নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যখন লেখি তখনো প্রচুর পড়াশোনা করি, তথ্য সংগ্রহ করি। আর আমার নিজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আমি যখন আদিবাসীদের কিংবা উপকূলীয় মানুষদের নিয়ে লিখেছি তখন ওদের কাছে গিয়ে থেকেছি। ওদের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছি। জীবনযাত্রা, সমস্যা-সংকট জানার চেষ্টা করেছি। এ না হলে তো হবে না। এই যে আজকের রোহিঙ্গা সংকট এটা তো সেই ’৯৭ সাল থেকে। আমি তখন গিয়েছিলাম ওখানে। ইচ্ছে ছিল নাফ পার হয়ে বার্মায় চলে যাওয়ার। কিন্তু তখন পরিস্থিতি খারাপ থাকায় আর যাওয়া হয়নি।

একজন নারী লেখক হয়ে আপনি যে জায়গাটায় পৌঁছে গেছেন এই সময়ের নারী লেখকদের অবস্থান সম্পর্কে বলুন।

প্রথমত হচ্ছে, লেখকের আবার জেন্ডার কী! লেখক মানে শুধুই লেখক। নারীরাও যথেষ্ট ভালো লিখছেন। আসলে আমাদের সমাজে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারীদের লেখক হিসেবে খুব একটা দেখা হয় না। আর নারীদের সাহিত্যচর্চাটা অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে করতে হয়। সাহিত্যচর্চায় নিরবচ্ছিন্ন সাধনা লাগে। সেই সুযোগ কয়জন নারী পান? সংসারের সব দায়িত্ব পালন করেই একজন নারী পড়াশোনা এবং লেখালেখির সুযোগ পান। পুরুষদের এই ঝামেলা কমই পোহাতে হয়। আমার নিজের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমি তখন বাংলা একাডেমিতে চাকরি করি। হাতের কাজ সেরে লেখালেখি করতাম। মহাপরিচালকের কানে এই কথাটা কেউ দিয়েছিল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নাকি অফিসে লেখালেখি করো? আমি উত্তর দিয়েছিলাম, কাজ শেষ করে সময় পেলে লেখি। আমি তো বাইরে গিয়ে চা-সিগারেট খেয়ে সময় নষ্ট করি না!

এই যে এত লেখালেখিÑ নিজেকে আপনার কতটা সফল মনে হয়?

নিজেকে আমি কী মূল্যায়ন করব! আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী, সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। যখন যা লিখেছি সততার সঙ্গে করেছি। কিছু পাওয়ার আশায় তো মানুষ কাজ করে না। আমিও করিনি। তবু এক জীবনে যা পেয়েছি তা কম তো নয়! এই এত মানুষের কাছে আমার লেখা যাচ্ছে, এটা আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আমার কাছে এটা গভীর আনন্দের।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে