নাজমুল হক নজীর

বাঙালি সংস্কৃতির কবি

  অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাজমুল হক নজীরের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, আর ১৯৭১ সালে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে প্রবল দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন এবং পরবর্তীকালে তিনি জাতির কল্যাণে কলম ধরেছেন। কবি নাজমুল হক নজীর একজন উদার মনের মানুষ ছিলেন। তিনি তার ‘স্বপ্ন বাড়ি অবিরাম’ কাব্যগ্রন্থে ‘আমি চলে যাই’ কবিতায় লিখেছেনÑ ‘তাহলে এভাবেই আমি চলে যাই /খোলা থাক সমস্ত দরজা/ জ¦লতে থাক মঙ্গলদ্বীপ’

একজন মানুষ কতটা উদার মন-মানসিকতাসম্পন্ন হলে মৃত্যুর আগেই চলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ বিদায় নেওয়ার সময়ও মানুষের জন্য, সমগ্র সৃষ্টির জন্য তার কল্যাণ কামনা ছিল। একজন কবি আসলে সেটিই করেন, একজন কবি তার সময়ের অনেক আগেই তিনি দেখেন এবং তার কবিতায় সেগুলো বর্ণনা করেন। কবি নাজমুল হক নজীর সেই নজির স্থাপন করেছেন এবং তার পাক্ষিক ‘নজীর বাংলা’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি জনসেবা, জনগণের সেবা করেছেন। সংস্কৃতি সম্পর্কে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বলেছেন, একটা দেশের সংস্কৃতি শিল্প সাহিত্য সে দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তা না হলে সে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে না। বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আমরা যে গর্ব করি, অহঙ্কার করি তার মূল কারণ এটা আমাদের এ ভূখ-ের মাটি থেকে উৎসারিত এবং আমাদের সংস্কৃতি মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের সব পর্যায়ের, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালন করে, ধারণ করে সেটিই মূলত আমাদের শ্বাশত সংস্কৃতি এবং সেই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ছিলেন কবি নাজমুল হক নজীর।

তার নাম যেমন নজীর, তিনি তার কাজকর্মেও নজির স্থাপন করেছেন। সত্যনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন বলে তিনি গ্রামে বসেও কবিতাচর্চা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চা করতে পেরেছেন। তিনি সংস্কৃতিচর্চা ও সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আর সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতা এ দুটির মূল চালিকাশক্তি হলো সত্য উপস্থাপন। আমরা জানি, সাংবাদিকতার মূল কাজ হলো সত্য অনুসন্ধান করা, সত্য প্রকাশ করা, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করা এবং নিজেকে সত্যনিষ্ঠ করা আর সেই কাজটিও কবি নাজমুল হক নজীর তার জীবদ্দশায় করে গেছেন এবং একই সঙ্গে সংস্কৃতি চর্চা করেছেন, সংস্কৃতির বিকাশ সাধনের চেষ্টা করেছেনÑ এর মাধ্যমে তিনি মানুষকে সংস্কৃতিমনা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি যে কবিতা লিখে গেছেন, এর মধ্যে যে কবিতাটি আমি আবৃত্তিকার অপু শহীদের মুখে শুনেছি, সেটি ‘আয়নায় আপন অবয়ব’, এ কবিতার মূল উপজীব্য বিষয় হলো সংস্কৃতিবান মানুষ হওয়া, সংস্কৃতি মনস্ক হওয়া।

আজকের পৃথিবীতে নানা সমস্যার মধ্যে একটি সমস্যা হলো জঙ্গিবাদের সমস্যা। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলো পৃথিবীকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। যারা এই জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, কারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাদের নানা পরিচয় দেওয়া যেতে পারে, তবে তাদের বড় পরিচয় হলো তারা সংস্কৃতিবোধহীন মানুষ, তাদের মধ্যে সংস্কৃতিচর্চা নেই। যাদের মাঝে সংস্কৃতিচর্চা নেই তারা অন্ধকারের মধ্যে আছে, অজ্ঞতার মধ্যে আছে, অজ্ঞানতার মধ্যে আছে। এই অজ্ঞতার কারণে তারা অন্ধ অবস্থার মধ্যে আছে। অন্ধ অবস্থার মধ্যে থাকলে মানুষ যা করতে পারে এই জঙ্গিবাদীরা তাই করছে। আর অন্ধত্ব তাদের সমাজের এমন একটা জায়গায় নিয়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে তারা অন্ধের মতো বিচরণ করছে। এই অন্ধত্ব নিবারণের জন্য একজন মানুষ, যার চোখ নেই তার দেখতে অসুবিধা হয়; কিন্তু তিনি দেখেন, তিনি তার মনের চোখ দিয়ে দেখেন। মনসচক্ষু তার বাহ্যিক চক্ষুর চেয়ে অনেক বেশি প্রখর, এ কারণে তিনি অনেক কিছু দেখতে পারেন । কিন্তু যাদের চোখ আছে (জঙ্গিগোষ্ঠীর) সেই চোখ দিয়ে তারা দেখতে পায় না, কারণ মনের চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। কবি নাজমুল হক নজীর তিনি মনের চোখ জাগ্রত/উন্মোচনের কথাই বলেছেন তার কবিতার মাঝে, তার সাংবাদিকতার মাঝে, তার লেখনীর মাঝে। আমরা তার সেই কথাগুলো যেন মনে রাখি। কবি নাজমুল হক নজীরের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন তখনই যথার্থ হবে, যখন কবি যে লক্ষ্য নিয়ে জীবনযাপন করে গেছেন, যে লক্ষ্য নিয়ে কবিতা রচনা করে গেছেন সেটা যদি আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করি এবং কবি নজীরকে উপলব্ধিতে আনতে হবে, কবিকে যদি আমরা বুঝতে চেষ্টা করি তাহলে আমাদের মনের চোখকে জাগ্রত করতে হবে। জঙ্গিবাদের যে খারাপ অবস্থা আমাদের সমাজে বিরাজ করছে, সেখানে এই সংস্কৃতিচর্চা এ অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে। সংস্কৃতিবোধসম্পন্ন মানুষ হলে মানুষের ভেতরে অজ্ঞতা, অন্ধকার থাকতে পারে না। ফলে তাদের দ্বারা জঙ্গিবাদের মতো জঘন্য কাজকর্ম সংঘটিত হতে পারে না। কবি নজীর, মানুষের ভেতরের এই অন্ধকার দূর করে মানুষকে আলোর পথে আনার চেষ্টা করেছেন। তার কর্ম দ্বারা এটা আজ প্রমাণিত।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে