অন্তহীনতার কবি, অন্তরঙ্গতার কবি ফজল শাহাবুদ্দীন

  শাহীন রেজা

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

 

কবিতার সঙ্গে যার নিত্যবসবাস, সমস্ত চিত্তে, সমগ্র অস্তিত্বে যিনি কবিতাকে; শুধু কবিতাকে ধারণ করে এগিয়ে চলেন, তিনি তো শুধু কবিÑ সাধারণ একজন কবি হতে পারেন না। ফজল শাহাবুদ্দীন সত্যিই সাধারণ কোনো কবি ছিলেন না। যিনি প্রেমকে একা এবং একপক্ষের নিরিখে শনাক্ত করেন, যার কবিতায় উঠে আসে ত্রিশ লাখতম জন্মদিনের কথা, বেঁচে থাকাকে যিনি তুলনা করেন অন্তহীন, মৃত্যুহীন, সমাপ্তিহীন এবং বিলয়হীনতার একটি অংশ হিসেবেÑ তিনি কি সত্যিই অন্য দশজনের সংজ্ঞায় প্রথিত হতে পারেন?

ফজল শাহাবুদ্দীন অন্তহীনতার কবি, অন্তরঙ্গতার কবি। তার কবিতা যেমন জীবনকে ছুঁয়ে গেছে তেমনি মৃত্যুকেও। সময়হীনতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানকারী এ কবি চিরকাল ছিলেন অচিন্তনীয় এক আধ্যাত্মিকতায় মশগুল। তার কবিতা কখনো অন্তরীক্ষকে স্পর্শ করেছে, কখনো নক্ষত্রপুঞ্জকে ধারণ করে হয়ে গেছে সঘন রাত্রির একান্তকোরাস, আবার কখনো তা নদীর সংগীত, কখনো অরণ্যমর্মর। তার কবিতা যেমন স্পর্শ করেছে আততায়ী সূর্যাস্ত তেমনি তার আকাক্সক্ষায় ধ্বনিত হয়েছে এক অদ্ভুত অসুন্দর। অন্তর্গত হাহাকার বুকে এগিয়ে চলা কবি ফজল শাহাবুদ্দীন তৃষ্ণার অগ্নিতে পুড়ে পুড়ে খাঁটি হওয়া এক কবিসত্তা। প্রাণের গভীরে প্রথম রিপুর জ্বালা বহনকারী সেই অষ্টাদশীর মতো যিনি অন্তরের চাঁদকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন এবং করেই গেছেনÑ একান্তভাবে।

ফজল শাহাবুদ্দীনের যাত্রা ছিল স্রোতের বিপরীতে। অন্য সবাই যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছে, ফজল শাহাবুদ্দীন শুরু করেছেন ঠিক সেখান থেকেই। তার কাছে শ্রাবণ যেন বোদলেয়ারের নিদ্রাহীন রাত্রি, জীবনানন্দের জোছনাভেজা বিল, আর শীত; রিলকের কবিতার ঝরাপাতার সংলাপ। ফজল শাহাবুদ্দীনের কাছে রমণী যেন শুধু একজন রক্তমাংসের রমণী নয়, তার আকাক্সক্ষায় ধ্বনিত রমণীর শরীর যেমন পরিপূর্ণ আগ্রাসনের তীক্ষèতায় বেজে ওঠা একটি কামজ টংকার তেমনি সেখানে স্থিত ঈশ্বরের জ্যোতিষ্মান অথচ অদৃশ্য অবয়ব, যার গভীর ও অন্তরঙ্গ স্পর্শে মুহ্যমান নভোম-ল, নিহারিকাপুঞ্জ এবং ধরিত্রীর সব সুন্দর। ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতার একটি একান্ত সুরÑ তার প্রিয় দেশ, প্রিয় ভূমি জন্মভূমি বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ তার কবিতায় যতটা উচ্চারিত ততটাই আকাক্সিক্ষত, ততটাই ধ্বনিময় এই দেশ এবং এই প্রকৃতির চঞ্চলতা, মেঘ ও সূর্যের লুকোচুরি, হেলেঞ্চা বন আর মোহনীয় মেঘনা।

ফজল শাহাবুদ্দীনের কাছে ‘বাংলাদেশ’ মানে ছিল বেঁচে থাকার অন্য নাম। অঙ্গে অঙ্গে জীবনের গাঢ়তম স্পন্দন আর কোটি কোটি অসহায় বিপন্ন মানুষের নতুন করে বেঁচে থাকার অবিশ্বাস্য সংগ্রাম। শান্ত হেমন্তের শস্যভারাক্রান্ত মাঠ এবং বৃষ্টি বধির বর্ষাকে অতিক্রম করে যা তার কাছে ছিল শুধু জীবন ধারণের একটি অংশমাত্র। কবি ফজল শাহাবুদ্দীন কবিতায় যতটা গভীর, যতটা নিবিড় ছিলেনÑ ব্যক্তিজীবনে ততটা নন। কবিতা যদি তার কাছে প্রার্থনা হয় তাহলে আড্ডা তার এক অনল অভ্যাস। অনর্গল কথা বলা, কথার ওপর কথাকে ছড়িয়ে দেওয়া ছিল তার একটি একান্ত স্বভাব। আর এই স্বভাবের মধ্য দিয়ে তিনি সমবয়সী থেকে শুরু করে তার পুত্রবয়সী কিংবা তার চেয়েও ছোট কোনো একজনের বন্ধুতে পরিণত হয়েছেন নিমিষে। কবিতার পর তিনি যে কাজটিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন, তা হচ্ছে আড্ডা। আড্ডার ক্ষেত্রে তিনি কোনো বয়স মানেননি। কত প্রগলভ দুপুর, বিষণœ সন্ধ্যা আমরা তার সঙ্গে আড্ডা মেরে কাটিয়েছি। হারুন এন্টারপ্রাইজের ছোট্ট শীতাতপ কক্ষটি কথার তুবড়িতে কখন যে উত্তপ্ত হয়ে গেছে, আমরা টেরই পাইনি। আড্ডার বিষয় নিয়ে তিনি কখনো মাথা ঘামাতেন না। যে কোনো বিষয়Ñ এমনকি তার পোষা বিড়ালটিও কখনো কখনো উঠে এসেছে আড্ডার টেবিলে। এ আড্ডা কোনো কোনোদিন অফিস ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে নয়া দিগন্ত পত্রিকা অফিসের নিচের কোনো রেস্টুরেন্টে, কখনো একটি নির্দিষ্ট কফিশপে, কোনো কোনোদিন রমনা কালীমন্দিরের পুকুরঘাটে, আবার কোনোদিন সেই সুদূর চিটাগাং রোডের বিসমিল্লাহ রেস্টুরেন্টে। আড্ডায় যত বিষয়ই থাক সবকিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছে ‘কবিতা’। যার একান্ত ঘোরে নিমজ্জমান তিনি এবং আমরা তার ভাষায়Ñ যারা তার সতীর্থ। ফজল ভাইয়ের আড্ডায় নিয়মিত সাথী ছিল অনেক। কতজনের নাম বলবÑ কবিবন্ধু চিত্রনায়ক হারুন, কবি আল মুজাহিদী, মাহবুব তালুকদার, সজল আরেফিন, মাহবুব হাসান, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, জাকির আবু জাফর, জামালউদ্দিন বারী, কামরুজ্জামান, নুরুল হক আরও কতÑ কতজন।

ফজল শাহাবুদ্দীনের কাছের বন্ধু হারুনÑ এককালের সাড়া জাগানো চিত্রনায়ক। একই অফিসে পাশাপাশি রুমে তারা কাটিয়ে দিয়েছিলেন চল্লিশটি বছর। তার আরেক বন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একজন রাজনীতিবিদ, একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি কি কোনো কবির বন্ধু হতে পারেন? ফজল শাহাবুদ্দীনের স্বপ্রতিভ উত্তর ছিল, বন্ধুত্ব শব্দটি আপেক্ষিক। বন্ধুত্ব মানুষে মানুষে হয়। কবিতে-কবিতেও। এরশাদের সঙ্গে বন্ধুত্বকে আড়াল করার কোনো প্রবণতা তার মধ্যে কখনই লক্ষিত হয়নিÑ এমনকি যখন এরশাদের দালাল হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার প্রাণনাশেরও চেষ্টা চালানো হয়, তখনো।

ফজল শাহাবুদ্দীন একটি লেখায় আমাকে এবং জাহাঙ্গীর ফিরোজকে তার প্রিয় সতীর্থ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার এই বিনয় আমার মাঝে ‘মানুষ ফজল শাহাবুদ্দীন’কে আরও বিস্তৃত, আরও বর্ণাঢ্য করেছে। ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তেভেজা কঙ্কাল পরিবৃত একান্ত প্রকৃতির একমাত্র অধীশ্বর ফজল শাহাবুদ্দীনÑ বাংলা কবিতার একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। অসংখ্য পাঠের মধ্য দিয়ে যিনি আমার কাছে শনাক্ত হয়েছিলেন বাংলা ভাষার একমাত্র নক্ষত্র পুরুষ হিসেবে। তার দেহত্যাগের তিনটি বছর অতিক্রান্ত হলো ৯ ফেব্রুয়ারি। এই ৩টি বছরজুড়েই তিনি ছিলেন আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি। আমরা তাকে অনুভব করেছি প্রতিটি ক্ষণÑ আর এভাবেই হয়তো করে যাব সারাটি জীবন।

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে