আয়না

মূল : ফারাহনাজ আব্বাসি অনুবাদ : ফজল হাসান

  অনলাইন ডেস্ক

২১ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর মাহবানু একই পোশাক পরিধান করে এবং আয়নার সামনে বসে থাকে। অনেক সময় কোরআন শরিফ খুলে সুরা ‘নিসা’ পাঠ করে। পাঠ করা শেষ হলে সে কোরআন শরিফ বন্ধ করে টেবিলের মাঝে রাখে এবং রহমানের ফিরে আসার প্রতীার প্রহর গোনে। সেই অপোর দীর্ঘ সময়ে সে প্রজ্বলিত মোমবাতির লিকলিকে অগ্নিশিখার দিকে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাইরে থেকে দরজার ছিদ্রপথে চাবি ঢোকানোর শব্দে তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি দ্রুত হয়। একসময় দরজার পাল্লা খুলে যায়। চার কদম এগিয়ে এসে রহমান ঘরে প্রবেশ করে। তখন সে উঠে দাঁড়ায় এবং পরনের পোশাক ও মাথার চুল ঠিকমতো আছে কিনা, তা পরখ করে। সে চার ঘণ্টা আগে পোশাক পরেছে এবং পরিপাটি করে চুল বেঁধেছে। তার ঘাড়ের ওপর চুলের গোছা ঝুলে আছে। রহমানের ফিরে আসা পর্যন্ত সে অপো করে। তাকে সেই সুসজ্জিত ও পরিপাটি পোশাকে দেখে রহমান মিটিমিটি হাসে। মাহবানু উঠে এসে রহমানকে জড়িয়ে ধরে এবং তার কাঁধে আলতো করে মাথা রাখে। এভাবেই কয়েক মিনিট কেটে যায়। স্বভাবতই তখন তার চোখের পাতা বন্ধ থাকে। রহমান পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মাহবানুর জন্য কিনে আনা উপহার খোঁজে। আসার সময় সে উপহার সযতেœ রঙিন কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে এনেছে। একসময় রহমান উপহার বের করে মাহবানুর উষ্ণ নরম হাতে তুলে দেয়। উপহার পেয়ে মাহবানুর ঠোঁটের ফাঁকে হাসি ফুটে ওঠে এবং শিশুদের মতো আনন্দ-খুশিতে ডগমগ করে। তারপর সে ডাগর কালো চোখ খোলে এবং রহমানকে রীতিমতো টেনেহিঁচড়ে টেবিলের কাছে নিয়ে যায়। তারা আয়নার সামনে ঘণ্টাখানেক বসে থাকে। তখন মাহবানু কোরআন শরিফ থেকে সুরা ‘নিসা’ পাঠ করে রহমানকে শোনায়। রহমানের একঘেয়েমি লাগে। সে বলে, ‘তুমি কী অনেকবার পাঠ করোনি?’ অভিমানে মাহবানুর চোখেমুখে বিরাগ ভাব ফুটে ওঠে এবং ভ্রু কুঁচকে সে স্বামীর দিকে তাকায়। রহমান নিশ্চুপ। তার মুখে কোনো রা নেই।

বানু আয়নার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একাকী বসে থাকে। যদিও তাকে দেখার জন্য রহমান প্রতিবছর আসে, তবে দীর্ঘ সময় সে একা বাস করে। রহমান ঠিক সময়মতো বছরে একবার বাড়ি আসে। রহমান এসেই দরজার বাইরে দাঁড়ায় এবং আদুরে গলায় স্ত্রীকে ডাকে। বানু উঠে গিয়ে দরজায় চাবি ঢোকানোর ছিদ্রপথে তাকায়। রহমানের মাথা থেকে পা অবধি সাদা পোশাকে আবৃত।

রহমানকে উদ্দেশ করে বানু বলল, ‘না, রহমান। যাও, তোমার সাদা পোশাক বদল করে আসো।

রহমান চলে যায়।

রহমানের চলে যাওয়ার পর বানু আয়না ও জ্বলন্ত মোমবাতির শিখার দিকে তাকায়। একসময় দরজার ছিদ্রপথে চাবি ঢোকানোর শব্দ তার কানে ভেসে আসে এবং পায়ের আওয়াজ ক্রমেই এগিয়ে আসে : এক, দুই, তিন, চার। বানুর হৃৎপি-ের ভেতর ধুকপুকানির শব্দ দ্রুত হতে থাকে। দরজার কাছে আসার পর পায়ের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। বানু জানে, রহমানের পায়ের আওয়াজ। বানু উঠতে চাইল, কিন্তু পারল না। তার মনে হলো, শরীরে কোনো তাকত্ নেই। সে গালে পাউডার মেখেছিল। অথচ দীর্ঘ সময়ে সেই পাউডার মুছে গেছে। তাই তার মুখ বিবর্ণ দেখাচ্ছে। বিনুনি করা মাথার চুল তার উরজের ওপর ঝুলে আছে। একসময় সে উঠে দাঁড়ায় এবং দরজার দিকে এগিয়ে যায়। আবার সে দরজার ছিদ্রপথে চোখ রাখে। এবারও রহমানের পরনে সাদা পোশাক।

বানু বলল, ‘না, রহমান, কাপড় পাল্টে আসো।’

উত্তরে রহমান বলল, ‘বানু, তুমি কী দরজা খুলবে না?’

অন্য সময়ের তুলনায় সেই সময় বানুর হাত আরও বেশি কাঁপতে থাকে। সে দরজার ফাঁকে চাবি ঢোকায়। কাপড় বদলানোর একই কথা রহমানকে আর বলতে চায় না। আসলে রহমানের কাছ থেকে সে দূরে থাকতে নারাজ। অবশেষে দরজার পাল্লা খুলে যায়। রহমান ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। তারপর সে বানুর দিকে এগিয়ে যায়। সাদা কাপড়ে রহমানকে সত্যি ভয়ঙ্কর দেখায়। আচমকা বানু সামান্য পেছনে সরে যায়। আগে যেভাবে রহমানকে জড়িয়ে ধরত, সে এখন সেভাবে জড়িয়ে ধরতে চায় না।

রহমান বলল, ‘তুমি একাকী থাকার সময় এই পোশাক কতবার পরেছ? এখন কিন্তু আমি তোমার কাছে এসেছি।’

রহমানের দুর্বল ও ঋজু দেহের দিকে বানু তাকিয়ে থাকে। বানুর হাত রহমান নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘তুমি কী তোমার উপহার চাও না?’

বানু হাসতে থাকে। তবে এই হাসি তিরিশ বছর আগের হাসির মতো নয়। এই হাসি শান্তপ্রকৃতির ও শব্দহীন। সে দুর্বল দৃষ্টির চোখের পাতা বন্ধ করে।

রহমান বলল, ‘না, বানু। এভাবে চোখ বন্ধ রাখলে হবে না। তুমি কী আমার সঙ্গে যাবে?’

বানুর চোখেমুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবুও সে বলল, ‘হ্যাঁ, রহমান। যাওয়ার জন্য এখনই সময়।’

রহমান এক ঝটকায় বানুকে কাছে টানে। বানু ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পেছন ফিরে তাকায়। নিজেকে সে ধবধবে পোশাকে আয়নার সামনে বসে থাকতে দেখে। সে বলল, ‘রহমান, বানুকে দেখো...!’

রহমান বানুকে আরও কাছে টানে। ঘর থেকে টেনে বের হওয়ার সময় বানু দেখতে পেল পরনের বিয়ের সাদা পোশাক ক্রমেই খুলে টেবিলের ওপর জড়ো হচ্ছে এবং জ্বলন্ত মোমবাতির শিখা নিভিয়ে দিচ্ছে।

মাহবানুকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে রহমান।

লেখক পরিচিতি : ফারাহনাজ আব্বাসি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে যেটুকু পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায় তিনি ১৯৮৮ সালের শুরুর দিকে ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে প্রকাশিত ‘আদিনেহ্’ ম্যাগাজিনে ‘আয়না’ গল্প প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন। ফারসি ভাষায় তার ছোটগল্প সংকলন ‘রাজ-এ-সার-বে মোহর’ (ইংরেজিতে ‘সিলড সিক্রেট’) প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। বর্তমানে তিনি ইরানের সিরাজ শহরে বসবাস করছেন।

গল্পসূত্র : ‘আয়না’ গল্পটি ফারাহনাজ আব্বাসির ইংরেজিতে ‘দ্য মিরর’ গল্পের অনুবাদ। ফারসি ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ফারজিন ইয়াজদানফার। ইংরেজিতে গল্পটি হেসমত মোয়াইয়াদ সম্পাদিত ‘স্টোরিজ ফ্রম ইরান : এ শিকাগো অ্যান্থলজি ১৯২১-১৯৯১’ ছোটগল্প সংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে