মায়ের ছোঁয়া

  প্রতিভা রানি কর্মকার

২১ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্কুল থেকে বেরিয়ে কাঁধে ভারী ব্যাগ নিয়ে হেঁটে বাড়ি আসছিল কাব্য আর তার মা সাদিয়া। ব্যাগটি সাদিয়ার এক হাতে আর এক হাত দিয়ে সে কাব্যের নরম হাতটি ধরল। কিন্তু কাব্য হাতটি সরিয়ে নিল। আসলে ওর মন ভালো নেই। কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। কাব্যের মনের আকাশে আজ মেঘ জমে আছে। সাদিয়া জানে কেন কাব্যের মন ভালো নেই। মা-ছেলে চুপচাপ সারা গায়ে রোদ মেখে পুরনো একতলা বাড়ির গেটে ঢুকল। কাব্য যথারীতি হাত-মুখ ধুয়ে টিভির রিমোট হাতে নিতেই সাদিয়া ওর মাথায় ঠা-া হাত রাখল। মনে হলো শীতল বাতাস আদর করছে কাব্যকে। আসলে কাব্যের মন ভালো করার উপায় সাদিয়ার জানা আছে। কিন্তু সাদিয়া চায় কাব্য বাস্তবতার আলোকে পথ চলুক। পহেলা বৈশাখে কাব্য চেয়েছিল অনেক দামি সাইকেল, যেটা চালিয়ে ও স্কুলে যাবে। একটুখানি পথ হেঁটে যেতে হয়। কিন্তু সাদিয়া সেটা না দিয়ে ওদের বাড়ির কাজের দিদি সুখীর মেয়ে ‘কথা’কে অৎঃ ঝপযড়ড়ষ এর ঋড়ৎস কিনে দেবে বলেছে। আরও বলেছে, এবারের বৈশাখ নাকি অন্যরকম হবে। কাব্য ভাবে মায়ের তো সবই অন্যরকম। যেমন সবাই যখন পান্তা-ইলিশ খায়, ওরা রোজকার খাবারের সঙ্গে বাড়তি একটা পদ বা দই-মিষ্টি। বিকালে ভালো জামা পরে পার্কে হাঁটতে যায় আর রাতে মায়ের কাছে শুয়ে গল্প শোনে। কাব্য এটাও বুঝতে পারে না যে, ‘কথা’ কীভাবে আঁকতে শিখবে! আসলে কথা কাব্যের সমবয়সী। দেখতে পারে, চলতে পারে, শুনতে পারে, বুঝতেও পারে কিন্তু বলতে পারে না। কথা সুযোগ পেলে কাব্যের সাদা খাতায় রঙ-পেনসিল দিয়ে ছবি আঁকে। সবুজ ক্ষেত নয়তো সাদা সাদা মেঘে নীল নৌকার মতো কিছু। সাদিয়া কথার মাঝে কী সুপ্ত প্রতিভা দেখেছে সেটা কাব্য বুঝল না। দুপুরের খাবারের পর কাব্য যখন আবার মায়ের গলা জড়িয়ে আবদার করল, ‘মা চলো না আমরা সাইকেলটা নিয়ে আসি।’ সাদিয়া আলতো করে চুমু খেয়েছিল কাব্যেকে আর বলেছিল, ‘মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচে না। সমাজের প্রতি তার কিছু কর্তব্য থাকে। মানুষ আর প্রাণীর মধ্যে এটাই পার্থক্য। তা ছাড়া তুমি যখন কষ্ট করে কিছু পাবে তখন সেটা অনেক মধুর মনে হবে।’ কথাগুলো বলতে বলতে মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কাব্যের মন খারাপ কখন উধাও হয়েছিল টের পায়নি সেদিন। আজ এত বছর পর পহেলা বৈশাখে মায়ের কথা মনে পড়ছে বারবার। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কথা চৌধুরী আসবে ‘সাদিয়া আর্ট ফাউন্ডেশনের’ তিনতলা উদ্বোধন করতে। ডা. কাব্য এখন গাড়ি-বাড়ির মালিক। যদিও অল্প রাস্তা হেঁটেই চলেন। আজও তিনি যখন হাঁটছিলেন তার গায়ে শীতল বাতাসের ছোঁয়া অনুভব করেন। মনে হচ্ছিল এটা তার মহীয়সী মায়েরই ছোঁয়া।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে