১ হাজার রুপিতে শুরু টাটার যাত্রা

  ইশরাতুল জাহান

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি ভারতের, প্রায় দেড়শ বছর আগে শুরু করেছিলেন পারস্য থেকে আসা এক উদ্যমী যুবক। বিশ্বের ১০০টি দেশে শতাধিক কোম্পানি গড়ার মাধ্যমে এখন ব্যবসা পরিচালনা করছে, বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির কর্মীর সংখ্যা ছয় লাখেরও বেশি। ২৯টি কোম্পানির শেয়ার রয়েছে বাজারে। এতে পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন ৪১ লাখ বিনিয়োগকারী। বছরে শুধু সরকারকেই রাজস্বের জোগান দিয়ে থাকে ৪১ হাজার কোটি রুপি। হ্যাঁ, বলছিলাম ভারতের বিখ্যাত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান টাটা গ্রুপের কথা।

বর্তমানে ভারতের সর্ববৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে টাটা। এর প্রতিষ্ঠাতা মূলত জামশেদজি টাটা নামের এক পার্সি যুবক। বাবার কাছ থেকে ১ হাজার রুপি ধার করে আসেন ভারতে। সেটি ১৮৬০ সালের কথা। তখন ভারতবর্ষ ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের উর্বর ক্ষেত্র। ইংরেজ বণিকরা তখন ভারতবর্ষে দাপিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এই পার্সি যুবক বারবার উদ্যোগ নিয়েও ব্যবসা দাঁড় করতে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু যাওয়ার সময় ওই সময়ের খ্যাতিমান সন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তার উপদেশ শুনেই শেষবারের মতো ভারতের বিহারে শুরু করেন লোহার ব্যবসা। সেই ব্যবসার মুনাফা থেকে পুঁজি বাড়িয়ে ১৮৬৮ সালে মাত্র ২১ হাজার রুপি পুঁজি নিয়ে প্রতিষ্ঠান করে টাটা। সেই লোহার ব্যবসা দিয়ে শুরু। এখনো টাটার প্রধান ব্যবসা লোহাকেন্দ্রিক। অর্থাৎ গাড়ির ব্যবসা। পরে এর বিকাশ ঘটে রতন এন টাটার হাত ধরে; যিনি গ্রুপের বর্তমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজি টাটার মৃত্যুর পর তার ছোট ছেলে এর দেখভাল করছিলেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি রতন টাটার বাবা নাভাল টাটাকে দত্তক নিয়েছিলেন। নাভাল টাটার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে টাটা স্টিলে কাজের মাধ্যমে। শুরুতে নাভার টাটা ব্লাস্ট ফার্নেস সরানোর কাজ করতেন। নাভাল টাটার ছেলে রতন টাটাও একই কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। ১৯৯১ সালে রতন টাটার মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মূল্যায়ন করে তাকে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান করেন। তিনি ধীরে ধীরে ভারতের একটি সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করান। এটি হয়ে ওঠে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস ও ঝুঁকি নিয়ে রতন টাটা দেখিয়ে দিলেন মানুষ চাইলে স্বপ্নকেও ছুঁয়ে দেখতে পারে।

রতন টাটা এই গ্রুপকে শুধু ভারতে নয়, নিয়ে গেছেন এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে। ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন বহু দিকে। টাটা মোটরসের অনেক যন্ত্র ও টাইটান ঘড়িকে আরও আধুনিক ও সুন্দর ডিজাইন দিয়েছেন রতন টাটা। ট্রাক থেকে লরি, প্রাইভেট কার, দামি গাড়ি সবই আছে টাটার দখলে। এখনো গাড়ি প্রস্তুতকারক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে টাটাকেই সবাই চেনেন। ১৯৯৮ সালে বহুজাতিক এ প্রতিষ্ঠানটি টাটা ইন্ডিকো নামে প্রথম প্যাসেঞ্জার কার বাজারে আনে। অল্প খরচে বেশি মাইল চলার ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেই টাটাই। যে কারণে দুই বছরের মধ্যে গাড়িটি ভারতে এক নম্বর স্থান দখল করে। ভারতের সবেচেয়ে বড় গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত লাভ করে টাটা। আর এ সময়ে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সবার নজর কাড়ে সেটি হচ্ছে, টাটা গ্রুপ দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করছিল। যে কারণে ভারতে টাটা গ্রুপের পণ্য দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময়েই টাটা মোটরস জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার বাজারে আনে। এটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় সারা বিশ্বে। শুধু কি গাড়ি ব্যবসা? বেভারেজ কোম্পানি হিসেবে টাটা হয়ে ওঠে সারা বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়। অনেকেই হয়তো শুনেছেন টেটলি টি-এর নাম। যুক্তরাজ্যের এক নম্বর চা কো¤পানি হিসেবে পরিচিতি পায় এটি। দেশের সীমা ছাড়িয়ে টাটা স্টিল ইউরোপে লিমিটেড কোম্পানি গঠন করে। আর লন্ডনের বাজারটি কব্জা করে নেয় তার আগেই। 

নিউইয়র্কের পিয়েরে হোটেলও টাটার। ভারতের সবচেয়ে বড় স্টিল কো¤পানিটি বৃহত্তম আউটসোর্সিং ফার্মটিও টাটার। টেলিকম সেক্টরেও টাটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে টাকা।

এগুলো ছাড়াও বর্তমানে টাটা গ্রুপের রয়েছে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, খনিজ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানির ব্যবসা। ইদানীং টাটা ভোক্তাদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ভোগ্যপণ্যের দিকেও ঝুঁকছে।

শতাধিক কোম্পানি থেকে বছরে টাটা গ্রুপের রাজস্ব আয় হয় ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপি। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। বাকি ৩৫ শতাংশ ভারত থেকে। ভারতের গোটা শেয়ারবাজারের ৭ শতাংশ টাটা শিল্পগোষ্ঠীর দখলে। ভারতের করপোরেট ট্যাক্সের ৩ শতাংশ আসে এ গ্রুপের কাছ থেকে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদ ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি রুপি। এর মাত্র ৩ শতাংশ রয়েছে টাটা গ্রুপের পরিচালকদের হাতে। বাকি অর্থ বিভিন্ন দেশের জনগণের কাছ থেকে শেয়ার ছেড়ে নেওয়া অর্থ। এগুলোর পরিচালনাও করছে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে।

প্রতিষ্ঠানটি মূলত দুটি ভাগে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। একটি হলো টাটা সন্স, অন্যটি টাটা ইন্ডাস্ট্রিজ। টাটা গ্রুপ মোট আট ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করে। এগুলো হলোÑ তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ, প্রকৌশলী পণ্য ও সেবা, পণ্যদ্রব্য, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য, কেমিক্যাল এবং আন্তর্জাতিক কার্যক্রম।

টাটা গ্রুপের ব্যবসায়িক মাইলফলক বলা যায় ২০০৬ সালে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে বহুজাতিক ইস্পাত কোম্পানি কোরাসকে কিনে নেওয়ায়। ইস্পাত ব্যবসায় আধিপত্য ছড়াতে এটি একটি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত ছিল। এ ছাড়া ২০০৮ সালে ২৩০ কোটি ডলারে ব্রিটিশ গাড়ি প্রস্তুতকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জাগুয়ার-ল্যান্ড রোভারের মালিকানা অর্জন করে টাটা। টাটা গ্রুপের টিসিএসকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা হিসেবে। বিদেশে ভারতীয় হোটেল ব্যবসার সম্প্রসারণে রয়েছে টাটার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। বেভারেজ ব্যবসায় টেটলির কথা বলা যায়। টাটা টির ব্যবসাও ঢেলে সাজানো হয়েছে। এ ছাড়া অলাভজনক টেক্সটাইল ও বেশ কিছু নন-কোর ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এসিসি ও টমকো উল্লে­খযোগ্য। তবে ব্যর্থতাও রয়েয়ে টাটার।

২০০৮ সালে বাজারে টাটা আনে পৃথিবীর সবচেয়ে কম দামের প্রাইভেট কার। টাটা ন্যানো। তখন এর দাম ছিল মাত্র ১ লাখ রুপি, যা ভারতে একটি মোটরসাইকেল থেকেও কম দাম। দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়Ñ ন্যানোকে সবচেয়ে সস্তার গাড়ি বলে। ন্যানো প্রকল্প পুরো মাঠে মারা যায়। বিক্রির নামগন্ধ নেই। এ ছাড়া মানুষের কাছে ন্যানো গাড়িও দৃষ্টিকটু বলে সমালোচিত হয়।

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে