ধার করা ৪০ ডলার পুঁজিতে সিঙ্গারের যাত্রা

  ইশরাতুল জাহান

১৬ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ধার করা মাত্র ৪০ ডলার পুঁজি নিয়ে আজ থেকে ১৬৬ বছর আগে ১৮৫১ সালে শুরু হয়েছিল সিঙ্গারের যাত্রা। যন্ত্রবিশারদ স্যার আইজ্যাক ম্যারিট প্রথমে সিঙ্গার সেলাই মেশিন উৎপাদন করে এগুলো বিপণন করতেন। তার নাম অনুসারে এই কোম্পানির নামকরণ করা হয় সিঙ্গার। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশে সিঙ্গারের কার্যক্রম সম্প্রসারিত। প্রায় ৫৭টি দেশে সিঙ্গারের বিভিন্ন কারখানা রয়েছে। কাজ করছে প্রায় ১২ লাখ লোক। কোম্পানির পণ্যের ভা-ার অর্ধসহস্রাধিক। ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে সিঙ্গার আরও নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আসছে। সিঙ্গারের নতুন সংযোজন গৃহসামগ্রীর পণ্য। অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি এটিও ক্রেতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

হাতের পরিবর্তে যন্ত্রের সাহায্যে সেলাইয়ের প্রচলন হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। বিশ্বের প্রথম শিল্প বিপ্ল­বের সময় সেলাই মেশিন উদ্ভাবিত হয়। তবে এর আগেও সেলাইয়ের কাজে খুব সাধারণ যন্ত্রের ব্যবহার ছিল। ১৮৪৬ সালে এলিয়েস হোউই এই যন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। প্রথমদিকে মেশিনগুলোর নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যা শুধু শিল্প-কারখানায় ব্যবহার করা যেত। তখন যন্ত্রবিশারদ স্যার আইজ্যাক ম্যারিট সিঙ্গার শিল্প-কারখানার পাশাপাশি ঘরে ব্যবহার উপযোগী সেলাই মেশিন তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন। ১৮৫১ সালে ধরা করা মাত্র ৪০ ডলার পুঁজি নিয়ে বাসায় ব্যবহার উপযোগী সেলাই মেশিন উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন। তার নামানুসারেই কো¤পানির নাম রাখা হয় সিঙ্গার। তিনিই প্রথম সেলাই কলে স্কেল সংযোজন করেন। সিঙ্গার মূলত এলিয়াসের সেলাই মেশিনের সামান্য পরিমার্জন সাধন করেন। মেশিনের চাহিদার কারণে এর বিক্রি বেড়ে যায়। বাড়তে থাকে পুঁজির পরিমাণও।

উল্লেখ্য, এর আগে ১৮৫০ সালের পর একাধিক সেলাই মেশিন কো¤পানি গড়ে ওঠে। তারা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে। এলিয়াস সিঙ্গারের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন প্যাটেন্ট আইনভঙ্গের দায়ে। কেননা আগে থেকেই এর প্যাটেন্ট ছিল এলিয়াসের নামে। তিনি মামলায় জিতে যান। সিঙ্গার ও অন্য কো¤পানিগুলো এলিয়াস রয়ালিটি দিতে বাধ্য হয়। পরে ১৮৫৬ সালে সিঙ্গার, হোউই, হুইলার ও উইলসন এবং গ্রুভার ও বেকার মিলে সুইং মেশিন কম্বিনেশন গঠিত হয়। এই চার কো¤পানি তাদের প্যাটেন্ট এক করেন।

এরই মধ্যে সিঙ্গার সেলাই মেশিনের পরিবর্ধনের কাজ হতে থাকে। ১৮৭৬ সালে সিঙ্গার মাল্টিন্যাশনাল কো¤পানিতে পরিণত হয়। কো¤পানিটি পৃথিবীর বৃহত্তম ব্যক্তিগত সেলাই কল তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থান করে নেয়। ১৮৮৯ সালে প্রথম ইলেকট্রিক সেলাই কল বাজারে আনে সিঙ্গার। তখন পৃথিবীজুড়ে এ নমুনার সেলাই মেশিন ছড়িয়ে পড়ে। এ মেশিন ব্যবহৃত হয় হোসিয়ারি শিল্পে। হাত বা পাচালিত মেশিনগুলোর চেয়ে ইলেকট্রিক মেশিন দিয়ে নকশা করা, ফুল তোলা ও বিশেষ ধরনের সেলাইসহ সাধারণ কাজও সহজে এবং কম সময়ে করা যায়। ফলে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

ব্রিটিশ আমলে ১৯০৫ সালে সিঙ্গার প্রথম বাংলাদেশে আসে। পরে ১৯২০ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি শাখা চালু করে। বর্তমানে সারা দেশেই এই কো¤পানির আউটলেট রয়েছে। বাংলাদেশে একাধিক কারখানাও করেছে।

১৯৮৩ সালে সিঙ্গার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। ২০০১ সালে তারা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের দাম ১৮৮ টাকা। তাদের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৭৭ কোটি টাকা। বাজারে প্রায় ৭ কোটি ৬৭ লাখ শেয়ার রয়েছে। প্রতিবছর তারা মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ দিচ্ছে।

সিঙ্গার বিশ্বব্যাপী সেলাই মেশিন, এয়ারকন্ডিশনার, ক¤িপউটার, ল্যাপটপ, ডিভিডি/রুবে প্লেয়ার, ক্যাসেট প্লেয়ার, টেপরেকর্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, ফ্যান, ফ্রিজার, গ্যাস বার্নার, ফ্রিজ, আইপিএস, আয়রন, কিচেন অ্যাপিলিয়েন্স (গৃহস্থালির সামগ্রী), এলইডি/এলসিডি টেলিভিশন, মাইক্রোওয়েভ মেশিন, সিঙ্গার ক্যাবলস, টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন, ওয়াটার হিটার ও ওয়াটার পিউরি ফায়ারসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করছে।

বিভিন্ন দেশে তারা এসব পণ্য কেনার ক্ষেত্রে  গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে মাসিক কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করা। ৩ মাসের মধ্যে সমুদয় টাকা শোধ করতে পারলে কোনো সুদ আরোপ না করা। ৬ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করার সুযোগ রয়েছে। সেলাইয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সিঙ্গার কো¤পানি সারা দেশে সেলাই একাডেমি করেছে। সূচিশৈলী নামে তাদের একটি ফ্যাশন হাউসও রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে