আবারও ইমেজ সংকটে বাংলাদেশ ব্যাংক

  রুমানা রাখি

১৬ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবারও ইমেজ সংকটে পড়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’। এ দফায় ইমেজ সংকট নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে গত ২৩ মার্চ রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের অগ্নিকা- নিয়ে। অগ্নিকা-ের পুরো ঘটনাটি এখনো ‘রহস্যের চাদরে আবৃত’। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ফায়ার সার্ভিস থেকে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের প্রতিবেদন এখনো জনসমক্ষে আসেনি। তবে কমিটির বরাত দিয়ে যেসব তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে তাতে অনেকেই মনে করছেন, ‘প্রকৃত ঘটনাটি এখানে আড়াল করা হচ্ছে।’

এর আগে গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সিস্টেমস থেকে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে যায়। যার মধ্যে শ্রীলংকার গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের নামে ২ কোটি ডলার ছাড় করা হয়নি। ফলে ওই অর্থ ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার গেছে ফিলিপাইনে।

এ বিষয়ে ফিলিপাইনে গণমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির হোতারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেই বসে আছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) উদ্বৃতি দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো এক কর্মকর্তার কম্পিউটার থেকে রিজার্ভ চুরির ভুয়া বার্তাগুলো পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, রিজার্ভ চুরির নেপথ্যে উত্তর কোরিয়ার হাত রয়েছে। ফিলিপাইনের এফবিআইয়ের এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো এক দেশের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রিজার্ভ চুরি হয়েছে।

এদিকে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতিকে দায়ী করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার একাধিকবার ঘোষণা দিয়েও অর্থমন্ত্রী পিছু হটেছেন।

এ দিকে অগ্নিকা-ের ঘটনার এক সপ্তাহ আগে বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে কিছু ভুয়া বার্তা ও ফাইল সংযোগ করে পাঠানো হয়। তবে এতে আর্থিক লেনদেনের কোনো বার্তা পাঠানো হয়নি। এ ঘটনার যখন তদন্ত চলছে, তখনই ২৩ মার্চ রাতে ওই বিভাগের জিএমের কক্ষে আগুন লাগে। এ ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এটি নিছক দুর্ঘটনা। এর পেছনে কোনো নাশকতা নেই। ফায়ার সার্ভিস বলেছে, জিএমের কক্ষের ইলেকট্রিক কেটলি থেকে আগুন লেগেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের লিফটের ১৩ তলায় (১৪ তলা) বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ। এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে জিএমের কক্ষ। আগুনে জিএম ও তার পিএর কক্ষের প্রায় সব পুড়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ফ্লোরে ইলেকট্রিক কেটলি, হিটার, ম্যাচ, ধূমপান এগুলো করার নিয়ম নেই। ভবনের পেছনের লিফটের ছোট একটি অংশে বহিরাগতরা ক্যান্টিন থেকে গরম পানি এনে চা তৈরি করে কর্মকর্তাদের সরবরাহ করে। এখন প্রশ্ন উঠছেÑ কেটলি কীভাবে ভবনে এলো। এটি চা বিক্রেতাদের ওখানে থাকতে পারত, তা না থেকে সরাসরি চলে এলো জিএমের কক্ষে। এটি বিধির লঙ্ঘন। কেননা জিএমের কক্ষে কোনোক্রমেই কেটলি যেতে পারে না। তিনি নিজে চা তৈরি করে খান না। তাকে চা দেওয়ার মতো কমপক্ষে তিনজন ব্যক্তিগত কর্মী রয়েছে। তাদের বললেই চা চলে আসবে জিএমের কক্ষে। এ কারণে অনেকেই সন্দেহ করেছেন, জিএমের কক্ষে কেটলি থাকতে পারে না।

অফিস শেষে জিএম বের হলে তার কক্ষের ফাইলপত্র গোছানোর দায়িত্ব পিএর। এরপর রুম পরিষ্কার করবেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তারা রুমের সবকিছু দেখবেন। এরপর পিএ বা অন্য ব্যক্তিগত কর্মকর্তা রুম তালাবদ্ধ করে বের হবেন। এরপর পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পুরো ফ্লোর পরিষ্কার করবেন। তারপর ফ্লোরের দায়িত্ব নেবেন নিরাপত্তাকর্মীরা। তারা ফ্লোরের গেট তালা লাগিয়ে রাখবেন।

ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্যমতে, জিএমের কক্ষে ইলেকট্রিক কেটলি ছিল, সেটিতে বৈদ্যুতিক সুইস লাগানো ছিল। এ কারণে কেটলি গরম হয়ে আগুনের সূত্রপাত। এই যদি হয়ে থাকে ঘটনা, তবে জিএমের রুম গোছানো ও পরিষ্কার করার সময় কি কারো চোখেই এ বিষয়টি পড়েনি।

জিএমের কক্ষের চারদিকে কাছের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। দরজাও থাকে বন্ধ। ফলে ভেতরে আগুন লাগলে ধোঁয়া বের হওয়ার কথা নয়। আগুনের কারণে সৃষ্ট তাপে কাচ ভেঙে ধোঁয়া বের হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো কাচ ভেঙেছে কিনা, সে তথ্য পাওয়া যায়নি। ধোঁয়া ১৩ ফ্লোর থেকে উপরের ফ্লোরগুলোয় যাওয়ার সুযোগ নেই। যেতে হলে গেট খুলতে হবে। কে গেট খুলেছে, সেটিও দেখার বিষয়। ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্যমতে, আগুন লাগার খবর তারা প্রথম পেয়েছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পায়নি। শুরুতে ফায়ার সার্ভিসকে কেন জানায়নি, এটি প্রশ্নসাপেক্ষ।

বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। রপ্তানি ও আমদানির নামে মুদ্রা পাচার বেড়েছে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগুলো খুঁজে বের করেছে। তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাচ্ছে। বৈদেশিক ঋণের বিষয়টিও এ বিভাগ থেকে তদারক করা হচ্ছে। ফলে আগুনে ক্ষতি হলে কে লাভবান হবে, সেটি এখন দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে এখানে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, র‌্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রায় সার্বক্ষণিকভাবেই থাকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনলাইন ব্যাংকিংকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। গত বছরের ৭ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতি করে ৪০ জন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। এর সঙ্গে জড়িত একটি প্রতারক চক্র। পাশাপাশি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারাও জড়িত।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের মহানিরাপত্তা এলাকা বলে পরিচিত ভল্টের কাছ থেকে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার দীপক চন্দ্র দাশ নামে এক কর্মকর্তা পাঁচ লাখ টাকা চুরি করেন। যদিও তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ না করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুরক্ষিত ভল্ট থেকে টাকা চুরির ঘটনা ঘটেছে। ভল্টে জালনোট পাওয়া গেছে। প্রকৃত নোটের চেয়ে কম নোট পাওয়ার নজিরও রয়েছে অহরহ। দুই ঈদের সময়ে নতুন নোট নিয়ে ঘটে আরেক জালিয়াতি।

বেআইনি প্রভাব খাটিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়ে পড়ছেন। এখন পর্যন্ত তিনজন কর্মকর্তার সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের আগুনের ফলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। তবে আগের ঘটনার সঙ্গে আগুনের ঘটনার বিভিন্ন বিষয়ে মিল রয়েছে। কারণ রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটেছিল তিন দিন ছুটি সামনে রেখে। ২৬টি ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতি হয়েছিল তিন দিনের ছুটি সামনে রেখে। আবার আগুনের ঘটনাও ঘটেছে তিন দিনের ছুটি সামনে রেখে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, আমরা সবদিক বিবেচনা করে তদন্ত করব।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রী দুজনই বলেছেন, অগ্নিকা-ের ঘটনায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পোড়েনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জিএম হচ্ছেন একটি বিভাগের প্রধান। তার ওপর আছেন নির্বাহী পরিচালক, ডেপুটি গভর্নর ও গভর্নর। জিএম থেকে তাদের কাছে ফাইল যায়, স্বাক্ষর হয়ে চলে আসে। বেশিরভাগ ফাইলই কর্মকর্তারা হাতে হাতে স্বাক্ষর করে আনেন। কিছু ফাইল থাকে তাদের টেবিলে। আর বেশিরভাগ ফাইলই থাকে জিএমের কক্ষে। শুধু চলমান ফাইলগুলো থাকে ডেস্ক অফিসারদের কাছে। তাহলে জিএমের পুরো কক্ষ পুড়ে গেল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোনো ফাইল পোড়েনি। এটি অনেকেই বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন না।

এদিকে কেপিআই হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে অ্যালার্মিং সিস্টেম রয়েছে। প্রতিদিনই ট্রায়াল হিসেবে ব্যাংক ছুটির আগে অ্যালার্ম বাজানো হয়। কিন্তু ২৩ মার্চ রাতের আগুনে কোনো অ্যালার্ম বাজেনি। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যালার্মিং সিস্টেম নষ্ট কিনা। আর সেটি নষ্ট হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তা বিভাগ নামক একটি বিভাগ কী দায়িত্ব পালন করে। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যালার্ম সার্ভিস সিস্টেম ভালো নয়। মাঝেমধ্যে ফলস অ্যালার্ম দেয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব কর্মী বাহিনীর মহড়া দেওয়ার কথা। কিন্তু সেটি নিয়মিত হয় না। রিজার্ভ চুরির সময় রহস্যময় কারণে সিটিটিভি বন্ধ ছিল। এবার সিসিটিভি খোলা ছিল কিনা, সে তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে