নারীর ক্ষমতায়নে চাই আর্থিক নিরাপত্তা

  শান্তা মারিয়া

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির শত অনুরোধ ও আদেশেও ব্যাংকের চাকরিটা ছাড়তে রাজি হননি নীলা (প্রকৃত নাম নয়)। স্বামী ও শাশুড়ির নিত্যদিনের অভিযোগ ছিল চাকরি করতে গিয়ে সন্তানের প্রতি অবহেলা হচ্ছে। চাকরি না ছাড়লে সংসার টিকবে না, এমন হুমকির পরও নীলা হার মানেননি। অথচ তার চাকরির টাকা সংসারে সব সময়েই কাজে এসেছে। এর মধ্যে একদিন হঠাৎ অফিসেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তার স্বামী। স্ট্রোক ও প্যারালাইসিস। বিছানায় পড়ে থাকতে হয় দীর্ঘদিন, প্রাইভেট কোম্পানিতে তার চাকরিও চলে যায়। নীলার উপার্জনেই চলে সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসারের যাবতীয় খরচ। স্বামী ও শাশুড়ি দুজনেই স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, নীলার চাকরি ছিল বলেই তারা এখন চলতে পারছেন। দুজনেই ভুল স্বীকার করে আজকাল বলেন, ‘ভাগ্যিস নীলা চাকরিটা ছাড়েনি’।

সীমন্তী চাকরি করেন একটি করপোরেট হাউসে। মোটামুটি ভালো অঙ্কের অর্থ উপার্জন করেন। সংসারে অর্ধেক ব্যয় তার বেতনের টাকা থেকে চলে। বাকি টাকা দেন তার স্বামী। সংসারের সব সিদ্ধান্তও দুজনে আলোচনা করেই নেন। ব্যাংকে কিছু টাকা নিয়মিত সঞ্চয়ও করছেন সীমন্তী। বাবার বাড়িতেও নিয়মিত সহায়তা করেন তিনি। পারিবারে মর্যাদা, অধিকার ও ক্ষমতা তিনটিই রয়েছে তার। আর এই তিনটি তিনি পেয়েছেন আর্থিক নিরাপত্তার কারণে।

বাংলাদেশের নারীরা নিজস্ব উপার্জনের পথে এগিয়ে এসেছেন বেশ অনেক বছর ধরে। বিংশ শতকের প্রথম দিকে অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে নারীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে শুরু করেন। প্রথম দিকে শিক্ষকতা ও চিকিৎসা পেশাতেই মূলত বাঙালি নারীরা অংশ নিতেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক, বীমা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তারা যোগ দেন। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অনেক পরিবারেই উপার্জনক্ষম পুরুষ সদস্য শহীদ হন। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারে অর্থনৈতিক হাল ধরতে এগিয়ে আসেন নারী। গার্মেন্টসশিল্প যখন বাংলাদেশে বিকশিত হতে থাকে, সে সময়ও সেলাইয়ের স্বাভাবিক দক্ষতার বলে এ শিল্পে শ্রমিক হিসেবে দলে দলে নারীরা যোগ দেন। এখনো এ শিল্পে কর্মরত সিংহভাগ শ্রমিক নারী। এই পোশাক শ্রমিক নারীরা তাদের পরিবারে নিয়ে আসেন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। পাশাপাশি বিড়ি ফ্যাক্টরি, ধানের চাতাল, দেয়াশলাই ফ্যাক্টরিসহ অনেক শিল্প-কারখানাতেই শ্রমিক হিসেবে নারী যোগ দেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা তো আছেই, পাশাপাশি ব্যাংক, আইন, সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে বিমানচালনাতেও দেখা যায় নারীকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করছেন। জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। উৎপাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই নারী। এ খাতে ৫০ লাখ ১৫ হাজার কর্মী আছেন। তাদের মধ্যে ২২ লাখ ১৭ হাজার নারী। গার্মেন্টসশিল্পের ৪০ লাখ কর্মীর ৮০ শতাংশই নারী। চিংড়িঘেরসহ অন্যান্য শিল্প খাতগুলোতেও প্রচুরসংখ্যক নারী কাজ করছেন। সে হিসাবে বলা যায় দেশের রপ্তানিকে অনেকাংশে সচল রেখেছে নারীর শ্রম।

উপার্জনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সমাজে ও পরিবারে নারী একটু একটু করে ক্ষমতায়িত হচ্ছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাড়ছে তার অধিকার। সংসারে যে নারী উপার্জন করেন, নিজের ব্যয় নিজে নির্বাহ করেন, উপরন্তু সংসারে অর্থ ব্যয় করেন তার অবশ্যই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বেশি।

নারীর আর্থিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর এবং মানবাধিকারকর্মী রুহি নাজ সুবহান বলেন, ‘প্রত্যেক নারীর অবশ্যই শিক্ষাজীবন শেষে নিজস্ব উপার্জনক্ষমতা অর্জনের জন্য চেষ্টা করা উচিত। কারণ একজন নারী তখনই পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে যান, যখন তার আর্থিক নিরাপত্তা থাকে, নিজস্ব উপার্জন থাকে। পরিবার ও সমাজের সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়নের দিকে নারী তখন অগ্রসর হন।’ আগামীতে এই ক্ষমতায়ন যত বাড়বে, ততই নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সুখী সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারব আমরা।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে