নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানী বারনেলের সঙ্গে ই-আলাপ

  জাহাঙ্গীর সুর

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৬৭ সালের ২৮ নভেম্বর। পালসার আবিষ্কার করেন এক তরুণী। ওই আবিষ্কারকে বলা হয় বিশ শতকের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি। পালসার হলো অত্যন্ত চুম্বকিত নিউট্রন তারা। এরা তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে। এই তরঙ্গ ‘পালস’ হিসেবে লক্ষ করা যায়, তাই এদের নাম ‘পালসার’। যে তরুণী এটি প্রথম আবিষ্কার করেন তার নাম জোসলিন বেল বারনেল। ৭৪ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী বর্তমানে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর। সম্প্রতি ই-মেইলে মুখোমুখি হয়েছিলাম তার।

আলাপে বারনেলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তখন আপনার বয়স সবে ২৪ বছর। ওইটুকু বয়সে নোবেলতুল্য একটা কাজে প্রথম হওয়ার বিষয়টি কেমন ছিল?’ বারনেল বললেন, ‘পালসার আবিষ্কার রোমাঞ্চকর ছিল বটে। কিন্তু একই সঙ্গে এটা উদ্বেগেরও বিষয় ছিল।’

কেন?

ব্যাখ্যা করলেন বারলেন, ‘যেমন ধরা যাক, আমরা যেসব অনুরণিত বা স্পন্দিত বার্তা দেখেছি, যাকে আমরা পালসার বলছি, সেগুলো যদি অতিসামান্য সাধারণ কিছু হয় কিংবা স্পষ্ট করে এসবের ব্যাখ্যা আগে থেকেই আমাদের জানা আছে, এমন হয়Ñ তখন তো তাহলে আমাদের বড় বোকা মনে হবে।’

না, ভুল প্রমাণ হয়নি এবং স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালে নোবেল পুরস্কারও দেওয়া হয়। যৌথভাবে দুজন পুরস্কারটি পান। নোবেল কমিটি থেকে বলা হয়, বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞানে অগ্রগামী পথিকৃৎ গবেষণার জন্য এ দুজনকে সম্মানিত করা হচ্ছে। এদের একজনের অবদান সম্পর্কে বলা হয়, তিনি পালসার আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, তিনি বেল বারনেল নন। বরং নোবেলজয়ী হচ্ছেন অ্যান্টনি হিউইস, বারনেলের পিএইচডির সুপারভাইজার।

কিন্তু নোবেল তালিকায় কেন নাম ছিল না বারনেলের? সরাসরি জানতে চাইলাম তার কাছেই। বললাম, ‘নোবেল না পাওয়ার কারণ কি এই যে, আপনার বয়স ছিল কম?’

তখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম বয়সী নোবেলজয়ী ছিলেন উইলিয়াম লরেন্স ব্র্যাগ, যিনি ১৯১৫ সালে ২৫ বছর বয়সে তার বাবার সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান।

‘নাকি, জেন্ডারই আসল কারণ?’

বেল বারনেল অবশ্য বয়স বা জেন্ডারকে দায়ী করলেন না। কিংবা বলা ভালো, এ বিতর্ক এড়িয়ে গেলেন, যা একজন বড় বিজ্ঞানীর বিনয়াচরণ। বরং তিনি বললেন, ‘আমি তখন একজন শিক্ষার্থীমাত্র। এবং নোবেল পুরস্কারের কেন্দ্রবিন্দু ছিলÑ এবং এখনো তা-ই আছেÑ কোনো একটা দলের প্রধান।’

প্রখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হোয়েল নাকি এই দলপ্রধান তথা অ্যান্টনি হিউইস সম্পর্কে বলেছিলেন, বারনেলের তথ্য চুরি করে নোবেল পেয়েছিলেন তিনি। এ প্রশ্নও করলাম বারনেলকে। যথারীতি রীতির কথা তুললেন তিনি। বললেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীরা কিংবা দলের অন্য কোনো সদস্যের ওপর নজর বা জোর দেওয়া হতো না। শিক্ষার্থী কিংবা লিঙ্গ বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে নোবেল পুরস্কার কমিটি জানত না।’

বারনেলকে যখন প্রশ্ন করলাম, ‘এই মহাকাশ, রাতের আকাশের তারাÑ এসব নিয়ে কি শিশুকাল থেকেই কৌতূহলী ছিলেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি তখন পনেরো কী ষোলো বছরের কিশোরী। তখন থেকেই আমি চাইতাম, যদি পারি, একদিন জ্যোর্তিবিদ হব।’

যখন জানতে চাইলাম, ‘আপনি কি মনে করেন, একদিন আমরা ভিনগ্রহীদের সঙ্গে দেখা করতে পারব?’ বারনেল বললেন, ‘আমি মনে করি না, মানুষ আদৌ কখনো ভিনগ্রহীর সাক্ষাৎ পাবে।’

বাঙালি শিক্ষার্থী, বিশেষত কিশোরীদের জন্য পরামর্শ চাইলে বারনেল শুভকামনা জানিয়ে বলেন, ‘বিজ্ঞানীদের খুব খুব করে দরকার এই পৃথিবীর। আমার বিশ্বাস, ছেলে হোক মেয়ে হোক, বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক ও প্রতিভা যারই আছে, সে-ই বিজ্ঞানী হতে পারবে।’

জোসলিন বেল বারনেল এ বছর পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্সের প্রেসিডেন্ট মেডেল পেয়েছেন। তার জন্ম নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে, ১৯৪৩ সালের ১৫ জুলাই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে