ঘরে নির্যাতনের শিকার কর্মজীবী নারী

  কেয়া আমান

০৮ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বামীর হাতে নির্যাতন শুধু যে গৃহিণীদেরই সহ্য করতে হয়, এমন নয়। তথ্য

ও উপাত্তে দেখা যায়, কর্মজীবী বা প্রতিষ্ঠিত নারীরাও নির্যাতনের শিকার

হয়ে থাকেন।

আফরিনা আক্তার (ছদ্মনাম) রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপর্যায়ে কাজ করেন। দুই সন্তান আর স্বামী নিয়ে ছোট্ট সংসার। স্বামীও উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী। পেশা ও সামাজিক জীবনে সাফল্য পেলেও ব্যক্তিজীবনে ভালো নেই আফরিনা। উঠতে-বসতে স্বামীর কটু কথা শুনতে হয়। প্রতিবাদ করলে শুরু হয় মারধর। আফরিনা বলেন, শুধু ঘরে নয়, বাইরের মানুষের সামনেও খারাপ ব্যবহার করেন। ছেলেমেয়ের সামনেই গায়ে হাত তোলেন। আমি প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবী হলেও জ্ঞানবুদ্ধিতে তার চেয়ে কম এটাই তিনি যেন বারবার প্রমাণ করতে চান। প্রথমদিকে প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু তার আচরণের কোনো পরিবর্তন নেই। এখন মেনে নিয়েছি।

আমার প্রতিবেশী রুবিনা মোমেন। সরকারি চাকরিজীবী। স্বামী ব্যবসায়ী। প্রায়ই তার ফ্যাট থেকে কলহের আওয়াজ পাই। স্বামীর মারধর আর কান্নাকাটি সবই যেন ভদ্রমহিলার নিত্যদিনের সঙ্গী। একদিন কথা প্রসঙ্গে ঝগড়া-বিবাদের বিষয়টি জানতে চাইলে ভদ্রমহিলা বেশ চুপসে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তার পর জানালেন, অফিস থেকে ফিরে প্রায়ই রান্না করতে দেরি হয়ে যায়। খুব বেশি পদও রান্না করার সুযোগ হয় না। আমার স্বামী এ বিষয়গুলো মেনে নিতে পারেন না। রান্নায় একটু উনিশ-বিশ হলেই মারধর শুরু করেন। বিকালে ঘড়ি ধরে বসে থাকেন। ফিরতে একটু দেরি হলেই নানা ধরনের অপবাদ দেন। আমার বাসার গৃহকর্মীর স্বামী তাকে রোজ পেটায় যৌতুকের জন্য। আর আমার মতো শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত নারীকেও তার স্বামী প্রতিদিন নির্যাতন করেন কারণে-অকারণে। গৃহকর্মী আর আমি দুজনেই স্বামীর নির্যাতনের শিকার। আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

দেশের শিক্ষিত কর্মজীবী নারীরা এভাবেই দিনের পর দিন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দ্বিতীয় খানাভিত্তিক জরিপ ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫’ তথ্য মতে, বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের অর্ধেকই কখনো না কখনো স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। উপার্জনকারী নারীদের মধ্যে এ হার বেশি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পারিবারিক নির্যাতন-২০১০ প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বামীর হাতে শারীরিকভাবে নির্যাতিত ৪২ জন নারীর মধ্যে মাত্র চারজন মামলা করেছে। ২০০৯ সালে নির্যাতিতদের সংখ্যা ছিল ২২ জন। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া যৌতুককে কেন্দ্র করে ৩৮৮ জন নারী অত্যাচারিত হন, যাদের অধিকাংশ শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারী।

বাংলাদেশে পরিচালিত বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার একটি জরিপে দেখা যায়, শহরে বসবাসরত ৪০ শতাংশ কর্মজীবী নারী স্বামীর হাতে নির্যাতিত। কিন্তু এই নির্যাতনের কথা তারা প্রকাশ্যে বলতে পারে না। বাংলাদেশে মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, এ দেশে শিক্ষিত মানুষের হার ৬০ শতাংশ হলে এর ২০ শতাংশ নারী। এদের কেউ শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যাংকার, আইনজীবী, স্থপতি, প্রকৌশলী কেউ এনজিও চালান। আমাদের সংস্থায় এসব পেশার অনেকেই আসেন স্বামীর নির্যাতনের বিষয় নিয়ে কথা বলতে। সমাজে এদের অবস্থান এত উঁচুতে যে, এই সমস্যার কথা প্রকাশ্যে তারা বলতেও পারেন না। জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে মামলায় যেতেও চান না। এর থেকে তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশের অশিক্ষিত নারীরা সাহসী। তারা তাদের সমস্যার কথা বলতে জানেন।

প্রায় রাতে স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতিত হওয়ার পরও সুখে আছি দাবি করা নারীর সংখ্যা আমাদের সমাজে কম নয়। লোকলজ্জার ভয়ে নীরবে মুখ বুজে সহ্য করার কারণেই শিক্ষিত সমাজের অনেক নারীর পরিণতি হয় রুমানা মঞ্জুর, জয়ন্তী রেজা কিংবা আখতার জাহানা জলির মতো। নাজনীন আক্তার তন্বীর মতো নামকরা সাংবাদিকও স্বামীর নির্যাতন দিনের পর দিন সহ্য করে অবশেষে মুখ খুলতে বাধ্য হন।

শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি কর্মজীবী নারীদের ওপর মানসিক নির্যাতনের ভয়াবহতাও কম নয়। বিবাহিত নারীদের নিয়ে শ^শুরবাড়িতে নানারকম ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, কটাক্ষ তো আছেই, তার ওপর কর্মজীবী নারীদের বাড়তি পাওয়া হিসেবে উঠতে-বসতে ঘরে সময় দিতে পারে না, রান্না করতে দেরি হয়, সন্তানদের অযতœ হয়, শ^শুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনদের আপ্যায়ন কম হয়Ñ এমন নানা অভিযোগ, অপবাদ আর অপমান সহ্য করতে হয়। তার ওপর নিজের উপার্জিত অর্থ খরচে স্বাধীনতা না থাকা কিংবা বাবা-মাকে উপার্জিত অর্থ দেওয়ার স্বাধীনতা না থাকা কর্মজীবী নারীদের জন্য আরেকটা বড় ধরনের মানসিক নির্যাতন।

সমাজ যেভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, সেভাবে আমাদের মানসিকতা বদলাচ্ছে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম। তিনি বলেন, ‘আমরা মুখে আধুনিকতার কথা বললেও সনাতন জীবনবোধ পাল্টাইনি। আগেও নারীরা যেভাবে নির্যাতিত হতো, এখনো তেমনটাই হয়। কর্মজীবী নারীদের মতো স্বাবলম্বী নারীরাও যা থেকে রেহাই পায় না। আর এই নির্যাতন আমরা যত মুখ বুজে সহ্য করব, নির্যাতনের পরিমাণ ততই বাড়বে। তাই লজ্জা বা ভয়ে লুকিয়ে না রেখে প্রতিবাদী হোন, পারিবারিক নির্যাতনের কথা প্রকাশ করুন। প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নিন।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে