রাখাইন রাজ্যে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে আরসা

  হামিদ উল্লাহ ও আবদুল্লাহ মনির, টেকনাফ থেকে

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসছে দলে দলে। এসব দলে শিশু, মহিলা ও বয়োবৃদ্ধদের দেখা গেলেও যুবকদের সংখ্যা খুবই কম। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে, এত যুবক গেল কোথায়। এ বিষয়ে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সহিংসতায় অনেক যুবক মারা পড়েছে। কেউ কেউ রয়ে গেছে সম্পদ রক্ষার জন্য। অনেক যুবক কাউকে কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে গেছে। তারা যোগ দিচ্ছে আরকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মিতে (আরসা)। এসব যুবক প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

শাহপরী দ্বীপ থেকে টেকনাফ আসার পথে ভাঙ্গা এলাকায় কথা হয় তসলিমা বেগমের (২২) সঙ্গে। দুই সন্তান নিয়ে একাই বাংলাদেশে এসেছেন। সাত দিন আগে স্বামী নূর মোহাম্মদ কিছু না বলেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। তিনি আর ফেরেননি। ওই সময়ে রাখাইনে কাউকে খুন করার খবর পাননি তসলিমা। এক সপ্তাহ ধরে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত নূর মোহাম্মদের খোঁজ না পেয়ে আশপাশের লোকজনের সঙ্গে মেরংলোয়া সাগরপাড়ে চলে আসেন। তসলিমার দাবি, সেখান থেকে আরসার লোকজনই তাকে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করে দেয়।

একই কথা বলেন হাচসোরাতা থেকে আসা নূর নাহার বেগম (২৮)। তার স্বামী সাইফুল্লাহও আট দিন ধরে নিখোঁজ। তিন সন্তান নিয়ে তাই অন্যদের সঙ্গে চলে এসেছেন বাংলাদেশে। স্বামীকে মোবাইল ফোনেও পাননি নূর নাহার।

আরসা বর্তমানে রাখাইনের উপকূলীয় এলাকায় বেশ সক্রিয় রয়েছে বলে জানান বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একাধিক লোক। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার হাজার লোক উপকূলের কাছে চলে এসেছে। সেখানে সেনাবাহিনীর আনাগোনা নেই। এ সুযোগে আরসার লোকজন রোহিঙ্গা মহিলা, শিশু ও বয়স্কদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। যাদের নৌকায় চড়ে আসার অর্থ নেই, তাদের আর্থিকভাবে সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। এমন তথ্য দিয়েছে পালিয়ে আসা লোকজন। কথা বলে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনের কর্মীরা। তাই অনেকেই স্ত্রী ও সন্তানদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে রয়ে গেছেন সেখানে। তারা সেখানে যে কোনো ধরনের কার্যক্রম শুরুর আগে নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানকে নিরাপদে রাখতেই এ কৌশল নিয়েছেন। এপারে আসা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই শিশু।

তবে গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা শুরু এবং পরে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ঘটনায় অনেক যুবক মারা গেছেন বলেও শোনা যায়। মংডু শহরের কাছের এলাকা হাচসোরাতা থেকে সপরিবারে চলে আসেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাশিম (৬০)। সাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য সাড়ে ১৬ হাজার টাকা এবং ১২ আনা স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে নেয় নৌকার মাঝি। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর লোকজন মেয়ে খালেদা বেগমের (২০) স্বামী মোহাম্মদ জুবাইরকে গুলি করে খুন করে। এর পর থেকে আমরা বাড়ি ছেড়ে উপকূলীয় এলাকায় চলে আসি। শেষে সবাইকে জড়ো করে বাংলাদেশের উদ্দেশে পাড়ি জমাই। খালেদার চার ছেলে। দুজন যমজ। ব্যবসায়ী হাশিম বলেন, আমার মেয়ের জামাই জুবাইরের মতো অনেক যুবককে গুলি করে মেরে ফেলেছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রামে তা-ব চালানোর সময় যুবকদেরই তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। এভাবে কী পরিমাণ যুবক মারা গেছে, তার সঠিক সংখ্যা বলতে পারেননি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা।

এর বাইরে সহায় সম্পদ রক্ষার জন্যও যুবকদের একটি অংশ রাখাইনে রয়ে গেছে বলে জানা গেছে। মংডুর কাজীবিলের সচ্ছল ব্যক্তি মোহাম্মদ ইসমাইল। এতদিন সহায় সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করেছি। স্ত্রী ও বোনদের বর্মি সেনার হাত থেকে নানাভাবে আগলে রেখেছি। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী মগরা আশপাশের পাড়ায় আগুন দিচ্ছে। লুট করছে সম্পদ। তাই আজ (বুধবার) সকালে চলে এসেছি। তিনি বলেন, মংডু ও আশপাশের বেশিরভাগ লোকজনই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। কিছু কিছু যুবক তাদের গবাদিপশু ও ধান চাল রক্ষার চেষ্টা করছে। যেসব গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়নি, সেখানে এসব যুবককে দেখা যাচ্ছে। তারা ঘর পাহারা দেয়। আর সেনাবাহিনী আসার খবর পেলে পাশের বন জঙ্গল ও পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। আর রাতে ঘরে অবস্থান করে। সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা সাধারণত ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত তা-ব চালায়। রাতে তারা রোহিঙ্গাদের পাড়ায় আসে না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে