তরুণ-যুবাদের নির্বিচারে হত্যা

  হাসান আল জাভেদ, টেকনাফ, কক্সবাজার থেকে

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তরুণ ও যুবকদের নির্বিচারে হত্যা করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এ ছাড়া নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর গত কদিনে রোহিঙ্গা পরিবারে ছেলেশিশু জন্মের খবর পেলে তাদের কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে হত্যা করছে সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর মগ ও মুরংরা। তাদের লক্ষ্য মিয়ানমারের রোহিঙ্গা প্রজন্মকে জাতিগতভাবে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা। এমন নির্মমতার মুখে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে ভিটেমাটি ধরে রাখার শেষ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দেশ ছাড়তে শুরু করে নিরীহ রোহিঙ্গারা।

মংডুসহ রাখাইন রাজ্যের একাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও যুবকের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বাড়িঘর পোড়ানোর পরও বাংলাদেশে পালিয়ে না আসাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে নারী ও বৃদ্ধদের গুলি অথবা গলা কেটে হত্যা করছে। তরুণ-যুবকদের দেখলেই সেনাবাহিনী গুলি চালাচ্ছে। মগ-মুরংরা ধরে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করছে। সদ্যোজাত ছেলেশিশু পেলে ছুড়ে ফেলে হত্যার পর বিকৃত উল্লাস করছে।

মংডুর রাচিডং এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আজিজুল হক। পরিবারের ১৩ সদস্য নিয়ে নৌকায় করে নাফ নদী পেরিয়ে বুধবার রাতে শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ায় অবস্থান নেন তারা। আজিজুল হক জানান, তার বাড়ির পাশেই পাহাড়। উঁচু ভিটার কারণে বাড়িতে কেউ আসতে গেলে দূর থেকে দেখা যেত। বাড়িতে এত মানুষ ভয়ে ভয়ে সারা দিন পথের দিকে কেউ না কেউ তাকিয়ে থাকত। সেনাবাহিনী তো দূরের কথা গত কয়েক দিনে মগদের চেহারা দেখলেই সঙ্কেত পেয়ে যে যার মতো বাচ্চাদের নিয়ে পাহাড়ে চলে যেতাম। রাতে আলো-বাতি না জ্বালিয়ে মাটির ঘরে চুপচাপ থাকতাম। শব্দ হবে এই ভয়ে বাচ্চাদের বেশিরভাগ সময় রাখা হতো পাহাড়ের ঢালে।

আজিজুল বলেন, ভাবছিলাম প্রতিবারই সেনাবাহিনী-মগরা হামলা চালায়। মানুষ মারে। কিছুদিন পর আবার ঠা-া হয়ে যায়। এবারও বুঝি তেমনটা হবে। কিন্তু মঙ্গলবার মাদ্রাসায় পড়–য়া আমার দুই ভাই ঘরের সামনে ঘোরাফিরা করছিল। এ সময় মগদের নিয়ে সেনাবাহিনী ঢুকে পড়ে। কোনো কথা না বলে ১০-১২ বছর বয়সী দুই ভাইকে গুলি করে। আমরা ঘরেই নিঃশব্দ বসেছিলাম। বাবা এগিয়ে যায়। আর্মি বলে তোরা চলে যা, নয়তো তোদের পুড়িয়ে মারব। আমরা বাংলাদেশে রওনা শুরু করি।

নাফ নদীর মোহনায় শাহপরীর দ্বীপের ঘোলার চরে গতকাল দুপুরে একটি ট্রলার ভরে আসেন ৩৬ রোহিঙ্গা। অপর প্রান্তের নাফ নদী তীরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। নিজস্ব সীমানায় স্পিডবোটে পাহারা দিচ্ছে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)।

রোহিঙ্গা বোঝাই ট্রলারটি চরে ভিড়তেই এগিয়ে আসে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আবার রাইফেল! ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে ওঠে উদ্বাস্তু মানুষগুলো। আর্তমানবতার কাছে হেরে যায় অনুপ্রবেশের অপরাধ। এরপর প্রায় দুই কিলোমিটার পেরিয়ে শাহপরীর ঠিকানা। পথে যেতে যেতে কথা হয় ৫০ বছর বয়সী কৃষক দিল মোহাম্মদের সঙ্গে।

কয়জন এসেছেন জানতে চাইলে আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, সবাই এসেছি। শুধু আবদুল্লাহ আর নূর হাসেম আসেনি। তারা কেন আসেনিÑ মিলিটারি ওদের গুলি করেছে। গুলি করা লাশের গলায় ছুরি চালিয়েছে মগরা। তাই ওদের আনতে পারিনি। পুড়িয়ে দিয়েছে ঘরবাড়িও। হেঁটে চলেন দিল মোহাম্মদ। তার কথা বলার সময় চোখ ঠিকরে বের হচ্ছিল জন্মভূমির প্রতি ঘৃণা।

বালুকাময় ফিশারি ট্রলার নোঙর করা ঘোলারচরে আরেকটি ট্রলারে করে আসা হাসিনা বানু বলেন, মঙ্গলবার সকালে তাদের আশপাশে ১৭টি ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে মংডুর বাগুনা এলাকায়। আগুনে পুড়ে খই হয়ে গেছে সকালের রান্না করা ভাতগুলোও। সবাই প্রাণে বেঁচে এলেও ৮ সদস্যর পরিবারের কারো মুখে খাবার নেই। হতভাগ্য এই রোহিঙ্গা পরিবার দুই দিন ধরে পুকুর, বিল, খালের পানি পান করে বেঁচে আছেন। জানতে চাইলে হাসিনা বানু বলেন, আসার পথে অনেক টিউবওয়েল পেয়েছি। কিন্তু হাতল চাপলে যে মগরা জেনে যাবে। আমাদের জবাই করবে। আর তাই নোংরা পানি দিয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণা মিটিয়েছি। পরিষ্কার পানির চেয়ে এখানে জীবনই তো বড়Ñ তাই নয়কি।

জন্মের একদিন পর মংডুর রাচিডং এলাকার এক ছেলেশিশুকে পুকুরের পানিতে ছুড়ে হত্যা করে সেনাবাহিনী। ভয়ে আরও ৫ ছেলেমেয়ে ও স্বামী নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন মা আমিরা বেগম। মঙ্গলবার উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের সামনের সড়কে কথা হয় তার সঙ্গে। আঞ্চলিক ভাষার কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আমিরার মুখে জানা গেছে, রোহিঙ্গা নিধনের পর মগরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেয়। কোন বাড়িতে ছেলেশিশু আছে। এসব ছেলেশিশু নাকি বেঁচে থাকলে জঙ্গি হবে। তাই মেরে ফেলতে হবে। ঠিক গত ১৪ দিন আগে মগদের সহায়তায় তার কোল থেকে ছিনিয়ে নবাগত শিশুটিকে সেনাবাহিনী পানিতে ফেলে হত্যা করে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধিবাসীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সেনাবাহিনী সাধারণত রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর চেনে না। এতে স্থানীয় মগদের সহায়তা নেয়। কখনো সেনাবাহিনীর অনুপস্থিতিতেই মগরা রোহিঙ্গাদের হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এমনকি অস্ত্রের মুখে রোহিঙ্গাদের আত্মহত্যা করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। বর্বর এসব ঘটনার সাক্ষী প্রাণে বেঁচে আসা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকরা। সু চি সরকারের ধারাবাহিক হত্যা-নির্যাতন-অগ্নিসংযোগের কারণে এখন কক্সবাজারে রোহিঙ্গা স্রোত। তাদের কেউ কেউ আসছে মিয়ানমারের আকাশে থাকা বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এ দৈশে থাকা স্বজন-পরিচিতজনদের সঙ্গে আলাপ করে। মাইলের পর মাইল হেঁটে ওপারের শ্বাসমূল বনের আড়ালে ঘুপটি মেরে থাকে ভাগ্যাহত এসব জনগোষ্ঠী। এরপর ট্রলারযোগে বাংলাদেশ। হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে জেলে ট্রলারগুলোর মাধ্যমে আসছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে জমানো শেষ সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হাতে পাড়ি দিচ্ছে অজানায়।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের তমব্রু, মুংডু এলাকা থেকে আসা উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাখাইনে সাধারণত কলেজের সংখ্যা কম। বিশ্ববিদ্যালয় নেই বললেই চলে। হাতের নাগালে শিক্ষাপীঠ বলতে মাধ্যমিক পর্যন্ত। কিন্তু সেনাবাহিনী নেপথ্যে থাকা সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের কারণে রোহিঙ্গাদের ঘরে বড়জোর এসএসসি পর্যন্তও শিক্ষার আলো নেই। বৌদ্ধ নিয়ন্ত্রিত সমাজে একঘরে রোহিঙ্গাদের যুগের পর যুগ ধরে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। স্কুলভিত্তিক সরকারি নানামুখী কর্মসূচিও নেই। এ কারণে একটি নিরক্ষর জাতিতে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গা সমাজ। মূর্খতার কারণে রোহিঙ্গাদের পেশা বলতে একমাত্র কৃষিকাজ। ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় বার্মিজ ভাষাও বোঝে না রোহিঙ্গারা। স্থানীয় কৃষ্টি-কালচার থেকে বঞ্চিত। পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার সরকার নিরক্ষর করে রাখায় প্রবাসেও অবদান রাখতে পারছে না এরা।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যগতভাবে রোহিঙ্গাদের পিছিয়ে রেখেছে মিয়ানমার সরকার। সরকারি-বেসরকারি খাদ্য-পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ, চিকিৎসার অধিকার কোনোটিই ছিল না তাদের। এ কারণে রোহিঙ্গা দম্পতিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ৬ থেকে ১৪টি পর্যন্ত সন্তান রয়েছে। নিজ সন্তানের সঠিক তথ্য বলতে পারে না তার জন্মদাত্রী মা। গত সোমবার কুতুপালং পুরনো ক্যাম্পের বাইরে কথা হয় মংডুর দুম্বাই এলাকা থেকে আগত রোহিঙ্গা নারী হাসনা বেগমের সঙ্গে। সন্তানদের বয়স জানতে চাইলে ওই সময় তিনি উল্টো ১৪-১৫ বছর বয়সী ছেলে আবু তাহেরকে প্রশ্ন করে তোর বয়স যেন কত? অশিক্ষা, অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিতভাবে সন্তান জন্মদান, শিক্ষা না থাকায় এমনটা ঘটছে প্রায় সব রোহিঙ্গা পরিবারে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে