ত্রাণের চাল নয়ছয়

দুর্নীতিবাজদের কব্জায় কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম

  হাবিব রহমান

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৯:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের (সিএসডি) নানা অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রতিবেদন দিয়েছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। প্রতিবেদনের সঙ্গে গুদাম থেকে উদ্ধার হওয়া ‘অনিয়মের প্রমাণ নথিপত্র’ও জমা দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার এসব নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর ত্রাণের চাল নয়ছয় করার বিষয়ে তদন্তে নেমেছে দুদক। এদিকে এ ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় প্রাথমিকভাবে তিন খাদ্য কর্মকর্তা ও ২১ শ্রমিককে সাসপেন্ড করেছে সিএসডি কর্তৃপক্ষ। সাসপেন্ড হওয়া তিন খাদ্য কর্মকর্তা হলেনÑ উপখাদ্য পরিদর্শক নান্নু মিয়া, উপখাদ্য পরিদর্শক মোহাম্মাদ হোসেন মামুন ও খাদ্য পরিদর্শক পাপিয়া সুলতানা।

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে ত্রাণের চালসহ নানা ক্ষেত্রে অনিয়ম দুর্নীতি চালিয়ে আসছেন সিএসডির এক শ্রেণির অসাধু কর্তা। প্রতিষ্ঠানটিতে লুটপাট চালিয়েছেন তারা। লুটপাটের অর্থ ঊর্ধ্বতন অনেক রাঘববোয়ালের পকেটেও যেত নিয়মিত। র‌্যাবের অভিযানের পর সবকিছু সামনে আসতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে এ নিয়ে তদন্ত শুরু করে দুদক। বিষয়টি নিজেদের মতো করে তদন্ত করছে র‌্যাবও। সব মিলিয়ে রাঘববোয়ালদের আড়াল করতে তৎপর হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির প্রভাবশালীরা। তারা বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা তদবিরও করছেন।

খাদ্য অধিদপ্তর গঠিত পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে কাজও করছে। আজ একটি তদন্ত দলের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআইভুক্ত) হওয়া সত্ত্বেও সেখানে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি করে। খাদ্যগুদামের কম্পাউন্ডের মধ্যেই গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দিয়ে বহিরাগত ট্রাক রাখা হতো। প্রতিটি ২০০ টাকা হারে প্রতিদিন প্রায় ৩০-৪০টি ট্রাক সেখানে থাকত, যা সংরক্ষিত জায়গার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হতে পারত। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত হানা দেওয়ার দিন পর্যন্ত এসব অপকর্ম চলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব ট্রাকে অল্প অল্প করে ভরেই চোরাই চালগুলো সরিয়ে ফেলা হতো। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন অসাধু কর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাদ্য কর্মকর্তা নান্নু মিয়ার পোস্টিং মূলত মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায়। পাপিয়া সুলতানা ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার খাদ্য কর্মকর্তা। তারা দুজনই কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে সংযুক্ত (অ্যাটাচমেন্ট) হয়ে কাজ করছেন। মূলত কর্মকর্তারা দুর্নীতি করতে কেন্দ্রে চলে আসেন সংযুক্তির মাধ্যমেÑ এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির আমাদের সময়কে বলেন, তিন কর্মকর্তা ও ২১ শ্রমিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। সাসপেন্ড হওয়া শ্রমিকরা সবাই মাস্টার রোলে কাজ করতেন।

তবে গ্যারেজ করে ট্রাক ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, এমনটি করার প্রশ্নই ওঠে না। এটি একটি কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান। তবে হ্যাঁ একটি কাজ করা হতো, সেটি হলো ঢাকার বাইরে থেকে চাল নিয়ে আসা ট্রাককে রাতে অবস্থানের অনুমতি দিতে হতো। কারণ ঢাকায় রাতে ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকার কারণে এটি করতে হতো আমাদের।

একজন সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করে আমাদের সময়কে জানান, এখান থেকে ত্রাণের চাল নিয়ে বিপদে পড়েছিলেন তিনি। কারণ চাল অনেক কম ছিল। পরে তিনি নিজের টাকায় ঘাটতি পড়া চাল কিনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের মাঝে বিতরণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে দাবি তার।

র‌্যাব জানায়, অভিযানের পর কেউ কেউ ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু র‌্যাবের শক্ত অবস্থানের কারণে কোনো অনুরোধ করার সাহস পায়নি। হতদরিদ্র মানুষের ত্রাণের চাল এভাবে চুরি হওয়ার বিষয়টিতে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যত বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিই জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

গত ৬ সেপ্টম্বর রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে র‌্যাব। ত্রাণের জন্য বরাদ্দ ৩০ টন চালের মধ্যে মাত্র ২০ টন পাওয়া যায়। বাকি চাল হাওয়া হয়ে যায় সিএসডি থেকেই। এ ছাড়া ঢাকা জেলা আনসারকে ৭০ টন চাল দিয়ে লেজার ও অন্য রেজিস্ট্রার খাতায় ২৫৮ টন চাল সরবরাহ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এমন সব অনিয়ম উপস্থিত কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তিতেও উঠে আসে, যা লিখিতভাবে র‌্যাব দুদকে সরবরাহ করেছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নানা ধরনের অনিয়মের কথাও স্বীকার করেন।

কিন্তু অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে জেল-জরিমানা না করে বিষয়টি দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলম আমাদের সময়কে বলেন, কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে অনিয়মের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে খবর পাচ্ছিলাম। অবশেষে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এখন পরবর্তী বিষয়গুলো দুদক দেখবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে