নজিরবিহীন চাপে সু চি সরকার

  আরিফুজ্জামান মামুন

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১২:৪১ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবশেষে চাপের মুখে পড়েছে মিয়ানমার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা রাখাইনে গণহত্যার কড়া সমালোচনা করে সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া সমস্যার সমাধানে যে কোনো উদ্যোগে বাংলাদেশের পাশে থাকারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দেশ ও সংস্থাগুলো।

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ আর নির্মম পাশবিকতা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী এবং চরমপন্থী বৌদ্ধরা। সাম্প্রতিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে মাধ্যমগুলো জানিয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংগঠন ও রাষ্ট্র অভিযোগ করে আসছে রোহিঙ্গাদের ‘জাতিগত নিধন’ চালাতেই দেশটি এ বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে জাতিসংঘ। গতকাল জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতি শান্ত করতে সেনা অভিযান বন্ধে দেশটির নেত্রী অং সান সু চির হাতে শেষ সুযোগ আছে বলে উল্লেখ করেছেন। গুতেরেস বিবিসিকে বলেন, তিনি যদি এখনই কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে। তবে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার কথা অস্বীকার করে মিয়ানমার বলছেÑ তারা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

এ অবস্থার মধ্যেই আগামীকাল মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সু চি। গুতেরেস বলেছেন, ওই ভাষণেই সু চির জন্য শেষ সুযোগ। তিনি ওই ভাষণের মাধ্যমেই রাখাইনে সেনাবাহিনীর আগ্রাসন বন্ধের পদক্ষেপ নিতে পারেন। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত এবং মিয়ানমার সরকারকে তাদের আলাদা জাতি-পরিচয়ও মানতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ওয়াটকিন্স বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একটিই, তা হলোÑ সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া। এখন পর্যন্ত এ নিয়ে বড় কোনো অগ্রগতি না হলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ সমস্যা সমাধানে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আমি নিশ্চিত মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞ ও সহিংসতা ঠেকাতে সম্ভাব্য সব ধরনের উপায় নিয়েই আলোচনা করবেন তারা। গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এসব কথা বলেন তিনি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোসহ সমস্যাটি কূটনৈতিকভাবেই মোকাবিলার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দিন-দিন বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছে আরও বেশি ত্রাণ চাওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে ওয়াটকিন্স জানান, রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্থানীয় জনগণের জন্যও সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

গত বুধবার রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ব্রিটেন এবং সুইডেনের ডাকা নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া নির্বিঘেœ ত্রাণকার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ব্রিটেন ও সুইডেনের প্রস্তাবে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা। আশঙ্কা ছিল মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতায় কোনো প্রস্তাব বা বিবৃতি দেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধে দেওয়া বিবৃতিতে সায় দেয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাও ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য চলতি মাসের শুরুতে নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলেও চীনের বিরোধিতায় তাতে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।

বৈঠক শেষে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রদূত তাকেদা আলেমু সাংবাদিকদের বলেন, পরিষদের সদস্যরা মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং রাখাইনে সহিংসতা বন্ধে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। বৈঠকে রাখাইনে মানবিক ত্রাণ তৎপরতা চালানোর অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আগে জাতিসংঘে ব্রিটেনের উপরাষ্ট্রদূত জনাথন অ্যালেন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সহিংসতার অবসান দেখতে চাই। বার্মায় ও রাখাইনে জনগণের জন্য অবিলম্বে ও ব্যাপকভাবে মানবিক ত্রাণ তৎপরতার সুযোগ চাই। সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ওলফ স্কুগ বলেন, তিনি আশা করছেন এখন কী করতে হবে সে সম্পর্কে একটি ঐক্যবদ্ধ ফল ও সুস্পষ্ট বার্তা (মিয়ানমারকে) দেওয়া। ব্রিটেন ও সুইডেন অং সান সু চিকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন ও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। নিরাপত্তা পরিষদের এ বৈঠক মিয়ানমারের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে। বৈঠক আয়োজনের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন সম্মেলনে যোগদান থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন সু চি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাল রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু বিষয়ে ওআইসির কন্টাক গ্রুপের (পড়হঃধপঃ মৎড়ঁঢ়) একটি সভায় অংশ নেবেন। এই সভায় রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা, নিপীড়ন এবং এর ফলে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সে সভায় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের দুর্দশা তুলে ধরবেন এবং সমস্যার সমাধানে মুসলিম উম্মাহর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করবেন। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশন সামনে রেখে বাংলাদেশ ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে। সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা ইস্যুটি শক্তভাবে তুলে ধরবেন। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার যে গণহত্যা চালাচ্ছে সেটি তুলে ধরবেন এবং বিশ্বনেতাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাবেন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বাংলাদেশের মানবিক আচরণ এবং তাদের আশ্রয় দেওয়াসহ রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি সাইড লাইনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন শেখ হাসিনা।

ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক বলেছেন, শুধু মানবিক সহায়তা নয়, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানেও পাশে থাকবে যুক্তরাজ্য। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য দেওয়া আড়াই কোটি পাউন্ড সহায়তার কথাও জানান তিনি। শনিবার দুপুরে তার বাসভবনে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

ব্লেক বলেন, একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে, যার অর্থ হলো আনান কমিশন বাস্তবায়নে সমর্থন জানানো।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের স্ত্রী এমিনি এরদোগান সুপরিচিত বিশ্বনেতাদের স্ত্রীদের কাছে চিঠি লিখেছেন, যেন রোহিঙ্গাদের সাহায্যে তারা এগিয়ে আসেন। চিঠিতে এমিনি বলেন, একজন মা হিসেবে, একজন নারী কিংবা মানুষ হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জাতিগত বিভেদ থাকা সত্ত্বেও আমরা এমন একটি পৃথিবী গড়তে পারি, যেখানে সব মানুষ একসঙ্গে বসবাস করবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে