অধিকাংশ দল চায় নিরপেক্ষ সরকার

  আসাদুর রহমান

০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৭, ১৫:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিবন্ধিত ৪০ দলের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৩টি দল সংলাপে অংশ নিয়ে তাদের দাবি তুলে ধরেছে। ১৭টি দল নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক, সহায়ক, জাতীয় পরিষদ কিংবা তদারকি সরকারের পক্ষে মত দিয়েছে। আর নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে ১৪টি দল। এ ছাড়া ‘না’ ভোট চালুর কথা বলেছে বেশ কয়েকটি দল।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা সংলাপ প্রসঙ্গে বলেন, সবার বক্তব্য শুনে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন করব। যেসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করা প্রয়োজন, সেগুলো আমরা সমঝোতা করে নির্বাচনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সেটি চিন্তা করব।

দলগুলোর প্রধান দাবিগুলো

বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল): সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার আগে বর্তমান সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দেওয়া; নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক সরকার; নির্বাচনের ৩০ দিন আগে ও নির্বাচনের পরের ১৫ দিন পর্যন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন করা; কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; প্রকাশ্যে ভোট গণনা শেষে প্রত্যেক প্রার্থীর এজেন্টের স্বাক্ষর নিয়ে ফল প্রকাশ করা।

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি: নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া; তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকালীন তদারকি সরকার গঠনে রাজনৈতিক সমঝোতা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে রাখা; ভোটার সংখ্যা অনুপাতে সংসদীয় আসন পুনঃনির্ধারণ করা; ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করা; প্রবাসীদের ভোটাধিকার; অনলাইন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট: রাজনৈতিক দলের সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রাখার বিধান বাতিল; সেনাবাহিনী মোতায়েন; ইসির অধীনে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় রাখা।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: সেনা মোতায়েন; সংসদ ভেঙে অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করা; অনলাইনে মনোনয়ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া।

খেলাফত মজলিস: নিরপেক্ষ অস্থায়ী সরকারের অধীনে নির্বাচন করা; নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও সেনা মোতায়েন; নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে নির্বাচনের ৭২ ঘণ্টা পর পর্যন্ত সেনাবাহিনী মোতায়েন করা; অনলাইনে মনোনয়নের ব্যবস্থা করা; প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও প্রবাসীদের ভোটার করা।

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি: ভোট গ্রহণের কমপক্ষে ৮ দিন আগে সেনা মোতায়েন; সহায়ক সরকার; সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করা।

ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন: কালো টাকা, সন্ত্রাস ও ধর্মের অপব্যবহার মুক্ত নির্বাচনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা; মনোনয়নপত্র অনলাইনে জমা দেওয়া।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি: তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন করা; একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া; নির্বাচনের তিন মাস আগ থেকে নির্বাচনের পরবর্তী কমপক্ষে এক মাস পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করা।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ): নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা; তফসিল ঘোষণার আগেই সংসদ বিলুপ্ত ও বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা।

প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি (পিডিপি): প্রধানমন্ত্রীকে ঐচ্ছিক ছুটি গ্রহণ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাহী প্রধান করে অপরাপর কমিশনার এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হতে পারে। তবে শর্ত থাকে, একই সময় মন্ত্রিপরিষদ ও পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া; সেনাবাহিনীকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে সাধারণ ভোটারদের ভোটদানের নিশ্চয়তার বিধান করা; পোলিং ও প্রিজাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তা বিধানে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে কেন্দ্রে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া।

গণফোরাম: সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন যে সরকার থাকবে ও যে প্রশাসন থাকবে তাদের নিরপেক্ষ থাকা; ‘মানি পাওয়ার (অর্থের দাপট)’ ও ‘মাসল পাওয়ার (পেশিশক্তি)’ নিয়ন্ত্রণ করা; প্রশাসনকে হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা; প্রবাসীদের ভোটাধিকার; নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি; ঋণখেলাপিদের জামিনদারকে নির্বাচনে অযোগ্য; নির্বাচনে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করা ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ: তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল; সেনাবাহিনী মোতায়েন করা; নির্বাচনের এক বছর আগে থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অবাধ সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার পরিবেশ তৈরিতে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ গ্রহণ করা; অবৈধ ও কালো টাকার মালিকরা নির্বাচনে যেন অংশগ্রহণ করতে না পারে সে ব্যবস্থা করা; প্রবাসীদের ভোটারধিকার নিশ্চিত করা।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি): বিগত জাতীয় নির্বাচনে নিবন্ধিত যেসব দল অংশ নিয়েছিল, তাদের থেকে প্রতিনিধি নিয়ে সরকার করা; সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা, অনলাইনে মনোনয়পত্র জমা, প্রবাসী ভোটাধিকারের ব্যবস্থা করা।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ( জাগপা): নির্বাচনের সময় পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া; নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা বাতিল করে তিন মাসের অবকাশকালীন ছুটি দেওয়া; বাংলাদেশের নাগরিক অবসারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সাবেক বিচারপতি এবং দেশের বিশিষ্টজনদের সমন্বয়ে সৎ গ্রহণযোগ্য নির্দলীয় ব্যক্তি দ্বারা সরকার গঠন করা; ৩০ দিন আগে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা।

ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ: তফসিল ঘোষণার পর সংসদ ভেঙে দিয়ে তিন ধাপে নির্বাচন করা; না ভোটের বিধান রাখা; প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করা; অনলাইনে নমিনেশন ফরম জমাদানের ব্যবস্থা রাখা।

বাংলাদেশ মুসলিম লীগ: নির্বাচনের তিন মাস আগে সংসদ বিলুপ্ত করে ভোটের এক সপ্তাহ আগে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা; নিবন্ধিত প্রতিটি দলের একজন প্রতিনিধি নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন; কাস্টিং ভোটের পরিমাণ ৫০ শতাংশের কম হলে পুনঃনির্বাচন; ইভিএম ব্যবহার না করা; প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো; না ভোটের ব্যবস্থা না রাখা; জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও দলের নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক করা; দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নির্বাচনী দায়িত্ব না দেওয়া; রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে অতিরিক্ত জেলা জজদের নিয়োগ দেওয়া।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন; জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন বিলুপ্ত করা; বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রার্থীর নামে গেজেট প্রকাশ না করে পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন: সংসদে থাকা দলগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ): সংসদ ভেঙে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন করা; নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন; দলনিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে আলোচনা; নির্বাচনী ব্যয় ও জামানত কমানো; প্রতি তিন আসনে একজন নারী সদস্যের অংশগ্রহণ; ইভিএম নিয়ে আরও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম নেওয়াসহ ১৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।

জাকের পার্টি: ইভিএম ব্যবহার; ইসির বাজেট বাড়ানোসহ ২৭ দফা প্রস্তাব দিয়েছে জাকের পার্টি।

রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের বিষয়ে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, কমিশন সব দলের মতামত নেবে। সেখান থেকে যেসব দাবি গ্রহণ করার মতো সেগুলো গ্রহণ করবে।

গত ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংলাপ শুরু হয়। ২৪ আগস্ট থেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু হয়। এ পর্যন্ত ২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক শেষ হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) এবং ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ইসি নির্ধারিত সময়ে সংলাপে অংশ নিতে না পারায় তারিখ পুনঃনির্ধারণের আবেদন করেছে। আগামী ১৫ অক্টোর বিএনপি এবং ১৮ অক্টোর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসবে ইসি। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্যান্য দলের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাবে ইসি।

২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে