ট্রিপল প্লের নামে বিটিসিএলের ৪০০ কোটি টাকা গচ্চা

প্রকাশ | ০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:১৭

শাহিদ বাপ্পি

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ট্রিপল প্লে (ত্রিমাত্রিক) সেবা সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছেনি। সেবাটি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে কোম্পানিটি ৪ বছর আগে ১ লাখ ৩০ হাজার সংযোগের যন্ত্রপাতি ক্রয় করেছিল। কিন্তু তিন বছরে মাত্র ৫ হাজার গ্রাহকের মাঝে ট্রিপল প্লের আংশিক সুবিধা পৌঁছাতে পেরেছে বিটিসিএল। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ সংখ্যা আরও কম। শুধু তা-ই নয়, ২০১৫ সালে ট্রিপল প্লে উদ্বোধনের পরদিন তা বন্ধ হয়ে যায়।

বিটিসিএল সূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ট্রিপল প্লে সেবার আওতায় ছিল ভয়েস কল, ইন্টারনেট ও টিভি দেখার সুবিধা। বর্তমানে সীমিত আকারে রাজধানীর কিছু গ্রাহককে ট্রিপল প্লে সেবার নামে শুধু ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকজন ভিভিআইপি সেবাটি পাচ্ছেন। তবে টিভি সেবা এখনও চালু হয়নি।

অভিযোগ উঠেছে, ট্রিপল প্লে সেবা চালু না হওয়ার পেছনে প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে। যারা ডিশ টিভি ও ইন্টারনেট সেবা দেয়, তারা কৌশলে এটি বন্ধ রেখেছে। তবে বিটিসিএল বলছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে এটি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এ ত্রুটি দূর করতে বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। টাকা পাওয়া যাচ্ছে না বলে ট্রিপল প্লেও চালু হচ্ছে না।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের জুনে বিটিসিসিএলের বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহফুজ উদ্দিন আহমেদ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই কেটি মারুবেনিকে ৪০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করেন। শুধু তা-ই নয়, সে সময় বিটিসিএলের যন্ত্রপাতি বুঝে নেওয়ার (পিএটি) কমিটিকে পাশ কাটিয়ে বিলটি পরিশোধ করা হয়েছে। প্রকল্পের কোনো দায়দায়িত্ব আর ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নেই। এখন প্রকল্পটি চালু করতে হলে আবার একটি প্রকল্প তৈরি করতে হবে। এভাবেই চলছে বিটিসিএলে সরকারি অর্থের হরিলুট!

ট্রিপল প্লের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার জন্য রাজধানী ঢাকার সর্বত্র ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপনের কাজটিও শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে বিটিসিএল। সর্বশেষ ট্রিপল প্লের সুবিধা চালু করার জন্য আবারও উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে টেলিযোগাযোগ বিভাগ। তবে কতদিনের মধ্যে গ্রাহক এ সুবিধা পেতে পারেন, বিটিসিএলের কোনো কর্মকর্তাই এটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না।

বিটিসিএলের দাবি, এই সেবা দেওয়ার জন্য তাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাপানের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকার ঋণ সহায়তায় বিটিসিএলের নেওয়া ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ (টিএনডিপি) লটে অংশের মাধ্যমে ২০১১ সাল থেকে ট্রিপল প্লে সেবা দেওয়ার জন্য উন্নত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে শুরু থেকেই প্রকল্পটি ঘিরে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ঠিকাদারকে জাপানি ইয়েনে মূল্য পরিশোধের শর্ত লঙ্ঘন করে মার্কিন ডলারে মূল্য পরিাশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে যায়। ট্রিপল প্লের সেবার জন্য প্রয়োজনীয় জিপন যন্ত্রপাতি স্থাপনের আগেই যন্ত্রপাতি স্থাপন দেখিয়ে ঠিকাদারকে মূল্য পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে বড় বিতর্ক ওঠে।

জানা গেছে, বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওটি) কমিটিকে পাশ কাটিয়ে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যয় বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়। এই প্রকল্পের আরেক অংশ লট-বির দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক ওঠে। সেই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ ও আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াইও চলে। মামলায় বিটিসিএল হেরে যাওয়ার পর নানা অপকৌশলে অত্যাধুনিক ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপনের জন্য গৃহীত প্রকল্পের লট-বি অংশটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এ অংশের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণও জাইকা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। জাইকা ঋণ প্রত্যাহারের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটিও টিএনডিপি প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের প্রমাণ পায়।

সূত্র জানায়, লট-বি অংশের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব জেলা শহরে নিরবচ্ছিন্ন ফাইবার অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার কথা ছিল। প্রথমে রাজধানী এবং পরে দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরেও একই সংযোগে ভয়েস কল, ক্যাবল টিভি এবং ইন্টারনেট সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু লট-বি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক না থাকার কারণেই লট-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া ট্রিপল প্লে সুবিধা রাজধানীর সাধারণ গ্রাহকের কাছেই পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। কিছু এলাকায় টিএনডিপি প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের জুন মাসে। তবে দুদফায় সময় বাড়িয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয় ২০১৫ সালের জুনে। দেড় বছর পর ট্রিপল প্লে সুবিধার খ-িত সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে শুধু রাজধানীর মিরপুর ও বারিধারা, ডিওএইচএস ও গুলশানের আশপাশের এলাকায়। এসব এলাকায় ট্রিপল প্লের মাধ্যমে একই সংযোগে ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ক্যাবল টিভি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এনজিএন (নেক্সট জেনারেশন নেটওয়ার্ক)-ভিত্তিক সফট সুইচের মাধ্যমে যে ধরনের উন্নত নেটওয়ার্ক সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল, তা-ও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এই সেবার আদলে এ দুই এলাকায় মূলত কিছুটা উন্নত ইন্টারনেট সেবা দিয়ে ট্রিপল প্লে বলে চালিয়ে যাচ্ছে বিটিসিএল।

সূত্র জানিয়েছে, ট্রিপল প্লে চালু না হওয়ার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালীদের হাত। এটি চালু হলে ডিশ টিভির কোনো প্রয়োজন হবে না। বিটিসিএলের একশ্রেণির কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে এ সেবা চালু হতে দিচ্ছে না। বিটিসিএলকে লোকসান থেকে লাভজনক করতেই ব্যয়বহুল টিএনডিপি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার পর থেকেই ক্যাবল টিভি, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সেবাদাতা ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো আপত্তি তোলে। এ প্রভাবশালী মহলের মদদেই নানা কৌশলে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে বিটিসিএলের এমডি মাহফুজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।