কঠিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

  আরিফুজ্জামান মামুন

১৩ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ১৪:৩০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা ইস্যুতে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। দিন যত যাচ্ছে অবস্থা তত জটিল হচ্ছে। সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি স্বীকারই করছে না মিয়ানমার। দেশটির সেনাপ্রধান পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ এবং বাংলাদেশ থেকে আসা জনগোষ্ঠী বলে উল্লেখ করেছে। গত সপ্তাহে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের কার্যালয়ের মন্ত্রী ইউ কিয়াও টিন্ট সুয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক শেষে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়। সেই বৈঠকে ফেরত প্রক্রিয়া ঠিক করতে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কথাও বলা হয়। ফেরত প্রক্রিয়া সম্মিলিত একটি প্রস্তাব ইউ কিয়াও টিন্ট সুয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে মিয়ানমার সাড়া দেয়নি। ২০০৪ সালেও এমন জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল কিন্তু মিয়ানমার তাতেও সাড়া দেয়নি।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরিয়ে নেবে কিনা তা নিয়ে খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীই সংশয় প্রকাশ করেছেন। গত মঙ্গলবার রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে মিয়ানমার কী করছে সেটা দেখেই বোঝা যাবে সত্যিই তারা প্রত্যাবাসনে আগ্রহী কিনা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব কিছু করা হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমস্যার দুটি দিক। একটি তাদের জাতীয়তা, অন্যটি প্রত্যাবাসন। দুটি সমস্যার সমাধানই মিয়ানমারের হাতে।

সূত্র জানায়, ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার মিয়ানমারের যে প্রস্তাব তাকে ‘আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার কৌশল’ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। ১৯৯২ সালে সম্পাদিত সমঝোতা বর্তমান বিবেচনায় বাস্তবসম্মত নয়। আর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা চায়। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ইউ কিয়াও টিন্ট সুয়ের বৈঠকে মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের কথা বলে। এটিকেই বাংলাদেশ কৌশল হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ মনে করে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত না থাকলে মিয়ানমার সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী নাও হতে পারে।

এদিকে বন্ধুপ্রতিম ভারত, চীন এবং রাশিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন, রাশিয়া ও ভারতের এ নীরবতা বাংলাদেশকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। ত্রাণ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে ভারত-চীনের কর্মকা-। এ অবস্থায় সব থেকে কাছের প্রতিবেশী ভারত যেন ভূমিকা রাখে সেজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ২৩ অক্টোবর মিয়ানমার সফরে যাবেন। সফরকালে তিনি দুটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবেন। সমঝোতা দুটি হলো বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন এবং ফ্রেম অব এগ্রিমেন্ট অব সিকিউরিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। তবে সেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের স্রোত অব্যাহত আছে। বিশ্ব সম্প্রদায় সেনা অভিযান বন্ধের দাবি জানালেও মিয়ানমার তা অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর আশঙ্কা এবং পূর্বাভাস দিয়েছে, ২৫ আগস্টের ঘটনার দেড় মাস পরও রাখাইন জ্বলছে, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসা অব্যাহত রাখবে। পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকÑ সুজন রোহিঙ্গা সমস্যার জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে। সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জেনোসাইডের ১০টি শর্ত রয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় যার প্রতিটি পূরণ হচ্ছে। এটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে চলমান হত্যাযজ্ঞ। সুজনের নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু ভয়াবহ নিরাপত্তাজনিত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এ বিরাট উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আবদ্ধ করে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ফলে তারা জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রচেষ্টায় স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, এমনকি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে আরও জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ সমস্যার আশু সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ, তাই ভবিষ্যৎ এ সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশ্বের অন্য প্রান্তের বিভিন্ন ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে যেতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীর চাপ সহ্য করা দুরূহ হবে।

এদিকে মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চি সহিংসতাকবলিত রাখাইন রাজ্যে ‘সন্ত্রাসী হামলার শিকার’ হওয়া মানুষের পুনর্বাসনের পদক্ষেপ দ্রুত করতে তাগাদা দিয়েছেন। তবে সেখানে সংঘটিত জাতিগত নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ও রাখাইনের রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। গত বুধবার নেপিডোতে দেশটির জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভায় সু চি রাখাইনের ‘সন্ত্রাসী হামলার শিকার’ হওয়া এলাকাগুলোয় মানবিক ত্রাণ পৌঁছানো, পুনর্বাসন ও উন্নয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের আবারও বাঙালি আখ্যা দিয়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান বলেছেন, উপনিবেশের কালে ব্রিটিশ শাসকরা তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে তাদের নিয়ে এসেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সেলের সঙ্গে এক বৈঠকে এই মন্তব্য করেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার তার ফেসবুক পেজে এমনটা জানানো হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে