প্রধান বিচারপতি বারবার শপথ ভঙ্গ করেছেন

  আসাদুর রহমান

১৫ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৭, ১৪:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অসুস্থতার কথা বলে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। যাওয়ার আগে তিনি গণমাধ্যমকে বলে গেছেন, তিনি অসুস্থ নন। প্রধান বিচারপতির বিপরীতমুখী কথা, বিদেশে যাওয়া ও ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রসঙ্গে কথা হয় সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের সঙ্গে। গতকাল সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক আসাদুর রহমান

আমাদের সময় : প্রধান বিচারপতি অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়েছেন। বিদেশ যাওয়ার আগে বলেছেন- তিনি অসুস্থ নন...
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : উনি কোন প্রেক্ষাপটে ছুটি নিয়েছেন, সেটা বুঝতে হবে। একটি মহল বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। তাদের চেষ্টা ছিল সরকারকে উৎখাত। সেভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু তাতে বাধ সাধলেন আপিল বিভাগের অন্য পাঁচ বিচারপতি। যখন সিনহার দুর্নীতির তথ্যগুলো টেলিভিশনের পর্দায় প্রমাণসহ এসে গেল, তখন পাঁচজন দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন তারা দুর্নীতিবাজপ্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসবেন না। এটা তারা সিনহার বাড়িতে গিয়ে বলে দিলেন। তখন তিনি বললেন, তিনি কী পদত্যাগ করবেন? এ সময় সিনহা বিষয়টি নিয়ে প্রেস কনফারেন্স করতে চেয়েছিলেন। তখন তারা বললেন, যদি প্রেস কনফারেন্স করেন, তা হলে আপনার দুর্নীতির বিষয়গুলো নিয়ে সাংবাদিকরা নাস্তানাবুদ করে ফেলবে। তখন সিনহা ভাবলেন, পদত্যাগ করলে দুর্নীতি দমন কমিশন সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ধরবে। তাই তিনি ছুটি নিলেন। অথচ রাজনৈতিক দল বলছে, তাকে নাকি প্রেশারাইজ করে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। উনি প্রেশারাইজ হওয়ার লোক নন। তিনি ছুটি নিয়েছেন, কারণ তার কোনো পথ ছিল না। কারণ তিনি কোর্টে একা বসতে পারতেন না। কোরাম হতো না। এ ছাড়া ওনাকে বলা হলো, ৩ অক্টোবর আইনজীবীদের সঙ্গে কদমর্দনে তিনি গেলে অন্যরা যাবেন না। পরে তিনি ছুটিতে গেছেন। তিনি ছুটিতে যাওয়ায় বিএনপির যে উদ্দেশ্য এই গণতান্ত্রিক সরকারকে ফেলে দেওয়া, সেটা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তিনি যদি একদিনও ক্ষমতায় বসতে পারতেন, তা হলে ১৫২ জন সাংসদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে রায় দিয়ে পাকিস্তান স্টাইলে একটি ক্যু ঘটিয়ে দিতেন। আবদুল গাফফার চৌধুরী তার অত্যন্ত স্বজন। তিনি কিন্তু বলেছেন, এ ধরনের একটা ষড়যন্ত্র কাজ করছে। তিনি বসতে পারলে পাকিস্তানি স্টাইলে কিছু একটা করতেন।

আমাদের সময় : তাহলে কি তিনি অসত্য বলেছেন? এতে প্রধান বিচারপতির শপথ ভঙ্গ হয় কিনা?
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : ওনার বক্তব্যগুলো কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা, সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ ওনার বক্তব্য দ্বন্দ্ববিদ্ধ। তার ছুটির চিঠিতে নিজেই বলেছেন অসুস্থ। এখন আবার বলছেন অসুস্থ নন। এটা তো মিথ্যাচার। একজন বিচারপতি যিনি শপথ নিয়েছেন ন্যায় বিচারের পক্ষে, কোনো প্রকার ভয়-ভীতি-অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে থেকে বিচার করেন। তিনি তা না করে শপথ ভেঙেছেন। তার শপথ ভঙ্গ এই প্রথম নয়, এর আগেও বহুবার করেছেন। উনি সাকা পরিবারের সঙ্গে দেখা করে... আসামি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শপথ ভঙ্গ করেননি? একজন বিচারকের জন্য আসামির পরিবারে সঙ্গে দেখার করার চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে। এটা কিন্তু বানানো কথা নয়। প্রকাশ্য আদালতে দেখা করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। এই সাক্ষাৎ দেশে এবং বিদেশে দুই জায়গায়ই হয়েছে। ওনার যে দুর্নীতির, টাকা-পয়সার প্রতি লোভ ছিল, সেটা আমরা আগে থেকেই জানতাম। একজন নিম্ন আদালতের বিচারক যদি আসামির লোকের সঙ্গে দেখা করতেন, তা হলে সেদিনই তার চাকরি চলে যেত। তিনি আরও শপথ ভঙ্গ করেছেন। তিনি মীর কাশেম আলীর মামলা নিয়ে বহু ধানাই-পানাই করেছেন। দুই-দুইবার সময় দিয়েছেন। সেখানেও তার প্ল্যান ছিল মীর কাশেম আলীর মামলা আবার ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেবেন। সেটা হতে দেয়নি। একটা রাউন্ড টেবিল করা হলো। সেখানে দুজন মন্ত্রীকে সাজা দিলেন। এই কনটেম্পটা ছিল ওনার বড় হাতিয়ার। এটার ভয় দেখিয়ে তিনি অনেক কিছু করে নিতেন।

আমাদের সময় : বিএনপিসহ অনেকে বলছেন, তিনি সরকারের চাপে ছুটি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন।
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : তিনি কারো চাপে দেশ ছাড়ছেন না। তিনি কিন্তু পালাচ্ছেন। আমার মতে তাকে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি। কারণ তার বিরুদ্ধে যখন মামলা হবে, তখন কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। তিনি কিন্তু তিন মাসের নয়, তিন বছরের ভিসা নিয়ে গেছেন। সুতরাং বুঝতে হবে। তিনি ফিরে আসার কথা বলেছেন। আসলে তিনি ফিরে আসবেন না।

আমাদের সময় : তা হলে তিনি বিদেশে গেলেন কী কারণে?
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : উনি বিদেশে পালিয়ে গেছেন দুদকের মামলা থেকে বাঁচার জন্য। ওনার বিরদ্ধে ১১টা অভিযোগ। তিনটা তো দেখেছি- পে-অর্ডার, ট্যাক্স রিটার্ন আর সাবেক বিচারপতির ব্যাপার। ওনার সহকর্মীরা ১১টি অভিযোগ করেছেন বলে শুনেছি। সেগুলোর এভিডেন্স রয়েছে। তিনি অনেক কথা কাল বলেছেন বাট চেকের বিষয়ে বা ট্যাক্সের বিষয়ে কিছু বলেননি। তার কাল অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল; কিন্তু করেননি। বরং বলে গেলেন, আমি পালাচ্ছি না, চোরের মন ক্ষিরাই খেতে।

আমাদের সময় : তিন মাস আগে আপনি বলেছিলেন, প্রধান বিচারপতি শুধু পদ ছাড়লে হবে না, দেশ ছাড়তে হবে। কীসের ভিত্তিতে বলেছিলেন?
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : এটা বলেছিলাম অন্য প্রেক্ষাপটে। তিনি কোর্টে পাকিস্তানের আদালতের আদেশের কথা বলেছিলেন। তিনি যখন এতই পাকিস্তানপ্রিয়, তা হলে তিনি এ দেশে থাকবেন কেন? যে ব্যক্তি একাত্তরে শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন, স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন, তার তো এ দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই।

আমাদের সময় : আপনার সঙ্গে ওনার দূরত্বের সূত্রপাত কবে থেকে?
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : তিনি চিফ জাস্টিস হওয়ার পরে আমাকে যুদ্ধাপরাধের মামলা পরিচালনা থেকে বাদ দিয়েছেন। আমি ওনার কাছে গিয়ে বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাকার পরিবার তাদের মামলার শুনানিতে আপনাকে রাখতে না করেছে। এ ছাড়া মওদুদ আহমদও তার বাড়ির মামলার শুনানিতে আমাকে রাখতে না করেছে। এ জন্য আমি আপনাকে বাদ দিয়েছি। এ সময় আমি বললাম, এটা আপনি কীভাবে করলেন? সিদ্ধান্ত তো আপনার। আসামিদের চাপে বা মামলার পক্ষদের চাপে এটা করবেন, সেটা তো হতে পারে না। এটাও একটা মস্ত বড় শপথ ভঙ্গ। তিনি ফরমান জারি করেছেন- অবসরের পরে রায় লেখা যাবে না। একজন বিচারপতি লাস্ট ওয়ার্কিং ডে কাজ করার পরে তার কিছু কাজ থেকে যায়। কিন্তুÍ অবসরের পরে তিনি আমার রায় লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমার রুমে তালা দিয়েছেন, কম্পিউটার, স্টাফ কেড়ে নিয়েছেন। আমার পেনশন ছয় মাস বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এগুলো হলো শপথভঙ্গ। এটাই হলো অনুরাগ-বিরাগ।

আমাদের সময় : আপনি বলতে চাচ্ছেন দুর্নীতির দায়ে তার বিরুদ্ধে বিচার হবে। কিন্তু সাবেক এক বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত না করার জন্য সুপ্রিমকোর্ট থেকে দুদকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে...
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্ট থেকে একটা রুল জারি হয়েছে রেজিস্ট্রার ও অনুরুপ (অরুনাভ) চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। আসলে ওনারা তো আদেশ মোতাবেক কাজ করেছেন। সুতারাং রুলটা তো বাস্তবিক অর্থে সিনহার বিরুদ্ধেই জারি হয়েছে। অনুরুপ বলির পাঁঠা।

আমাদের সময় : ষোড়শ সংশোধনী রায়কে কেন্দ্র করেই এত ঘটনা। রায়টাকে আপনি কতটুকু সমর্থন করেন?
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি অনেক বাজে কথা বলেছেন। উনি পার্লামেন্ট সম্পর্কে বাজে কথা বলেছেন। এই রায় কিন্তু ওনার লেখা নয়। কারণ প্রত্যেকটা মানুষের লেখার একটা স্টাইল আছে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছি। যেসব শব্দ তিনি এই রায়ে উল্লেখ করেছেন, সেসব শব্দ কিন্তু অন্য কোনো রায়ে নেই। তা ছাড়া মাত্র পঁচিশ দিনের মধ্যে এটা সম্ভব নয়। এ ছাড়া উনি যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিসল পুনর্প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছেন এটা কিন্তু বেআইনি। তিনি ১১৬ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বলেছেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলার ব্যাপারে তিনি রাষ্ট্রপতিকে বাদ দিয়ে সুপ্রিমকোর্ট বসাতে চেয়েছিলেন; কিন্তু সেটা পারেননি। কারণ এই ইস্যুতে ওনার বিপক্ষে ছিলেন চারজন।

আমাদের সময় : বিদেশে যাওয়ার আগে তিনি একটি চিঠিতে ভারপ্রাপ্ত বিচারপতির বিষয়ে বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কা করেছেন।
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : যখন অন্য ব্যক্তি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন, তখন তার ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করতে পারবেন। এতে আইনে বাধা নেই। সুতরাং সিনহা বাবু যা বলেছেন সেটা বেঠিক। এমনও হয়েছে, আমাদের লেখা রায়, আমাদের সই অন্যদের দিয়ে করিয়েছেন। যেটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

আমাদের সময় : ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সরকার আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে... কতটুকু পরিবর্তন হতে পারে?
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : আমি মনে করি ন্যায়বিচার হবে। তার ৪শ পৃষ্ঠার অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয় এবং এই সরকারের ইচ্ছাকৃত বিরুদ্ধাচরণ, এই সরকারের পতন ঘটানো, হেয় করার জন্য যে কথাগুলো বলেছেন, এ দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার জন্য, প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করার জন্য এবং সমস্ত ইনিস্টিটিউশনকে হেয় করার জন্য... আমি মনে করি সরকারের চাওয়া উচিত হবেÑ তার এই ৪শ পৃষ্ঠার পুরোটা বাতিল করে দেওয়ার জন্য আবেদন করা। এর মধ্যে প্রয়োজিনীয় কিছুই নেই।

আমাদের সময় : আপনাকে ধন্যবাদ।
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে