মেয়র আনিসুলের অনুপস্থিতির আড়াই মাস

ঢাকা উত্তরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে

  সানাউল হক সানী

১৬ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৭, ১৫:৫৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাচিত মেয়র আনিসুল হক। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দৃশ্যত উন্নয়ন করতে না পারলেও আশা জাগিয়েছিলেন নগরবাসীর মনে। বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছিলেন। তবে সবকিছু থমকে গেছে গত আড়াই মাসে। গত ২৯ জুলাই পরিবারসহ লন্ডনে যান আনিসুল হক। সেখানে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ভর্তি হন হাসপাতালে। সেই থেকে অদ্যাবধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি। মেয়রের অবর্তমানে সব উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। রুটিন ওয়ার্কের বাইরে নেওয়া হয়নি নতুন কোনো উদ্যোগ।

যানজট নিরসন, ফুটপাত ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ বেশকিছু কার্যক্রম হাতে নিয়ে নগরবাসীর মনে আশার সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন মেয়র আনিসুল হক। বড় বড় রাঘব-বোয়ালের রোষানলে পড়লেও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবৈধ স্থাপনা তিনি উচ্ছেদ করেছিলেন। তবে আনিসুল হকের অবর্তমানে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে সেসব স্থাপনা। এমনকি নাগরিকদের সুরক্ষায় ও অধিক সেবা প্রদানের জন্য মেয়রের গৃহীত ও প্রশংসিত বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নেও অনেকটাই ভাটা পড়েছে। কাজেই নগর কর্তৃপক্ষের কাজে গতি ফিরিয়ে আনতে মেয়রের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয় প্যানেল মেয়র ওসমান গনিকে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ডিএনসিসি কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অনেকটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। সবার মধ্যেই গা-ছাড়া ভাব।

লন্ডনে অবস্থানকালীন ১৩ আগস্ট হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আনিসুল হক, ভর্তি হন হাসপাতালে। মেয়রের এমন অসুস্থতায় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ডিএনসিসির কর্মকা- চলমান রাখতে তিন সদস্যের একটি প্যানেল মেয়র নির্বাচন করে। তারা হচ্ছেন ডিএনসিসির ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ওসমান গনি, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল মোস্তফা এবং ৩১, ৩২ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর আলেয়া সারোয়ার ডেইজী। গত ৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্যানেল মেয়রের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কাউন্সিলর ওসমান গনি ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাস হয়ে গেলেও এ পর্যন্ত গতি আসেনি ডিএনসিসির কাজে। উপরন্তু আগের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজের ধারাবাহিকতাও ফিরে আসেনি। নেওয়া হয়নি নতুন কোনো প্রকল্পের উদ্যোগ। পুরনো সব কাজ বাস্তবায়ন মনিটরিং করেই সময় পার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আনিসুল হক সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত নাগরিক সেবাসম্পর্কিত বৃহদাকারের এবং নতুন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে ঝুঁকি নিতে রাজি নয় ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, গত এক মাসে ডিএনসিসিতে বড় ধরনের কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। আনিসুল হকের নেওয়া চলমান কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্যানেল মেয়র সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও কাউন্সিলরদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন; নথিপত্রে স্বাক্ষর করছেন।

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত মেয়র চাইছেন না নতুন কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে। তার কাছে আগে থেকে চলমান কাজগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই চ্যালেঞ্জ। কিছুদিনের মধ্যেই নতুন করে দখল হওয়া অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাতগুলো উচ্ছেদে উদ্যোগ নেবেন বলে জানা গেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে ডিএনসিসির কিছু কর্মকর্তাও চাইছেন না নতুন কোনো প্রকল্পে যুক্ত হতে। সবাই মেয়র আনিসুল হকের সুস্থতার পরই নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে ভাবছেন।

নির্বাচনকালীন ১১ পৃষ্ঠার ইশতেহার অনুযায়ী আনিসুল হক ছয়টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে কাজ শুরু করেন ‘পরিচ্ছন্ন-সবুজ-আলোকিত-মানবিক ঢাকা’ গড়ার। তিনি বৃক্ষরোপণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিয়েছিলেন বেশি। বিশেষ করে রাস্তার মিডিয়ান ও ওভারব্রিজের ওপর বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ ছিল চোখে পড়ার মতো। মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন এ উদ্যোগের মাধ্যমে। তবে পাল্টে গেছে চিত্র। অনেক বৃক্ষ পরিচর্যার অভাবে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। অনেকগুলো মরে যাচ্ছে পানির অভাবে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে মেয়র অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিলেন নগরবাসীর। বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ট্রাক শ্রমিকদের। তবে মেয়রের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল উচ্ছেদ অভিযান। কিন্তু গত কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে আগের রূপ। রাস্তার দুপাশে সারি সারি ট্রাক। লেগে আছে যানজট। এ ছাড়া কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরসহ বেশকিছু ব্যস্ততম স্থানে ফুটপাত দখলের উৎসব চলছে।

ডিএনসিসির মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জনগণের চলাচল সহজ করে দিয়েছিলেন মেয়র আনিসুল হক। তবে বর্তমানে নতুন করে সেসব জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের মদদে ও সহযোগিতায়। কল্যাণপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত সড়কের দশাও তথৈবচ। অভিভাবকহীন ঢাকা উত্তরে চলছে দখলের উৎসব।

নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা গড়তে রাস্তার পাশের সব খোলা ডাস্টবিন দ্রুত সরানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন আনিসুল হক। ডিএনসিসি এলাকায় অর্ধশতাধিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) তৈরি করলেও খোলা ডাস্টবিনগুলো আছে আগের মতোই। এ নিয়ে নেই কোনো উদ্যোগ। থমকে আছে এলইডি বাতি লাগানোর কাজও। প্রকল্পটিতে সরকারের অর্থ বরাদ্দ থাকলেও নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় আটকে আছে প্রক্রিয়া।

টানা বৃষ্টির কারণে ডিএনসিসির আওতাধীন রাস্তাঘাটের অবস্থাও করুণ। কিন্তু এসব সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের। অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানী থেকে শুরু করে ডিএনসিসির প্রায় প্রতিটি সড়কেই রয়েছে অসংখ্য ভাঙাচোরা, খানাখন্দ। বেশকিছু সড়কে বড় বড় গর্তের কারণে গাড়ি চলাচলেও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। আনিসুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পরে যানজট কিছুটা কমেছিল। কিন্তু এখন আবার বেড়ে গেছে। অবৈধ পার্কিং, ভেজাল খাবার, দখলসহ বেশকিছু সমস্যা নিরসনে আনিসুল হক উদ্যোগ নিয়েছিলেন মোবাইল কোর্টের। তবে আড়াই মাস ধরে তার অনুপস্থিতিতে সে উদ্যোগ অনেকটাই থমকে গেছে। নতুন নতুন এলাকা দখলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

কয়েক দিনে ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সর্বত্র দখলের মহোৎসব। কারওয়ানবাজার থেকে বিএফডিসি রেললাইন, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড, বেগুনবাড়ী, ফার্মগেট, আগারগাঁও, কল্যাণপুর, গাবতলী, মিরপুর, বনানী, মহাখালীসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব স্থানেই ফুটপাত বেদখল হয়ে গেছে। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে। তবে ফুটপাত ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিল ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অভিযানের পরই আগের অবস্থায় ফিরে গেছে সংশ্লিষ্ট স্থান।

এ বিষয় নিয়ে সম্প্রতি কথা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ডিএনসিসির ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. ওসমান গণির সঙ্গে। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, আমি কিছুদিন অসুস্থ ছিলাম। এর পরও সবার সহযোগিতায় কার্যক্রম পরিচালনা করছি। প্রাথমিকভাবে সার্বিক কর্মকা- পরিচালনা করতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে সবার সহযোগিতায় এ সমস্যা খুব দ্রুত কাটিয়ে উঠছি। সবার সঙ্গে সমন্বয় করে ডিএনসিসির কাজের গতি আরও বৃদ্ধি করা হবে। নগরবাসীকে সেবা প্রদানে আমরা বদ্ধপরিকর। চলমান প্রকল্পগুলো আরও গতিশীল করার পাশাপাশি জনবান্ধব কর্মসূচিও নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে