১১ অভিযোগ তদন্ত করবে কে

  শাহজাহান আকন্দ শুভ ও আসাদুর রহমান

১৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৭, ১১:৪১ | প্রিন্ট সংস্করণ

নৈতিক স্খলন, দুর্নীতিসহ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিমকোর্ট। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত কোন পদ্ধতিতে হবে বা কারা করবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগ অনুসন্ধানের কাজটি কারা শুরু করবে সুপ্রিমকোর্ট, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নাকি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধান বিচারপতির ১১ অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য কোনো কাগজপত্র পায়নি। সুপ্রিমকোর্টও এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেনি। গঠিত হয়নি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলও।

রবিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার প্রায় সবই এন্টি-করাপশন কমিশনের আওতায়। তা হলে আপনারা বুঝতেই পারছেন কে এর অনুসন্ধান করবে, কে এটা তদন্ত করবে। তিনি বলেন, এই যে অ্যালিগেশনগুলো, এগুলোর অনুসন্ধান হতে হবে। যদি অনুসন্ধান হয়, তার যদি সত্যতা পাওয়া যায়, তা হলে মামলা হবে। মামলা হলে ইনভেস্টিগেশন হবে। ইনভেস্টিগেশন হওয়ার পরে প্রশ্ন আসবে প্রধান বিচারপতির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এখানে পরিষ্কারভাবে আমি বলতে চাই, কেউ কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনে যা বলা আছে সবার ব্যাপারেই সেটা পালন করা হবে।

সরকারের তরফ থেকে ওই অভিযোগ দুদকে পাঠানো হবে কিনাÑ এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, দুদকে পাঠানোর আইন আছে, নিয়ম আছে এবং দুদক নিজেও করতে পারে সেটাও আইনে বলা আছে। দুদকে পাঠানোর ব্যাপারে বিবেচনা করব।

আইনমন্ত্রী বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে পুনঃস্থাপিত করা হয়েছে। সরকার ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে কিনা সেটা সম্পর্কেও দ্বিমত আছে। যেহেতু রিভিউ করব, সে কারণে এটা (বিচারপতি অপসারণ) সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যাপার বলে আমার মনে হয় না। এখানে একটা ভ্যাকুয়াম আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কিছু ইনহারেন্ট পাওয়ার আছে, সেটা তিনি ব্যবহার করতে পারেন।

জানা গেছে, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সমালোচনার মুখে থাকা সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ছুটি নিয়ে ১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়া যান। দেশত্যাগের আগে তিনি বলেন, সরকারের আচরণে বিব্রত হয়ে অসুস্থ না হয়েও তিনি ছুটি নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো রেওয়াজ নেই। তিনি শুধু রুটিনমাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে। তার এ বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে পরের দিন শনিবার সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতি গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠান। বিবৃতিতে তারা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসতে চাননি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ব্যতীত আপিল বিভাগের অপর পাঁচ বিচারপতিকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানান। বিচারপতি মো. ইমান আলী দেশের বাইরে থাকায় ওই আমন্ত্রণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। অপর চারজন অর্থাৎ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়া, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেন হায়দার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘ আলোচনার একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সংবলিত দালিলিক তথ্য হস্তান্তর করেন।

সুপ্রিমকোর্টের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বিচারপতি মো. ইমান আলী ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পর ১ অক্টোবর আপিল বিভাগের উল্লিখিত ৫ বিচারপতি এক বৈঠকে বসেন। বৈঠকে ওই ১১টি অভিযোগ বিশদভাবে পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন, ওই সব গুরুতর অভিযোগ প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করা হবে। তিনি যদি ওই সব অভিযোগের ব্যাপের কোনো সন্তোষজনক জবাব বা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন, তা হলে তার সঙ্গে বিচারালয়ে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এ সিদ্ধান্তের পর ওই দিন (১ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অনুমতি নিয়ে পাঁচ বিচারপতি প্রধান বিচারপতির হেয়ার রোডের বাসভবনে সাক্ষাৎ করে অভিযোগগুলো নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক আমাদের সময়কে বলেন, কার কাছে অভিযোগ করবে সেটা বিষয়। রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলে তিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে পাঠাবেন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মধ্য দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ধরে নিলাম, আমরা রায় মানি না। রায়ের রিভিউ হবে, তার আগে রায় মানি না। তা হলে ষোড়শ সংশোধনীতে বলা ছিলÑ কার কাছে কীভাবে অভিযোগ করা হবে, এ ব্যাপারে আইন করে নির্ধারণ করা হবে। সেই আইন হয়নি। সুতরাং সংবিধানে ১৯৭৮ সাল থেকে লেখা আছে। তদন্ত কে করবে।

আইনমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে বলেন, আইন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে অথবা উচ্চ আদালতের রায়কে উপেক্ষা করে বিবৃতি-বক্তব্য দিলে জনমনে বিভ্রান্তি বাড়ে এবং সরকারে ওপর আস্থা হ্রাস পায়।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন আমাদের সময়কে বলেন, প্রথমত এই অভিযোগের ভিত্তি কী? কারা এসব অভিযোগ করেছে? জাতি এ বিষয়ে জানে? এটা একটা এক্সকিউজ। অভিযোগের বেইজ থাকলেও সেটার তদন্ত করবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। রায়ে সেটি স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

তিনি বলেন, ষোড়শ সংশোধনী রায় বাতিলের পরে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে হলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে আসতে হবে। সে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে পরে দুদক বলেন আর যাই বলেন তারা মামলা করবে। দুদক মামলা করলে মনে হবে সরকারের নির্দেশে মামলা করা হয়েছে। সেটা প্রমাণিত হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে বলেছেন, যেহেতু রাষ্ট্রপতি অভিযোগগুলো আপিল বিভাগের বিচারপতিদের জানিয়েছেন এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এই অভিযোগগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এক বেঞ্চে বসতে অপারগতা জানিয়েছেন এবং অভিযোগগুলো আমলে নিয়েছেন সেহেতু এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টেরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবে চাইলে দুদকও অনুসন্ধান করতে পারে। গোলাম রহমান উল্লেখ করেন, সংবিধান অনুযায়ী, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠলে বিচারকরাই তার ব্যবস্থা নেবেন, সেটা তারা নিতে পারেন। সেটাই যৌক্তিক হবে। তাদের নিজেদের খাতিরেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নিয়ে কাজটি শুরু করতে পারেন।

জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে ৯৬ (২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। আর ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদটি বিলুপ্ত করা হয়। পরে ১৯৭৭ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে এক সামরিক আদেশে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে দেওয়া হয়। এরপর তার সময়েই পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান সংবিধানে স্থান পায়। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অনুমোদন করেন। এরপর ২০১১ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাহাত্তরের সংবিধানের অনেক বিষয় ফিরিয়ে আনা হলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রেখে দেওয়া হয়।

সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের (২)-এ বলা হয়েছে, নি¤œরূপ বিধানাবলি অনুযায়ী ব্যতীত কোনো বিচারককে তাহার পদ হইতে অপসারিত করা যাইবে না।

(৩) একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকিবে যাহা এই অনুচ্ছেদে ‘কাউন্সিল’ বলিয়া উল্লেখিত হইবে। এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্য বিচারকের মধ্যে পরবর্তী যে দুইজন কর্মে প্রবীণ তাহাদের লইয়া গঠিত হইবে।

(৫) দফায় বলা হয়েছে, যে ক্ষেত্রে কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র হইতে প্রাপ্ত তথ্যে রাষ্ট্রপতি এইরূপ বুঝিবার কারণ থাকে যে কোনো বিচারকÑ (খ) গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইতে পারেন, সেই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করিতে ও উহার তদন্ত ফল জ্ঞাপন করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।

বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়। ‘বিচারকদের পদের মেয়াদ’ সংক্রান্ত ষোড়শ সংশোধনী অনুসারে, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ দফায় বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতাসংক্রান্ত বিধানে বলা হয়, ‘প্রমাণিত ও অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।’

৩ দফায় বলা হয়েছে, এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন।

এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্টের ৯ জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। শুনানি শেষে উচ্চ আদালত ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে