ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে মেঘনা ব্যাংকের এমডির পদত্যাগ

  হারুন-অর-রশিদ

২১ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলোয় অনিয়মের ঘটনা পিছু ছাড়ছে না। মেঘনা ব্যাংকে এবার ৪৮ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ধরা পড়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নুরুল আমিন এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল তিনি পদত্যাগ করলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। এ ছাড়া আগেই ৩ কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

এ জালিয়াতির ঘটনায় নুরুল আমিনকে এমডি হিসেবে না রাখার জন্য পরিচালনা পর্ষদের এক পক্ষ অবস্থান নেয়। পর্ষদ সদস্যদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়া নুরুল আমিন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। নুরুল আমিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এইচএন আশিকুর রহমান। আশিকুর রহমান আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও সংসদ সদস্য।

আশিকুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, নুরুল আমিন এমডির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। আমরা সেটি পর্ষদ থেকে অনুমোদন করেছি। সূত্র জানায়, চলতি মাসের ৩০ তারিখ থেকে এ পদত্যাগপত্র কার্যকর হবে। আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তার চাকরির মেয়াদ ছিল। জানুয়ারিতে তার বয়স হবে ৬৫ বছর। আইন মোতাবেক, ৬৫ বছরের বেশি কোনো ব্যক্তি এমডি থাকতে পারবেন না।

সূত্র জানায়, ব্যাংকটির ধানম-ি শাখা থেকে কৃষিতে ব্যবহার্য কেমিক্যাল জাতীয় পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের নামে ঋণ হাতিয়ে নেয় রূপালী করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটির কাছে মেঘনা ব্যাংকের পাওনা ৪৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সূত্র আরও জানায়, দুই প্রকার কেমিক্যাল আমদানি করার অনুমতি ছিল রূপালী করপোরেশনের। কৃষিতে ব্যবহার্য হওয়ায় তার শুল্ক ছিল অনেক কম। কিন্তু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণের আশ্বাস পান রূপালী করপোরেশনের এমডি মো. ইসতাক। প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ বিতরণ করে মেঘনা ব্যাংকের ধানম-ি শাখা। ব্যাংক থেকে টাকা পেয়ে অননুমোদিত অন্তত ৮ প্রকারের কেমিক্যাল আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। মোংলা বন্দর থেকে ওই পণ্য কৃষিতে ব্যবহার্য পণ্য হিসেবে দেখিয়ে কম শুল্কে খালাসের চেষ্টা করেন মো. ইসতাক। কিন্তু মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে ওই পণ্যগুলোর ওপর ৬০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা জানায়। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ আনা হয় রূপালী করপোরেশনের বিরুদ্ধে। পরে পণ্য খালাস করেনি রূপালী করপোরেশন। বর্তমানে ওই পণ্য মোংলা বন্দরে আটকে রয়েছে। ওই পণ্য আমদানিতে অর্থায়ন করে মেঘনা ব্যাংকের টাকাও আটকে গেছে।

ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, নতুন প্রজন্মের মেঘনা ব্যাংকের কাছে ৪৮ কোটি টাকার ঋণ তুলনামূলক অনেক বেশি। ব্যাংকের শীর্ষ ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই ঋণ নিয়েছে রূপালী করপোরেশন। ব্যাংকটির অডিট কমিটি ঋণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে মেঘনা ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ নুরুল আমিনকে দায়ী করেন। পরিচালনা পর্ষদের একটি পক্ষ এই ঋণ জালিয়াতিসহ অন্য কারণে মোহাম্মদ নুরুল আমিনকে পদত্যাগ করতে বলেন। তবে আরেক পক্ষ নুরুল আমিনকে এমডি হিসেবে রাখার পক্ষে। বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হলে গত অক্টোবরে এক মাসের ছুটি নিয়ে বিদেশ চলে যান। তিনি স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে যান বলে একটি পক্ষ জানায়। তবে আরেকটি সূত্র জানায়, তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। তবে গত ১ নভেম্বর তিনি কাজে যোগ দেন। ৫ নভেম্বর তার সঙ্গে কথা বলতে গুলশানে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ছুটির পর কাজে যোগদান করায় তিনি কারো সঙ্গে দেখা করবেন না বলে জানান এমডির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। বিষয়টি সম্পর্কে বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে গতকালসহ একাধিক দিন কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সূত্র জানায়, পণ্য আমদানিতে যাচাই-বাছাই না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঋণ অনুমোদন করেছে। এ ঘটনায় ব্যাংকটির ঋণ বিভাগের প্রধান (সিআরএম) রবিউল হাসান, ধানম-ি শাখার ম্যানেজার মারুফ, অফিসার নাজমুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

গত মাসে রবিউল হাসান এ প্রতিবেদককে বলেন, ঋণ বিতরণ করতে গেলে কোনো ঋণ খেলাপি হতে পারে। বিষয়টি তদন্তাধীন আছে।

রূপালী করপোরেশনের এমডি ইসতাক বলেন, মোংলা বন্দরে কাস্টমস জটিলতায় মাল আটকে গেছে। এ জন্য টাকা দিতে পারছি না। ব্যাংকে বলেছি এটিকে কিস্তি করে দিলে আমি পর্যায়ক্রমে টাকা পরিশোধ করে দেব।

ব্যাংকটির পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ব্যাংকটি তার নিয়মানুসারে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কাউকে বহিষ্কারের বিষয়টি ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।

এদিকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলেছে, কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ ছাড়া ওই গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। এই ঋণের বিপরীতে ধানম-িতে ভবনসহ ৯ কাঠা জমি জামানত রাখা হয়েছে। ওই জমি নিলাম করে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে