‘মৃত্যু মুঠোয় নিয়ে মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করছি’

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০০:২৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে জীবন বাজি রেখে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। কী পেলাম কী পেলাম না, সেই হিসাব মেলাতে আসিনি। কেউ রিকগনাইজ করল কি করল না, সেই হিসাব নেই। একটাই হিসাব, দেশের মানুষ, তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটুকু কাজ করতে পারলাম, সেটাই বড়। অনেক সময় এমনও দিন যায়, রাতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারি না। গতকাল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম সম্প্রতি পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স নামের একটি আন্তর্জাজিত সংস্থার গবেষণা রিপোর্ট সংসদে তুলে ধরে বলেন, ওই রিপোর্টে সৎ সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাবিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থান এবং কর্মঠ সরকারপ্রধান হিসেবে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চান।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে তাদের এবং আমার দেশের জনসংখ্যা কত? এটি যদি তারা তুলনা করতেন, তাহলে হয়ত অন্য ফল আসত। দ্বিতীয় কথা, এই ছোট্ট ভূখ- ৫৪ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে ১৬ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করে। তার ওপর আবার জরিপে ১, ২, ৩, ৪ নম্বরে যারা আছেন তাদের কিন্তু জীবনে বাবা-মা, ভাই-বোন, আপনজন হারাতে বা অত্যাচারিত হতে হয়নি। তাদের জেলের ভাত খেতে এবং মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হতে হয়নি। আমাদের দেশের পরিবেশটা একটু আলাদা। যত ভালো কাজই করি না কেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, মিথ্যা প্রবাদ দেওয়ার চেষ্টা, জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করা; এমনকি বার বার মৃত্যুর মুখোমুখিও হতে হয়। এখানে একজনও কিন্তু গ্রেনেড হামলার শিকার হননি। বার বার আমার জীবনের ওপর যে আঘাত এসেছেÑ এরকম যদি একবারও হতো, তাহলে অনেকেই ঘরে বসে যেতেন; কিন্তু আমি মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে জীবন বাজি রেখে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। অর্থ-সম্পদ কী আছে না আছেÑ এসব নিয়ে আমি কখনো চিন্তাও করি না। এ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তাও নেই। আল্লাহ জীবন দিয়েছেন, জীবন চলে যাবে।

তিনি বলেন, আমাকে বাবা-মা, ভাই-বোন হারিয়ে বিদেশে রিফুইজি হয়ে থাকতে হয়েছে। যাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তাদের এ অভিজ্ঞতা নেই। জরিপকারীরা যদি এই বিষয়গুলো বিবেচনা করতেন, হয়ত রেজাল্ট অন্যরকম হতে পারত। এটাও ঠিক, আমাদের যে প্রতিকূল অবস্থা, এই অবস্থায় তাদের চলতে হয়নি। আমাদের দেশে কখনো ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যহত ছিল না। সংগ্রাম, আন্দোলন করে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। সেই গণতন্ত্রচর্চার মধ্য দিয়েই কিন্তু আজকে দেশের উন্নতি। ১৬ কোটি মানুষ নিয়ে মাত্র ৫৪ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে যদি অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের দেশ চালাতে হতো, তাদের অবস্থা যে কী হতো, সেটি আপনারা চিন্তা করতে পারেন।

নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮, ১৪ বা ১২ ঘণ্টার হিসাব নেই। অনেক সময় এমনও দিন যায়, রাতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারি না। যখনই কাজ আসে সেটি করে যাই। মনের টানে কাজ করি। আমার বাবা দেশটি স্বাধীন করে গেছেন। তার একটি স্বপ্ন ছিলÑ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন। সে জন্য তিনি স্বাধীন দেশের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন; সম্পন্ন করতে পারেননি। ঘাতকের নির্মম বুলেটে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। আমার একটাই চ্যালেঞ্জ, যে কাজটি বাবা করে যেতে পারেননি, সেটি আমি সম্পন্ন করতে চাই। দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তবু বলব, যারা হিসাব করেছেন তাদের মতো করেছেন, এজন্য ধন্যবাদ।

সরকারের দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে দেশে মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ চলে, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব থাকে; সেই দেশে দুর্নীতিটা শেকড় গেঁড়ে যায়। সেই শেকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হয়। ’৭৫-এর পর থেকে ২১টি বছর এই অবস্থাই বিরাজমান ছিল। এরপর আবার ২০০১-০৮ পর্যন্ত এই অবস্থা। ওই রকম একটা অবস্থায় আমার লিগেসিটা কী, আমি উত্তরাধিকার সূত্রে কী পেলাম? পেয়েছি মিলিটারি ডিক্টেটর, মিলিটারি রুলস, অনিয়ম-অবিচার-অত্যাচার। তবে হ্যাঁ, নিজে সততার সঙ্গে দেশ চালাতে চেষ্টা করছি। যেহেতু মাথায় পচন নেই, শরীরের কোথাও যদি একটু ঘা থাকে, সেরে ফেলতে পারব। ওই রকম যদি দুর্নীতি হতো তাহলে দেশের জিডিপি ৭.২৮ ভাগে উন্নীত হতো না। মাথাপিছু আয়ও ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হতো না। এত রাস্তাঘাট, এত বড় বড় জিনিস আমরা তৈরি করেছি। এত অল্প সময়ের মধ্যে সেটি করতে পারতাম না। এই দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে সততাই শক্তি, সততাই জোর; সেটি প্রমাণ করেছি। ধন-সম্পদ চিরদিন থাকে না। মানুষকে মরতে হয়, সব রেখে চলে যেতে হয়। তবু মানুষ অবুঝ। সম্পদের লোভে অস্থির হয়ে পড়ে। এটি মানুষের একটা প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তিটা যদি কেউ নিয়ন্ত্রণে রাখে, তবে সে-ই পারে দেশকে-জনগণকে কিছু দিতে। আমরা দিতে এসেছি। রক্ত দিয়েছি, বাবা-মা, ভাই-বোন সব দিয়েছি। নিজের জীবনটাও বাজি রেখেছি শুধু একটাই কারণেÑ বাংলাদেশ যেন স্বাধীন দেশ হিসেবে উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়। বিশ্ব দরবারে যেন মর্যাদার সঙ্গে চলে। রিপোর্টটি যাই দিক, আমার থেকে বাংলাদেশের মর্যাদাটা তো উন্নত হয়েছে; এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া।

মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাকা-ের অন্যতম

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর পরিচালিত হত্যাযজ্ঞসহ সব কর্মকা- পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাকা-ের অন্যতম। মিয়ানমারে পরিচালিত হত্যাযজ্ঞের পরিপ্রেক্ষিতে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় প্রদানের উদ্যোগ সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। তবে এ সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় তাদেরকেই এর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদে ও সসম্মানে স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

প্রধানমন্ত্রী জানান, অসহনীয় নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠন ও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য কূটনৈতিক কার্যক্রম চলছে। কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি আজ সবার দাবি। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকেও সব রাষ্ট্র আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়ে বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণে মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে। সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরকালে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় পক্ষপাতহীন সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুপক্ষেই প্রত্যাবাসন চুক্তি দ্রুত সম্পাদন এবং নভেম্বরের মধ্যে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনে সম্মত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছি। রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ খসড়া হস্তান্তর করেছে। এটি নিয়ে দুদেশই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে