তোমাদের নাম লেখা রবে

  শান্তা মারিয়া

১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভাটিবাংলার বিশাল হাওরবেষ্টিত এলাকা সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জের প্রায় প্রতিটি থানা যার নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছিল, তিনি হলেন জগৎজ্যোতি দাস। তার ডাকনাম ছিল শ্যামা। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন একুশ বছর বয়সী কলেজছাত্র। ২৫ থেকে ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘দাস কোম্পানি’।

জগৎজ্যোতির সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টার ছিল তাহিরপুরের বড়ছড়া। সেখান থেকে দেশি নৌকা নিয়ে তিনি জামালগঞ্জ, দিরাই, খালিয়াজুরি, মদন, মার্কুলি, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, বাহুবল হয়ে আশুগঞ্জ পর্যন্ত এলাকা মুক্ত করে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারের দলকে নাস্তানাবুদ করে দেন। মার্কুলির কাছে পাক আর্মির জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বও তার।

দাস কোম্পানির ভয়ে ভৈরব থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত নৌচলাচল বন্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তানিরা এবং এয়ার সাপোর্টসহ বিশেষ কমান্ডো টিম পাঠানো হয় তাকে হত্যার জন্য। মাত্র ১৩ জন সহযোদ্ধা নিয়ে তিনি বানিয়াচংয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৫০ জন সেনা ও রাজাকারদের প্রতিরোধ করেন। যুদ্ধে প্রাণ হারায় পাকিস্তানি বাহিনীর ৩৫ জন। পাহাড়পুরে অসংখ্য মানুষের প্রাণ রক্ষা পায় তার বীরত্বে। ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে সহযোদ্ধাদের নিরাপদে পার করার জন্য একটি এলএমজি নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হন এই অসীম সাহসী তরুণ। ওই যুদ্ধে তিনি আহত হন। পরে তাকে ধরে বাজারের মধ্যে একটি খুঁটিতে বেঁধে চরম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে জল্লাদরা। স্বাধীনতার পর শহীদ জগৎজ্যোতি দাসকে বীরবিক্রম উপাধি দেওয়া হয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এমন শত শত মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের ইতিহাস রয়েছে। এমন দুজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল্লাহ হিল বাকী এবং তার সহযোদ্ধা শহীদ বাবুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলেন আবদুল্লাহ হিল বাকী। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে ৮ মার্চ গভর্নর হাউসে বোমা বিস্ফোরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৮ এপ্রিল বাড়ি ছাড়েন। প্রশিক্ষণ নিয়ে মে-জুন মাস থেকে বৃহত্তর ঢাকায় গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তিনি ছিলেন ইউনিট কমান্ডার। ঢাকা শহর ও বৃহত্তর ঢাকার বিভিন্ন জেলায় অনেক সফল অপারেশনের কৃতিত্ব এই বীরের। ৪ ডিসেম্বর রাতে কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে তিনি খিলগাঁওয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। মায়ের সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। শহীদ বাকী ও তার সহযোদ্ধারা পাল্টাআক্রমণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। পরে বাকী ও তার সহযোদ্ধা বাবুলকে বীভৎস নির্যাতনের পর রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য আবদুল্লাহ হিল বাকীকে বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হয়।

পিরোজপুরের কদমতলা গ্রামের এক সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন ভাগীরথী সাহা। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন গেরিলা যোদ্ধা। শত্রু শিবিরের জরুরি খবর মুক্তিযোদ্ধাদের পৌঁছে দিতেন। তার দেওয়া খবরের ভিত্তিতে ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয়লাভ করে। ভাগীরথী নিজেও রণাঙ্গনে ছিলেন। এক সময় তার পরিচয় ফাঁস হয়ে যায় রাজাকারদের কাছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্মম নির্যাতনের পর ভাগীরথীকে জিপ গাড়ির পিছনে বেঁধে পিরোজপুরের রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যায়। এরপর তার ক্ষত-বিক্ষত শরীরে গুলি চালিয়ে বলেশ্বর নদে লাশ ফেলে দেয়। শহীদ ভাগীরথী কোনো খেতাব পাননি।

এমন আরও অসংখ্য বীর শহীদ পাননি কোনো খেতাব বা স্বীকৃতি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে এই শহীদদের কথা পৌঁছে দেওয়া দরকার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। শহীদের ইতিহাস আমাদের পরম গৌরবের। ইতিহাস যদি সংরক্ষিত না হয়, তা হলে তা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। বাংলার এই বীর শহীদদের পবিত্র রক্ত মিশে আছে মাতৃভূমিতে, পতাকার লাল বৃত্তে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে