সমালোচনায় শৃঙ্খলাবিধির গেজেট

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য জারি করা পৃথক শৃঙ্খলাবিধির গেজেট সমালোচনার মুখে পড়েছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই গেজেট করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন আইনমন্ত্রীসহ সরকার সমর্থকরা। তাদের মতে, এই গেজেটের মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা আরও বেড়েছে। তবে মাসদার হোসেন মামলার (বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার) প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামসহ অনেক আইনজীবী বলছেন, এই গেজেটের মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। এটি মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদের আলোকে এ গেজেট জারি করে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করা হয়েছে।
গেজেট জারি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও
সুপ্রিমকোর্টের মধ্যে দীর্ঘ টানাপড়েনের পর গত সোমবার সন্ধ্যায় এ গেজেট প্রকাশ করা হয়। সুপ্রিমকোর্টের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে এ গেজেট জারি করলেও বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ মূলত ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের’ (রাষ্ট্রপতি বা আইন মন্ত্রণালয়ের) হাতেই রেখে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে এসব ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের কর্তৃত্ব রেখে খসড়া শৃঙ্খলাবিধি তৈরি করে সেটির আলোকে গেজেট জারি করতে বলেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত
সুপ্রিমকোর্টের খসড়ার অনেক কিছুই গ্রহণ করা হলেও মূল বিষয়ের (অভিযোগের অনুসন্ধান, তদন্ত) নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের হাতে। এ নিয়ে ইতিমধ্যেই সমালোচনা করেছেন বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির নেতারা। আজ বুধবার এ বিষয়ে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করে ফেলা হয়েছে : ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম
মাসদার হোসেন মামলার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ রুলস করার কথা। কিন্তু তা না করে ১৩৩ অনুচ্ছেদের রেফারেন্স উল্লেখ করে রুলস করা হয়েছে। এ গেজেটের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে বাংলাদেশের নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করে ফেলা হয়েছে। তারা (সরকার) ১৩৩ অনুচ্ছেদের অধীনে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে নিয়ে গেছেন এবং তাদের কর্মস্থল, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুর, শৃঙ্খলাবিধান শর্তাবলি প্রণয়ন করেছেন। এতে আমি লক্ষ করছি যে, ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এখানে কোনো কাজ সম্পাদন করেছেন বলে লেখা নেই। অর্থাৎ সংবিধান যে ক্ষমতাটা রাষ্ট্রপতির ওপর অর্পণ করেছেন, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সেই রুলস তৈরি করবেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় ১৩৩ অনুচ্ছেদের বয়ান দিয়ে রেফারেন্স দিচ্ছেন। অর্থাৎ গোড়াতেই গলদ রয়ে গেছে। বিষয়টা নিশ্চয় আদালতের নোটিশে আসবে। আমি মনে করি এটা সংশোধন করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আইন মন্ত্রণালয় পালন করতে পারে না।
প্রবীণ এ ব্যারিস্টার আরও বলেন, আমরা যখন সংবিধান তৈরি করেছিলাম, তখন বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছিলাম এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে। এ জন্য অধস্তন আদালতের ওপরে ১১৪, ১১৫, ১১৬ পরিচ্ছেদ আমরা দিয়েছিলাম। অর্ধাৎ অধস্তন আদালত কিন্তু আমাদের সংবিধানের একটি প্রতিষ্ঠান। এখন তাদের যদি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিধিবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় সেটি হবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং এটি মাসদার হোসেন মামলার পরিপন্থী।
শৃঙ্খলাবিধি নিয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পরামর্শ করার কথা। এখানে কোনো মন্ত্রণালয় আসার সুযোগ নেই। আইনমন্ত্রীর ভূমিকা দিয়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রিপ্লেস করা যায় না। এটা করায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বৈশিষ্ট্য, পৃথকীকরণ খর্ব করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি ইতোমধ্যেই দু-তিন দিন কোর্টকে বলেছি। ভেতরে ভেতরে কী আলোচনা হচ্ছেÑ কেউই জানতে পারছি না। আমি উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। এখানে রাষ্ট্রপতি অনুপস্থিত, প্রধান বিচারপতিও অনুপস্থিত।
সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বলতে বোঝায় যে, সুপ্রিমকোর্ট বারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। কোর্টে সেটি আলোচনায় আসা দরকার ছিল এবং সুপ্রিমকোর্টের সব বিচারপতি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বা তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান বিচারপতি তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজনীয়তা ছিল। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় এখানে মূল ভূমিকা পালন করেছে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করার বিষয়টা উপস্থিত থাকেনি। অর্থাৎ বিষয়টা যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে তা সাংধিানিকভাবে বৈধ প্রক্রিয়ায় নয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে : ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, এই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। এতে কোনো লাভ হলো না। বিচার বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকতে হবে।
সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা একটু বেড়েছে : আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশের কারণে সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা কমেনি বরং আরও একটু বেড়েছে। কেননা এতে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের (রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রণালয়) প্রস্তাব ও সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শে ভিন্নতা দেখা দিলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ প্রাধান্য পাবে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
সমালোচকদের সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী বলেন, তারা বুঝুক আর না বুঝুক, সমালোচনার জন্য তাদের সমালোচনা করতে হবে। তাদের যে ওয়াইডার পরিকল্পনা ছিল, তা অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এখন খড়কুটো ধরে তারা সমালোচনা করছেন।
সমালোচনা গঠনমূলক হলে তা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কনস্ট্রাকটিভ ক্রিটিসিজম করার জন্য উনাদের পড়াশোনা করতে হবে। সেই জন্য আমি উনাদের বলব, আপনারা সংবিধান দেখেন।
তিনি বলেন, আরেকটা কথা পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, উনাদের ইচ্ছা মতো, উনারা যে রকম ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কনস্টিটিউশন নিয়ে ফুটবল খেলেছেন, আমরা এই সেক্রেড কনস্টিটিউশনকে নিয়ে আর ফুটবল খেলতে দেব না। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি করা হয়েছে। বিচার বিভাগ ও বেসামরিক প্রশাসনের আচরণবিধির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হলে সেটি কারও কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
ভারসাম্য রক্ষা হয়েছে : ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, বিলম্বে হলেও এটা প্রকাশিত হয়েছে। বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। আমার মনে হয় বিধি প্রকাশের পর ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই।
তিনি বলেন, আমি দেখছি আমাদের সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সঙ্গে দফায় দফায় বসে এ বিধিটা অনুমোদন করা হয়েছে। কেউ বলতে পারবে না যে, উনাদের সঙ্গে বসে যেটা স্থির হয়েছিল তা বদলে দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি গেজেটে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। এ গেজেটের মাধ্যমে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। উভয় বিভাগের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন বা বিধি তো বাইবেল না যে, পরিবর্তন করা যাবে না। যদি কখনো মনে হয় অসুবিধা আছে, তা হলে সংশোধন করা যেতে পারে। যদি এমন বিধান থাকে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তবে সেটা সংশোধন করা যেতে পারে। আইনও তো বাতিল হচ্ছে। আর এটা তো বিধি।
মূল স্পিরিটকে খর্ব করা হয়েছে : সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন, শৃঙ্খলাবিধির গেজেটের মাধ্যমে মাসদার হোসেন মামলার মূল স্পিরিটকে (মর্ম) খর্ব করা হয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি সংক্রান্ত এই গেজেটের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কফিনের ওপর শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছে। আমরা এ গেজেট বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।
সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পরামর্শের প্রতিফলন ঘটেছে : অ্যাটর্নি জেনারেল
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পরামর্শের বিষয়টি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে। সেটারই প্রতিফলন এই বিধিমালায় ঘটেছে। রাষ্ট্রপতি যে কোনো পদক্ষেপ নিলে তা      সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে হবে। এটা স্পষ্টভাবে বলা আছে, যখন কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হবে, কারো বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, অভিযোগ অনুসন্ধান করা দরকার বা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দরকারÑ সেখানেও রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। সাময়িক বরখাস্ত করা হবে তখনো রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এখন আর নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলার ব্যাপারে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে আর কোনো বাধা রইল না। এ বিধি করতে বার বার সময় নিতে হয়েছে, যেটা আমার জন্য বিব্রতকর ছিল। গেজেট জারির মধ্য দিয়ে এর অবসান হয়েছে।
আগের খসড়া এবং এখনকার গেজেটের মধ্যে মূল তফাতটা কী ছিল জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মূল তফাতটা ছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি যেটা চেয়েছিলেন (আমি যতদূর বুঝতে পেরেছি) সেটি হলো, সব ক্ষমতাটা সুপ্রিমকোর্টের হাতেই থাকবে। সেটি তো সংবিধানবিরোধী একটা অবস্থান। সংবিধানে আছে রাষ্ট্রপতি করবেন কিন্তু      সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে করবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে