ডাচ-বাংলার রকেট

ছোট ব্যাংকিংয়ে বড় ডাকাতি

  হারুন-অর-রশিদ

২৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোট ব্যাংকিংয়ে বড় ডাকাতি হচ্ছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের রকেটে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা রকেটের অ্যাকাউন্ট থেকে পুরো টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অর্থ চুরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে রকেটের অফিসিয়াল নম্বর ১৬২১৬। মোবাইল ব্যাংকিংসেবায় লেনদেনে নির্ধারিত মাত্রা থাকলেও প্রতারণার ক্ষেত্রে অনেক বেশি লেনদেন হচ্ছে। গ্রাহকদের গোপন তথ্যও রয়েছে এই ডিজিটাল ডাকাতদের হাতে। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এভাবে অর্থ চুরি সম্ভব নয় বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। বেশ কয়েক গ্রাহকের অভিযোগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

রাকেশ সিনহা নামের এক গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে একদিনে ২৯ হাজার ৫০০ টাকা এটিএম বুথের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়েছে। নাদির আক্তার নামে আরেক গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ২২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া পল্লব মিত্র নামের আরেক গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১৪ হাজার ৫০০ টাকা তুলে নিয়েছে প্রতারক।

রেকছানা খাতুন নামে এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, তার অ্যাকাউন্টে থাকা ৫৬ হাজার ৯৩ টাকার মধ্যে একদিনে ৩ বারে ৩৫ হাজার ৪৯৯ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রতারকরা। অভিযোগ করেও অর্থ ফেরত পাননি তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুসারে, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে একদিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার বেশি উত্তোলনের সুযোগ নেই। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অপরাধ ঠেকাতে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি সার্কুলার জারি করে এ নিষেধাজ্ঞা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয়ভাবে রকেট মোবাইল ব্যাংকিং বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলেছে।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন বিভাগের (রকেট ও এজেন্ট ব্যাংকিং) প্রধান সাইফুল আলম মোহাম্মদ কবীর বলেন, গ্রাহকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। কৌশলে তাদের প্রতারিত করছে একটি চক্র। গ্রাহকদের সচেতন থাকতে হবে। কোনোভাবেই কাউকে নিজের গোপন পিনকোড দেওয়া যাবে না। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত সব তথ্যই গোপন থাকে। এটি বাইরে প্রকাশ করা হয় না। আমাদের সিস্টেমও শক্তিশালী।

ঝিনাইদহের বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এইড ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা তরিকুল ইসলাম পলাশ অভিযোগে বলেন, তার ছেলের অ্যাকাউন্ট থেকে সর্বমোট ৩৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার আগে রকেটের ১৬২১৬ নম্বর থেকেই তার নম্বরে কল আসে। কল করে তার অ্যাকাউন্টের পরপর ৩টি লেনদেনের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এরপর এটি অফিসিয়াল নম্বর নিশ্চিত হয়। তাদের চাহিদামতো তথ্য সরবরাহ করার পর হঠাৎ মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়। সেটি খোলার পর দেখা যায় অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে; কিন্তু তার কোনো এসএমএস আসেনি। অভিযোগ করেও কোনো ফল হয়নি। উল্টো গ্রাহককে দোষারোপ করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া গ্রাহকের গোপন তথ্য হ্যাকাররা কীভাবে জানল? কীভাবে অ্যাকাউন্টটি সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত হয়ে গেল? এতে প্রমাণ হয়, রকেটের কর্মকর্তারাই গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরি করে নিচ্ছেন।

গ্রাহকদের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে রকেটের অফিসিয়াল নম্বর ১৬২১৬ ব্যবহার করা হয়েছে। এই নম্বর থেকে কল করে ও এসএমএস পাঠিয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকের অ্যাকাউন্টের স্থিতির পরিমাণ জেনেই ক্যাশইন করার এসএমএস পাঠানো হয়। গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে কী পরিমাণ অর্থ থাকে সেটি রকেটের কর্মকর্তারা ছাড়া বাইরের কেউ জানতে পারে না।

এদিকে চলতি বছরের মার্চে গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ। পরিদর্শনের তথ্য মতে, ব্যাংকিং সিস্টেম এবং মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেমের সংযুক্ত রকেট অ্যাকাউন্টের দৈনিক সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা লেনদেনের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু একটি অ্যাকাউন্টে ৪ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে (পি২পি) দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেনের সুযোগ রাখা হয়েছে; কিন্তু প্রতারণার ক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছে। রকেটের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ ও নিষ্পত্তির তথ্য জানতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক; কিন্তু এ বিষয়ে কোনো লিখিত ডকুমেন্টস দেখাতে পারেনি রকেট কর্তৃপক্ষ। তবে গত বছর তারা ৩৮ গ্রাহকের অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানানো হয়। এর মধ্যে কিছু অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রকেট।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রকেটের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযোগগুলোর মধ্যে অধিকাংশের ক্ষেত্রে প্রতারকরা ব্যাংকটির +১৬২১৬ নম্বরের অনুরূপ নম্বর থেকে গ্রাহককে বিভ্রান্ত করে প্রতারিত করেছে। প্রতারিত হয়ে গ্রাহকরা ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। সুতরাং এ বিষয়ে ব্যাংকের কিছু করার নেই। নিজের গোপন পিনকোড ব্যবহার করে লেনদেন হওয়ায় তাদের কিছু করণীয় নেই বলে গ্রাহককে জানিয়ে দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ১৮টি মোবাইল ব্যাংকিংসেবা রয়েছে। সর্বমোট নিবন্ধিত ৫ কোটি ৭৭ লাখ গ্রাহকের মধ্যে সচল অ্যাকাউন্ট ৩ কোটি। এর মধ্যে গ্রাহক ও লেনদেনের দিক থেকে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের রকেট। রকেট সূত্র জানায়, নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা দেড় কোটি। এর মধ্যে সচল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৬০ শতাংশ বা ৯০ লাখের মতো।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে