রাজাকারকন্যা রিজওয়ানার মুখোশের আড়ালে

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৫:২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

তার চলাফেরা সমাজের ‘ওপরতলার’ মানুষের সঙ্গে। কথা-বার্তায় সুশীল ভাব। এতকিছুর মাঝে অবশ্য তিনি কিছু আড়াল করতে চান। তার পিতৃপরিচয়! আর সেই তিনি হচ্ছেন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ মহিবুল হাসানের কন্যা রিজওয়ানা হাসান। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন হবিগঞ্জে তার বাবার হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের ইতিহাস আড়াল করেই সারাদেশে পরিবেশবাদী হিসেবে পরিচিত। রিজওয়ানা হাসান বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী।

হরহামেশাই টক শোতে দেখা যায় রিজওয়ানা হাসানকে। ন্যায়-নীতি ও সাম্যের কথা বলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এসব অনুষ্ঠানের কোথাও কি তিনি তার পিতৃপরিচয় দিয়েছেন- এমনটি শোনা যায়নি। এত বড় রাজাকারকন্যা রিজওয়ানার সেই পরিচয়টা আড়ালেই ছিল। তবে তা প্রকাশ হয়ে পড়ে ২০১৪ সালে।

‘এক নজরে স্থাপনাসহ মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ জেলা’ বইয়ের ৬২ পৃষ্ঠায় ওই জেলার স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তির তালিকা দেওয়া হয়েছে, তার ৬ নম্বরে রয়েছে সৈয়দ মহিবুল হাসানের নাম। জানা গেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন হবিগঞ্জের শান্তি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন মহিবুল হাসান। তাছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাও ছিলেন। শোনা যায় কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মোনায়েম খানের অন্যতম সহযোগী মহিবুল হাসানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মামলাও হয়েছিল।

দেশ স্বাধীনের পর কুখ্যাত রাজাকার সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মুহিবুল হাসান আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপনে থেকে চালিয়ে যান দেশবিরোধী নানা কর্মকা-। তার কন্যা রিজওয়ানা হাসানও বাবার পথ অনুসরণ করে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’র এজেন্ট হয়ে দেশের উন্নয়নবিরোধী হেন কাজ নেই, যা তনি করেননি। অভিযোগ রয়েছে, রিজওয়ানা পরিবেশবাদী আইনজীবী হলেও যুদ্ধাপরাধের মামলায় গ্রেপ্তারদের আইনি সহযোগিতা করতে নেপথ্যে থেকে তাদের উপদেষ্টা আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন। রাজাকার পরিবারগুলোর সঙ্গে রাখেন বিশেষ সখ্য। এলাকায় মাঝেমধ্যে গোপনে যাওয়া-আসা করেন।

সম্প্রতি সরেজমিন ওই এলাকা ঘুরে জানা যায়, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের নরপতি গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার মুহিবুলের নির্যাতনের কথা এখনো ভোলেননি ওই এলাকার মানুষ। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল সামাদের ভাষায় ফুটে ওঠে রাজাকার মহিবুলের লোমহর্ষক নির্যাতন ও বর্বরতা।

আমাদের সময়কে তিনি বলেন, হবিগঞ্জে সৈয়দ মহিবুল হাসান স্বাধীনতাবিরোধীর অন্যতম। হবিগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড থেকে প্রকাশিত পুস্তিকায় স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি যুদ্ধাপরাধী মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাবেকমন্ত্রী সৈয়দ মো. কায়সারের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তাদের উভয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় চুনারুঘাট এবং মাধবপুর এলাকায় আলবদর-রাজাকার বাহিনী বিভিন্ন হত্যা, লুটতরাজ চালায়। তাদের একজন সৈয়দ কায়সারের শাস্তি হলেও সৈয়দ মহিবুল হাসান মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ব্যাপারে কথা বলতে রিজওয়ানা হাসানের মোবাইল ফোনে গতকাল সন্ধ্যার পর বারবার কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া গেছে।

একাত্তরে নিজ এলাকার ত্রাস ‘পরিবেশ দূষণকারী’ মহিবুল হাসান পাক হানাদার বাহিনীর দোসর হওয়ায় স্বাধীনতার পর আত্মগোপনে চলে যান। যুদ্ধাপরাধের মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে প্রকাশ্যে বের হয়ে আসেন। সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিএনপির এমপি-মন্ত্রী হন। ১৯৮৬ সালে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে আবার ’৯০-এর পতনে আত্মগোপনে চলে যান। তার ভাতিজা সৈয়দ লিয়াকত হাসান এখন চুনারুঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি। গত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন, পরাজিতও হন। হবিগঞ্জ জেলার ডেপুটি কমান্ডার গৌর প্রসাদ রায় রাজাকার সৈয়দ কায়সারের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের সাক্ষী ছিলেন। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, কায়সার শান্তি কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। আর মহিবুল ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক। দুই রাজাকার একসঙ্গে চলতেন।

রাজাকার মহিবুল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট-বাহুবল আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী লতিফুর রহমান চৌধুরীর (কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী) বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুনারুঘাট-মাধবপুর আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরে জিয়াউর রহমান তাকে শ্রম ও জনশক্তি প্রতিমন্ত্রী করেন। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর ’৭১-এ পরাজিত শক্তির কোনো কোনো নেতাকে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে হবিগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মোমবাতি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে জামানত হারান। সৈয়দ মহিবুল হাসান তার অনুগত চুনারুঘাট শান্তি কমিটির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন ও তৎকালীন ইসলামি ছাত্রসংঘের নেতা আরজু মাস্টারকে প্রতিষ্ঠিত করে যান।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, মহিবুল হাসান ও সৈয়দ কায়সারের নির্দেশে পাকবাহিনী এলাকার শহীদ আবদুল কুদ্দুস খান ওরফে অনু মিয়াকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেন। নরপতি গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, মহিবুল হাসানের রক্তই তো রিজওয়ানা হাসানের শরীরে। তিনি (রিজওয়ানা) দেশবিরোধী কাজ করবেন- এটিই স্বাভাবিক। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান এমপি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছোট ছিলাম। তবে শুনেছি মুহিবুল রাজাকার ছিলেন। আরেক রাজাকার সৈয়দ কায়সার ও মহিবুল একসঙ্গে চলাফেরা করতেন।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে