শেয়ারবাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর বহুমুখী উদ্যোগ

  আবু আলী

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ারবাজার বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা, বিদেশি যেসব কোম্পানি দেশে ভালো ব্যবসা করছে তাদের মূলধনের একটি অংশ বাজারে ছাড়া, শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো, তাদের মূলধনের জোগান বাড়াতে তহবিলের উৎস বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ধারণের সমক্ষতা আরও বাড়াতে চায় সরকার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এর বিরোধিতা করেছে।

এ ছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রাতিষ্ঠানিক নানামুখী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) পুনর্গঠন করেছে। একই সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা আলাদা করা হয়েছে। পুনর্গঠিত বিএসইসি বাজারে মৌলিক পরিবর্তন আনতে কাজ করেছে।

কমিশনের সার্বিক কর্মকা- নিয়ে চেয়ার‌্যমান প্রফেসর ড. এম খায়রুল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে শেয়ারবাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার। আর বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমরা সার্ভিলেন্স জোরদার করেছি। আইন যুগোপযোগী করেছি। যেসব ক্ষেত্রে আইন ছিল না, সে বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উপযুক্ত জায়গা তৈরিতে কাজ করছি। এখন বাজার বড় হচ্ছে। বাড়ছে তারল্যের প্রবাহও। আমরা নিয়মের মধ্যে রেখে একে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই।

সূত্র জানায়, পুঁজিবাজারে যেসব আইনি দুর্বলতা ছিল, তা সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হয়েছে। যেসব আইন ছিল না তা নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাজারের সার্ভিলেন্স এবং মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। শেয়ারবাজার যেহেতু অর্থবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাই কোনো এক পক্ষের সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রভাব পড়ে বাজারে। এ কারণে বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে কমিশন। এজন্য আর্থিক ও শেয়ারবাজারের সার্বিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তথ্য আদান-প্রদান, সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পরামর্শের জন্য চার নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেদের মধ্যে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং অন কো-অর্ডিনেটেড সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড সুপারভিশন’ নামে এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করছে। স্বাক্ষরকারী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলোÑ অর্থবাজারের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক, শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি), বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এমআরএ)।

এ ছাড়া বাজারে যাতে কোনো ধরনের জাল-জালিয়াতির ঘটনা না ঘটতে পারে সে জন্য সার্ভিলেন্স ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে নিজস্ব সফটঅ্যয়ার চালু করেছে বিএসইসি। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে কোনো ধরনের কারসাজির ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক সংকেত দেবে এই সার্ভিলেন্স সফটঅয়্যার। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির হিসাবে স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট পাস হয়েছে। শিগগির ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কমিশন গঠন করা হবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আশা করছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন করা হবে। এটি হলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর হিসেবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, আইন-কানুন সংস্কারে ব্রোকার, ডিলার ও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সুবিধা হয়েছে। এতে বাজারে জবাবহিদিতা বাড়বে। এ ছাড়া ডিমিউচুয়ালাইজেশনের ফল পেতে সময় লাগবে। তবে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠিত হলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। তখন স্বচ্ছতা আরও বাড়বে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলোর শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে কিছু বিধিবিধান রয়েছে। এই বিধিবিধান পরিবর্তন করে তাদের শেয়ার ধারণ করার সক্ষমতা আরও বাড়াতে চায় সরকার। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এতে আপত্তি করেছে। তারা বলেছে, ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে আরও বেশি মাত্রায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে বাজার ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের ওপর বর্তায়। ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে অধিকহারে অংশগ্রহণ করলে তার প্রভাব পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীসহ ব্যাংক খাতের আমানতকারীদের ওপর পড়বে, যা সমগ্র আর্থিক খাতে আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। তাই পুঁজিবাজারে ব্যাংকের সামগ্রিক বিনিয়োগ সীমিত থাকা দরকার।

২০১০ সালের আগে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের কোনো ধরনের নীতিমালা ছিল না। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক কারসাজি করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাপক ভুয়া প্লেসমেন্টের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তা বন্ধে ইতোমধ্যে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নীতিমালা করা হয়েছে। মার্জিন ঋণেরও নীতিমালা করা হয়েছে। শেয়ারের লট নিয়ে এক ধরনের কারসাজির ঘটনা ঘটেছে পুঁজিবাজারে। তা বন্ধে সব কোম্পানির অভিহিত মূল্য ১০ টাকা করা হয়েছে এবং লট প্রথা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন থেকে ১টি শেয়ার লেনদেন করা যাচ্ছে। পুঁজিবাজারে বিভিন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিয়েও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। এজন্য নবগঠিত বিএসইসি লিস্টিং আইনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। স্টক এক্সচেঞ্জকে আইপিও মূল্যায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংকের পরিবর্তে ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে আইপিও আবেদন জমার বিধান চালু হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের বিড়ম্বনা অনেকাংশ কমেছে।

বাজারে সবচেয়ে বড় সংস্কার ছিল স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা আলাদা করতে ডিমিউচুয়ালাইজেশন। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সেখানে ১৩ জনের বোর্ডে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ ৭ জন সদস্য স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্য থেকে মনোনয়নের বিধান কার্যকর হয়েছে। মালিক পরিচালকদের মাত্র ৪০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে রয়েছে। শেয়ারবাজারে আরেকটি আলোচিত বিষয় ট্রাইব্যুনাল গঠন। রাজধানীর হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনে ট্রাইব্যুনাল তার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

পুঁজিবাজারে কোম্পানির শেয়ারের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বুকবিল্ডিং পদ্ধতির সংস্কার করে তা চালু হয়েছে।

ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, গত ৬ বছরে পুঁজিবাজারে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যার ফল ইতোমধ্যে বাজার পেতে শুরু করেছে। নানা ধরনের সংস্কারের ফলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরেছে। ফলে বাজার আবারও গতিশীল হচ্ছে।

এ ছাড়া রাইট শেয়ার ইস্যু নিয়ে কারসাজি বন্ধে রাইট শেয়ার ইস্যুর আইন সংশোধন করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার এবং ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার সংরক্ষণের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। আগে শেয়ােেরর দাম বাড়লে উদ্যোক্তারা সব শেয়ার ছেড়ে বাড়তি মুনাফা তুলে নিতেন। শেয়ারের দর পড়ে গেলে তারা নিজের পরিচালক পদ বজায় রাখার জন্য আবার শেয়ার কিনতেন।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে করপোরেট ফাইন্যান্স বিভাগ চালু করা হয়েছে। গুজব বন্ধে কমিশন বিনিয়োগ উপদেষ্টা বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া কমিশন করপোরেট গাইড লাইন্স যুগোপযোগী করেছে।

শেয়ারবাজার ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোম্পানির আইপিওতে ২০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ৯০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে সরকার। পুঁজিবাজারে আধুনিক ট্রেডিং সিস্টেমস চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জের অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে আধুনিক করতে স্টক এক্সচেঞ্জে ইন্টারনেট ও মোবাইলভিত্তিক অ্যাপস চালু করেছে। শেয়ার কারসাজি বন্ধে সিডিবিএল মেসেস সিস্টেম চালু করেছে। ফলে শেয়ার লেনদেনের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা ম্যাসেজ পাচ্ছেন, যা পরীক্ষাধীন রয়েছে। শিগগির তা পুরোপুরিভাবে চালু করা হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে