নকলে আর ভেজালে দিশেহারা ক্রেতা

  হাবিব রহমান

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১০:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

নকল ও ভেজাল পণ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বিক্রি রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনায় ভাটা পড়েছে। এ সুযোগে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে ওষুধের মতো স্পর্শকাতর পণ্যও নকল করতে পিছু হটছে না অসাধু চক্র। এর ফলে হরহামেশা এসব পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্যের ওপর।

বাহারি মোড়ক আর চকটদার বিপণন কৌশলে চলছে ভেজাল ও নকল পণ্যসামগ্রী বেচাকেনা। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে ওষুধ- সব ক্ষেত্রেই নকল সামগ্রী তৈরি করছে অসাধু চক্র। আর এসব ভেজাল পণ্যের কারণে ক্যানসার থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই ভেজাল-নকল প্রক্রিয়ায় যুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালনা করা হয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অসাধু চক্রের সদস্যদের দেওয়া হয় জেল-জরিমানা। কিন্তু পরিসংখ্যানের বিচারে সাম্প্রতিক সময়ে তুলনামূলক কমে গেছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভেজালবিরোধী অভিযান।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ভাটা পড়ায় সাজাপ্রাপ্ত অসাধু ব্যবসায়ীরা জামিনে বেরিয়ে ফের একই কাজে যুক্ত হওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ঠেকানো যাচ্ছে না ভেজাল-নকল পণ্যের অবাধ বিকিকিনি।

পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কর্তৃপক্ষ বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা ছাড়া অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অনেক সময় বারবার চেয়েও পুলিশ পাওয়া যায় না। এ কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সংখ্যা কমতে বা বাড়তে পারে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে- সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করছেন তারা।

বিএসটিআইয়ের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালের ১ জুন থেকে ২০১৬ সালের ১ জুন পর্যন্ত এক বছরে এক হাজার ৩৪৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিএসটিআই। অথচ ২০১৬ সালের জুন থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ মাসে মাত্র ৩৮১টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী এই সাত মাসে কমপক্ষে ৭০০ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার কথা।

বিএসটিআই ছাড়াও ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে ৯৩২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে র‌্যাব। এসব ঘটনায় এক হাজার ২২৪টি মামলা করা হয়। এর পরের বছর ২০১৬ সালে ৯৭২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫৬০-এ।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে আমাদের দেশে যত আইন আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হলো ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভোক্তা স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ, নকল, ভেজাল বা ওজনে কম দেওয়ার মতো বিষয়গুলো প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিকল্প নেই। এমন প্রেক্ষাপটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার হওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার। একই সঙ্গে এর কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনাও জরুরি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাহারি নামে বিভিন্ন ভেজাল পণ্য দেদার উৎপাদন-বিপণন করা হচ্ছে। এসব ভেজাল পণ্যের গায়ে বিএসটিআইসহ বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের লোগো নকল করে সেঁটে দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের চোখে আর বিষয়টি ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে না। বিস্কুট, চানাচুর, পানির মতো ভোজ্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রসাধনসামগ্রী এমনকি ওষুধের মতো স্পর্শকাতর পণ্যও ভেজালের তালিকায় রয়েছে। এসব পণ্য মিলছে যত্রতত্র, এমনকি অভিজাত শপিংমলগুলোতেও বিক্রি হচ্ছে।

ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট স্বীকার করেছেনÑ এখন তাদের অভিযান পরিচালনার সংখ্যা কমে এসেছে। তারা বলছেন, নানা কারণে কমে গেছে এটি। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত জোরদার করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

ম্যাজিস্ট্রেটরা আরও বলছেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনেক কাজের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু নকল-ভেজালের কারণে কত জীবন নীরবে ঝরে পড়ছে সেই বিষয়টি বুঝতে চায় না কর্তৃপক্ষ।

ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী একাধিক ব্যক্তি জানান, নকল করা সহজ। নকল এবং ভেজাল পণ্যে লাভও বেশি। তাই জামিনে এসে ফের একই কাজে জড়িয়ে পড়েন তারা।

২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশন সংলগ্ন আড়তে অভিযান চালিয়ে মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগে মো. দেলোয়ার হোসেন ও আসমা বেগম নামে দুজনকে দুই বছরের কারাদ- দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের (তৎকালীন) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দ-প্রাপ্ত ওই দুজন এর আগে অন্তত তিনবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা ভোগ করেছে।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, দেলোয়ার হোসেন ২০১২ সালের মাঝামাঝি র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়। জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে সে আবার একই কাজ শুরু করে। একই বছরের ১৬ মার্চ তেজগাঁও এলাকার অবৈধ কারখানায় অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই কারখানার মালিক খন্দকার একে আজাদ এর আগেও একই ঘটনায় কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মুখোমুখি হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভেজাল উৎপাদনকারীদের পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক একাধিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলে অবৈধ এই কারবার। রাসায়নিক পদার্থ ও রং মিশিয়ে চলছে খাদ্যপণ্য উৎপাদন। নকল কেমিক্যাল দিয়ে মানহীন প্রসাধনী ও ভেজাল কাঁচামালে ওষুধ উৎপাদন হচ্ছে। নকল কসমেটিকস উৎপাদন রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে অসাধু একাধিক চক্র। সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকল বুঝতে পারাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান আমাদের সময়কে বলেন, নকল ও ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান র‌্যাব সাধ্য অনুযায়ী চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযানের কারণে অনেক সময় একই ধরনের অপরাধ কমে আসে। এ কারণে হয়তো তখন অভিযানের সংখ্যাও কমে আসে।

বিএসটিআইয়ের পরিচালক প্রকৌশলী এসএম ইশাক আলী আমাদের সময়কে বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য পুলিশ দরকার হয়। সব সময় পুলিশ চেয়ে পাওয়া যায় না। পুলিশের জনবল স্বল্পতার বিষয়টি আমরাও বুঝি। তাই কিছু করার নেই। তবে রোজার মাসে অভিযানের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার ডিসি মাসুদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে ফোর্স মোতায়েন করার চেষ্টা করি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে