সিসি ক্যামেরার ফুটেজে নিখোঁজ কলেজ শিক্ষার্থী

পরিবারের দাবি ডিবি পুলিশ অপহরণ করেছে # প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে ফুটেজ

  ইউসুফ সোহেল

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১২:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম ছবিতে কৃষি মার্কেটে ঢুকছেন সোহাগ হোসেন, দ্বিতীয় ছবিতে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন। সোহাগের স্বজনদের দাবি, তারা ডিবি পুলিশ। ইনসেটে সোহাগ হোসেন

জানুয়ারির ২২ তারিখে নিখোঁজ হন ২২ বছর বয়সী সোহাগ হোসেন। মিরপুর বাঙলা কলেজের এ শিক্ষার্থীর মা মমতাজ বেগমসহ স্বজনরা এরপর থেকে বরাবরই অভিযোগ করে আসছিলেন যে, ডিবি পরিচয়ে সোহাগকে অপহরণ করা হয়েছে। নাড়ি ছেঁড়া ধনের জন্য বিধবা মমতাজ বেগম প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ধর্ণাও দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ডিবি ও পুলিশ জানিয়েছিল, তারা সোহাগ সম্পর্কে কিছুই জানে না। সর্বশেষ, গতকাল সোহাগের মা মমতাজ বেগম তার ছেলেকে অপহরণের ভিডিও ফুটেজ তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, র‌্যাব সদর দপ্তর, পুলিশ সদর দপ্তরের আইজিপিস কমপ্লেইনস মনিটরিং সেল এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে।

গত ২২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে কৃষি মার্কেটের সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে সোহাগকে অপহরণের দৃশ্য। এ প্রতিবেদকের কাছেও ফুটেজের একটি কপি রয়েছে। তাতে দেখা যায়-

রাত ৮টা ২৪ মিনিট। লোকে লোকারণ্য রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে মার্কেটে প্রবেশ করেন সোহাগ হোসেন। তার পেছন পেছন তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে অচেনা তিন ব্যক্তিও প্রবেশ করেন মার্কেটে। হঠাৎ বিপণি বিতানগুলোর সম্মুখভাগ থেকে ঝালমুড়িওয়ালা ও অপেক্ষমাণ রিকশাচালকসহ সবাইকে ধমকের সুরে সরিয়ে দেন ওই তিনজনের বাইরের অন্য একজন, তিনি মধ্যবয়সী। তার গায়ের জ্যাকেটে লেখা ‘ডিবি’। এভাবে কেটে গেছে আরও ১২০ সেকেন্ড। রাত ৮টা বেজে যখন প্রায় ২৭ মিনিট, তখন সোহাগকে সঙ্গে নিয়ে কৃষি মার্কেট থেকে বেরিয়ে আসেন ৫-৬ জন ব্যক্তি। এরপর তারা রাস্তার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা রঙের একটি নোহা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় ওই শিক্ষার্থীকে। মার্কেটের অসংখ্য মানুষের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

সোহাগের স্বজনদের অভিযোগ, ‘ডিবি পুলিশ’ পরিচয় দিয়ে তাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করা হয়েছে।

নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর অর্থাৎ গত ২৩ জানুয়ারি ছেলের খোঁজ পেতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর-১৭৭৯) করেছিলেন মমতাজ। কিন্তু ২৫ দিনেও সোহাগকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এখন ভিডিও ফুটেজ পাওয়ার পর তার আশা, জীবিত বা মৃত যা-ই হোক, ছেলের সন্ধান জানতে পারবেন।

সোহাগের নিখোঁজের বিষয়ে করা জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই প্রদীপ কুমার আমাদের সময়কে বলেন, সোহাগের খোঁজ পেতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সব থানায় বেতারবার্তার মাধ্যমে খবর পাঠানো হয়েছে। ওই শিক্ষার্থীর মা বলেছিলেন, সোহাগ ডিবির কার্যালয়ে আছে। কিন্তু এ পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মমতাজ বেগম আমাদের সময়কে জানান, সোহাগ এবার ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়েছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজধানীর শ্যামলী মার্কেটে জনৈক মামুনের দোকানে মোবাইল ফোন মেরামতের কাজ করতেন তার ছেলে। গত বছরের ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন আজিজ মহল্লার চুন্নু মিয়া সড়ক থেকে সাদা পোশাকে ৩ ব্যক্তি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পরিচয় দিয়ে সোহাগকে আটক করে জনৈক নারীর একটি মোবাইল ছিনতাই হওয়ার ঘটনায়। পরে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে তাকে একটি কালো রঙের প্রাইভেট কারে তুলে দেয় ওই ৩ জন। যাদের একজন ডিবি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান। তবে পুলিশ পরিচয় দেওয়া অন্য দুজনের নাম আমাদের সময়কে জানাতে পারেননি মমতাজ। এক পর্যায়ে তিনি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, পরিচয়পত্র প্রদর্শন করা ছাড়াই সোহাগকে আটকের কারণে ডিবি পুলিশের পরিচয়দানকারীদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের হট্টগোল চলছে। পরে উত্তেজিত জনতার রোষানল থেকে বাঁচার জন্য ওই ৫ জন মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ ডেকে আনেন। তারা নিজেদের পরিচয়পত্র (ডিবির কর্মকর্তা) দেখালে স্থানীয়রা সোহাগকে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের গাড়িতে তুলে দেয়। কিন্তু ওই দিন দিবাগত রাত ৮টার দিকে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে সোহাগের আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্তব্যরত পুলিশ মমতাজ বেগমকে জানায়, একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ডিবি পুলিশ মিন্টু রোডের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে গেছে সোহাগকে।

তিনি আরও জানান, সোহাগের খোঁজে সে রাতে তিনি ও তার পরিবারের লোকজন ডিবির প্রধান কার্যালয়ে যান। কিন্তু ডিবি কার্যালয়ের কেউই সোহাগকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করেননি। এভাবে ডিবি কার্যালয়ে দুই দিন ধর্ণা দিলেও সোহাগের অবস্থান জানতে পারেননি তারা। অবশেষে গত ১৯ অক্টোবর সকালে সোহাগকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করে ডিবির কর্মকর্তা আনিসুর রহমান। ওই দিনই সোহাগকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালত সেদিন সোহাগের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অতঃপর সোহাগকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।

মমতাজ বেগম জানান, সোহাগকে রিমান্ডে আনার পরদিন (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ডিবির কর্মকর্তা তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন (০১৯১****২২৮) নম্বরে কল দিয়ে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। তার কথামতো সেদিন রাত ৮টার দিকে তিনি ডিবি কার্যালয়ে যান। কর্মকর্তা আনিসুর রহমান রিমান্ডে সোহাগকে মারধর করা হবে না বলে মমতাজের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। এত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে সোহাগকে বেদম মারধরের হুমকি দেন ওই কর্মকর্তা। দেন দরবারের একপর্যায়ে ৩০ হাজার টাকায় রাজি হন তিনি। সে রাতেই গলার স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল বিক্রি করেন সোহাগের মা। পরদিন (২১ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে ডিবি কার্যালয়ের অদূরে অবস্থিত একটি চায়ের দোকানে বসে ওই কর্মকর্তার হাতে স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির ২২ হাজার টাকা তুলে দেন মমতাজ বেগম। সেদিন বেলা ১১টার দিকে আদালতে হাজির করা হয় সোহাগকে। একমাস ৫ দিন কারাবাসের পর আদালত সোহাগ হোসেনের জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর আদালতে হাজিরা দেয় সোহাগ।

সোহাগের মা জানান, যেদিন সোহাগ প্রথম হাজিরা দেয় তার তিন দিন (১৬ ডিসেম্বর বিকাল) আগে ডিবি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর (০১৭১****৬৮০) থেকে মমতাজের মোবাইল নম্বরে (০১৯১****২২৮) ফোন করে সোহাগকে সঙ্গে করে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এর কারণ জানতে চাইলে কর্মকর্তা বলেন, মামলার বাদিনী আপনাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চাইছেন, তাই। মমতাজ বেগম আদালতে গিয়ে মামলা মীমাংসার কথা বলেন। সে সময় রেগে গিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ছেলেরে কোন রাষ্ট্রে লুকায়ে রাখবেন, সেখান থেকেই তাকে খুঁজে বের করে আনব। একবার তো তারে জামাই আদর করছি, এইবার ধরতে পারলে হাড় মাংস গুঁড়া করে ফেলব। ছেলের জন্য রাস্তায় রাস্তায় কানবেন আর ঘুরবেন। কোথাও কিন্তু খুঁজে পাবেন না’ বলে ফোনটি কেটে দেন তিনি। এর দুদিন পর তিনি নিজেই ফোন দেন কর্মকর্তাকে। কিন্তু তিনি কোনো কথাই না শুনে হুমকির স্বরে বলেন, ‘আপনাকে আসতে বলেছিলাম, আসেননি। কাজটা কিন্তু খারাপ করেছেন। ফারদার আর কখনো আমাকে ফোন দেবেন না’ বলে সেদিনও ফোনটি কেটে দেন তিনি।

সোহাগের মায়ের করা অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডিবি কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ওপাশ থেকে সাড়া দেননি তিনি।

ঘটনার বিষয়ে সোহাগের মা বলেন, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো আদালতে হাজিরা দেয় সোহাগ। দুই দিন পর অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি রাত ৮টার দিকে এক বন্ধুর জন্মদিনের উৎসবে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় সোহাগ। এরপর রাতে তার আর কোনো খোঁজ পাইনি আমরা। তার ব্যবহৃত ২টি মোবাইল ফোনও (০১৯৭****৫০০ এবং ০১৬৭****৫০০) বন্ধ পাই। রাজধানীর সবগুলো থানা, হাসপাতালসহ সম্ভাব্য সব স্থানে খুঁজেও যখন সোহাগের সন্ধান না পাওয়ায় ঘটনার পরদিন মোহাম্মদপুর থানায় ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করি। সম্প্রতি আমি জানতে পারি, গত ২২ জানুয়ারি রাত ৮টা ২৪ মিনিটে আমাদের বাসার অদূরে অবস্থিত মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে ‘ডিবি পুলিশ’ পরিচয়ে আমার ছেলেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় ৫-৬ ব্যক্তি। যার সত্যতা পেয়েছি মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সিসি টিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজে। এ ফুটেজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দেখিয়েছি। কিন্তু কেউই বিষয়টি আমলে নেয়নি। ডিবি কার্যালয়ে গেলেও কেউ এখন আর আমাদের পাত্তা দিচ্ছেন না। ধারণা করছি, ডিবি পুলিশের কিছু সদস্য আমার ছেলেকে অন্যায়ভাবে কোথাও আটকে রেখেছে, অথবা তারা সোহাগকে মেরে লাশ গুম করে ফেলেছে। এসব ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি আমরা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে সোহাগকে খুঁজে বের করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন মমতাজ বেগম।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার ডিসি মাসুদুর রহমান গত রাতে আমাদের সময়কে বলেন, কৃষি মার্কেটের সামনে থেকে ২৫ দিন আগে বাঙলা কলেজের কোনো ছাত্র নিখোঁজ হয়েছেন বলে আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।

ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সোহাগকে অপহরণের দৃশ্য দেখতে এখানে ক্লিক করুন

অপহৃত সোহাগের মায়ের বক্তব্য শুনতে এখানে ক্লিক করুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে