‘আমরা পড়ব আপনাদের পড়তে দেব না’

  সজল ছত্রী, সিলেট

২৮ মার্চ ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৭, ০১:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটের শিববাড়ির আতিয়া মহল নামের পাঁচতলা ভবনে বসবাসরত ২৯টি পরিবার রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবতেও পারেনি তাদের জন্য কী দুর্বিষহ সময় অপেক্ষা করছে। বৃহস্পতিবার রাতে তারা ঘুমোতে গিয়েছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। শুক্রবার ভোরে কেউ কেউ নামাজ পড়তেও ওঠেন। জানালা গলে আশপাশে দু-চারজন পুলিশ নজরে পড়লেও আঁচ করতে পারেননি কী ঘটতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে দেখেন গেট লাগানো। সঙ্গে পুলিশের মাইকিং ‘দরজা-জানালা বন্ধ করে নিরাপদে থাকুন।’

সোমবার এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই সেনাবাহিনীর উদ্ধার অভিযানের বর্ণনা দিচ্ছিলেন আতিয়া মহল থেকে উদ্ধার হওয়া টেস্টি ফুডের এরিয়া ম্যানেজার আনিসুর রহমান। ভবনটির প্রতি তলায় ছয়টি করে ফ্ল্যাট। তৃতীয় তলার পনেরো নম্বর ফ্ল্যাটে থাকতেন আনিসুর রহমান। সঙ্গে তার স্ত্রী আরিফা আক্তার। তিনি সন্তানসম্ভবা। তাদের বাড়ি বগুড়ায়। সেনাবাহিনীর উদ্ধার অভিযানের বর্ণনায় তিনি বললেন, ‘প্রথমে অতটা আতংকিত হইনি। পরে গ্যাস-কারেন্ট বন্ধ করা হলো। থেমে থেমে বোমা-গুলির শব্দে আতংক বাড়ছিল। বেঁচে ফিরব বুঝতে পারিনি। বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবার রাতও কেটে গেল এভাবে। শনিবার শুনলাম আর্মি অপারেশন করবে। সকালবেলা ঝড়ের সময় দরজায় টোকা দিয়ে আর্মি পরিচয় দেওয়া হলো। অনেকটা ভয় নিয়েই দরজা খুললাম। তারপর তাদের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছি এককাপড়ে। দুই দালানের মাঝে মই আর দড়ি দিয়ে পার করানো হচ্ছিল, মহিলারা ভয় পাচ্ছিলেন। সেনাবাহিনীর ভাইরা তাদের হাত ধরে বলেছিলেন, ‘আমরা পড়ব, আপনাদের পড়তে দিব না, নির্ভয়ে পার হোন।’ শিশুদেরও তারাই পার করেছেন। নিচতলায় জঙ্গিদের সঙ্গেই এক পরিবার। সে পরিবারের মহিলা নয় মাসের গর্ভবতী ছিলেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেয়াল কেটে তাদের উদ্ধার করেছে। চিকিৎসাও দিয়েছে। উদ্ধারের পর রাতে যখন আমাদের সবাইকে একঘরে রাখা হয় তখন এসব গল্পই করছিলাম আমরা।

সোমবার বিকালে দক্ষিণ সুরমার একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে খেতে কথাগুলো বলছিলেন আনিসুর রহমান। পাশেই ছিলেন তার স্ত্রী আরিফা। তার প্রশ্নÑ অভিযান কবে শেষ হবে? জানালেন, ভবন থেকে বেরিয়ে আসার সময় সবকিছু ফেলে এসেছেন। ঘর-দরজাও খোলা। এতদিনের সব সঞ্চয় অরক্ষিত রেখে এসে একরাশ হতাশা তার চোখেমুখে।

আরিফা বললেন, ‘উদ্ধারের পর আমাদের একটি বাড়িতে রাখা হয়। খাবার-দাবারও দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর ভাইরা অনেক ভালো ব্যবহার করেন আমাদের সঙ্গে। সকালে আমাদের বিভিন্ন তথ্য রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তখন আমরা কই যাব জানতাম না। অনেকেই আমাদের সঙ্গে পাশের একটি হোটেলে ওঠেন। আমরা এখনো আছি, কয়েকজন চলে গেছেন আত্মীয় বা গ্রামের বাড়িতে।’

তাদের কথায় দক্ষিণ সুরমার একটি আবাসিক হোটেলে গিয়ে দেখা গেল সেখানে আবাস গেড়েছে কয়েকটি পরিবার। কথা হলো বরিশালের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শিরিন আক্তারের সঙ্গে। আতিয়া মহলের দ্বিতীয় তলার ৭ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকতেন তারা। কাজ করেন পারফেকটিভ ভ্যান মিল নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। তিনি বলেন, ‘বলা যায় সেনাবাহিনীই একটা নতুন জীবন দিয়েছে আমাদের। ভাবতেও পারিনি বেঁচে ফিরব। কিন্তু এখন নতুন ভয়, ফেলে আসা সবকিছু হারাতে না হয় আবার!’

নজরুল ইসলাম বলেন, মহানগর পুলিশের কর্মকর্তা আশরাফি ভাই আমার পরিচিত ছিলেন। তিনি ফোনে বলেছিলেন, ‘পুলিশ, সেনাবাহিনী সবাই এসেছে। আমাদের উদ্ধার করা হবে। তাদের পরামর্শে আমরা ফ্লোরে শুয়ে পড়ি। আমার সাত বছরের একটা মেয়ে আছে। ওর জন্য কষ্ট হচ্ছিল। আমরা যখন পুলিশের পরামর্শে আমাদের আইডি কার্ড নিচ্ছিলাম, তখন সে আমাকে প্রশ্ন করে, ‘আব্বু, আম্মু, তোমাদের তো কার্ড আছে, আমার তো নেই, পুলিশ কি আমাকে নিয়ে মেরে ফেলবে?’

পাশেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল সাত বছরের নুসরাত তাইবা। তার চোখেমুখে তখনো ভয়।

ভবনটিতে জিম্মি হয়েছিল দুটি পুলিশ পরিবারও। মহানগর পুলিশের এএসআই মুহিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয় তলার বাসিন্দা। ফোনে যোগাযোগ হলে তিনি বলেন, সেখান থেকে বের হয়ে সবাইকে নিয়ে নিজ বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চলে এসেছেন। সেখানে ঘরের দরজা খোলা, সব অরক্ষিত।

উল্লেখ্য, ২৪ মার্চ ভোররাতে সিলেটের শিববাড়ির জঙ্গি আস্তানা আতিয়া মহল ঘিরে ফেলা হলে পাঁচতলা ভবনটিতে আটকা পড়ে ২৯টি পরিবার। সেনা কমান্ডোরা শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একে একে মুক্ত করে আনে পরিবারগুলোকে। শুধু প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারলেও পরিবারগুলো এখন সম্বলহীন, আশ্রয়হীন। ভোগান্তি, ভয়, বিভ্রান্তি তাদের মধ্যে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে পরদিন বিভিন্ন জনের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের। কিন্তু ঘরে সবকিছু রেখে বাইরে এসে বিপদে পড়ে পরিবারগুলো। বেশিরভাগ পরিবার চলে যায় আত্মীয়স্বজন বা গ্রামের বাড়ি। যারা যেতে পারেননি তারা আশ্রয় নেন কাছাকাছি সাধারণ মানের আবাসিক হোটেলে। প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ও খাবার কিনে নেন হাতের শেষ সম্বল দিয়ে।

এখন তারা কারো আশ্রিত, কারো বা হোটেল কক্ষই সংসার। ভয় ছেড়ে আসা সম্বল হারানোরও। তবু শুধু প্রাণে বেঁচে ফিরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা তাদের।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে