তৃণমূলে আত্মঘাতী আ.লীগ

  আলী আসিফ শাওন

২১ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৭, ০৯:২৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

শাসক দল আওয়ামী লীগের তৃণমূল আত্মঘাতী হয়ে উঠছে। নিয়মিত বিরতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে নেতাকর্মীরা। নিজেরাই নিজেদের রক্ত ঝরাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা কমিয়ে আনতে কেন্দ্র থেকে তদারকি শুরু হয়েছে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সেভাবে কোনো কর্মকা- নেই। এ অবস্থায় প্রতিটি জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের একাধিক বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগে। দলীয় কিংবা স্থানীয় স্বার্থে ওই গ্রুপগুলো নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়াচ্ছে। সদ্য অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা ধারণা করছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা বাড়তে পারে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, বড় দল, নেতৃত্ব অনেক, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও তীব্র। এজন্য অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। তবে যেটা হচ্ছে সেটা আমাদের চোখে পড়েছে। আমরাও চাচ্ছি সংঘর্ষের অবসান। সংঘর্ষের ঘটনাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করছি এটা ভবিষ্যতে থেমে যাবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম আমাদের সময়কে বলেন, সংঘাত, সংঘর্ষ হচ্ছে, তার সমাধানও হচ্ছে। আমরা বসে নেই, কাজ করছি।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম শহরের আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিংপুলের নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে ঘেরাও কর্মসূচি পালনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয় চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ২৫ নেতাকর্মী। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির সুইমিংপুল নির্মাণের পক্ষে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর অবস্থান এর বিপক্ষে। জেলার দুই শীর্ষ নেতার বিরোধিতার জেরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের রক্ত ঝরেছে।

দলীয় কোন্দলের কবলে সংঘর্ষে পড়ে শুধু রক্তপাতই হচ্ছে না, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মামলায় এলাকাছাড়াও হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর সঙ্গে স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের বিরোধ এখন প্রকাশ্য। ২৮ মার্চ স্থানীয় পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি সোহাগ বিশ্বাস ও ঈশ্বরদী কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন সনেটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় ঈশ্বরদী যুবলীগের সভাপতি ভূমিমন্ত্রীর ছেলে শিরহান শরিফ তমাল ও যুবলীগের সেক্রেটারি রাজীব বিশ্বাস। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে পাবনার ঈশ্বরদীর পৌর, সরকারি কলেজ এবং থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই এলাকাছাড়া। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দায়ের করা একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা এলাকার বাইরে।

গত বছর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রেসেও সংঘাত বাধছে কোথাও কোথাও। চলতি সপ্তাহে নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার বাঁশগাড়ী এলাকায় আওয়ামী লীগের দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একজন নিহত ও ২১ জন আহত হয়। বেশ কয়েকটি বাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি ১৫টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। একই উপজেলার পার্শ¦বর্তী চরাঞ্চল নিলক্ষা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ চলে আসছে মাসখানেক ধরে। দফায় দফায় সংঘর্ষে এ পর্যন্ত পাঁচজন নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়।

গত মঙ্গলবার ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত হয়। সংঘর্ষে ৪০টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় রামকান্তপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেনের বাড়ি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে আয়মান আকবর বাবলু চৌধুরীর নেতাকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সালথা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী সাব্বির আলীর নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত দফায় দফায় চলে সংঘাত।

১৯ মার্চ হাতিয়ায় আওয়ামী লীগের দুপক্ষের ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে জাহাজমারা ইউনিয়নের স্থানীয় যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ১৭ মার্চ আলোচনাসভা, র‌্যালি ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। পরদিন ১৮ মার্চ জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যের স্বামী মোহাম্মদ আলী সমর্থিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাছুম বিল্লাহর নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে রাত ৯টার দিকে জাহাজমারা বাজারে গিয়ে ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম সিরাজউদ্দিনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধায়।

এ ছাড়া ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের সময় ফেনীর সোনাগাজী, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আওয়ামী লীগের কোন্দলে একজন ছাত্রলীগ কর্মী নিহত ও অর্ধশত আহত হন। ফেনীতে কাঙালিভোজে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া অন্য দুই জায়গায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন নিয়ে সংঘর্ষ হয়।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ২৪ জন আহত হয়। এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ভিপি রহিম ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়। ওই সময় কর্তব্য পালন করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ওই দিন রাতে শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান মডেল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম হাসান খানকে কুপিয়ে আহত করে নিজ দলের নেতাকর্মীরা। এর একদিন পর শুক্রবার কুষ্টিয়া সদরের জিয়ারখালী ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আফজাল হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ইদ্রিস আলী নিহত হন। তার আগে বুধবার রাতে খুন হন নড়াইল সদর উপজেলার ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রভাষ রায়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি টেন্ডার নিয়ে চট্টগ্রাম নগরভবনে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি ও সংঘর্ষে সাতকানিয়া উপজেলার সদাহা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত নিহত হন।

এর আগে ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক নুরুল আমিন মুহুরী নিহত হন। গত ১২ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে সদ্য প্রয়াত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় এমপি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মতিউর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন মারা যান। এর আগের দিন সোমবার রাতে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিরোধের জের ধরে বড়মাছুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাইয়ুম হোসেনকে কুপিয়ে জখম করেন প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা। একই দিনে রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে সিট ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এর আগে ১০ জানুয়ারি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজ সিকদার এবং সাবেক চেয়ারম্যান শফিউদ্দিনের মধ্যকার সংঘর্ষে একজন নিহত হন। ৩ জানুয়ারি বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক কাজী মজিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা চালায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এর আগের দিন কক্সবাজারের চকরিয়ায় ইয়াবার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইটের আঘাতে আহত হন এক প্রবীণ শিক্ষক। এ ছাড়া চলতি বছরের শুরুতেই গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ। মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেডএ মাহমুদকে লক্ষ্য করে ছোড়া প্রতিপক্ষের গুলিতে এক পথচারী নারী নিহত হন।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে রাজনৈতিক সংঘাতে দেশে ১৭৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই ৮৩ জন। আর ২০১৫ সালে রাজনৈতিক সংঘাতে ১৫৩ প্রাণহানির ৩৩টিই আওয়ামী লীগের। এর আগের বছর ২০১৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৭। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩৪ জন। আওয়ামী লীগের এসব নেতাকর্মীর বেশিরভাগই আবার নিহত হয়েছেন নিজেদের কোন্দলে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে