সব কিছু ভেঙে পড়ে

  রেজাউল করিম প্লাবন

১৯ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ মে ২০১৭, ১২:৫৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ নির্বাচনে অংশ নিতে কদিন আগে জোট গঠনের ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার জোট গঠন অবশ্য এটাই প্রথম নয়। এর আগে জোট গড়লেও কখনো কয়েক মাস, আবার কখনোবা কয়েক বছরের মধ্যে তা ভেঙে গেছে। সর্বশেষ ৫৮ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোট (ইউএনএ) গঠনের মাত্র নয় দিনের মাথায় তা ভেঙে গেল। আর তার গড়া দল কতবার ভেঙেছে তার ইয়ত্তা নেই। জাপা ভাঙতে ভাঙতে ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে, হয়েছে টুকরো টুকরো।

সাবেক এ রাষ্ট্রপতির জীবনে চলেছে নানা ভাঙা-গড়ার খেলা। তার মাথার ওপর দুটি মামলা, আছে জেল-জুলুমের ভয়। এমপিরা শোনেন না দলীয় নির্দেশ; দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরু থেকেই অবাধ্য তিন মন্ত্রী। রাজনীতির অশান্তির ছায়া তার পারিবারিক জীবনে। সহধর্মিণী রওশনকে পাচ্ছেন না পাশে। আর এখন নতুন সমস্যা নতুন জোটের ভাঙন। ইউএনএ জোটের ভেতর থাকা বিএনএ জোটের ১১টি দলই চলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে নতুন সমস্যায় পড়েছেন সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

জাতীয় পার্টি এবং ইউএনএ জোট সূত্রে জানা গেছে, দলকে শক্তিশালী ও জোটগত নির্বাচনে ক্ষমতার স্বপ্ন বোনা এরশাদের এসব কর্মপরিকল্পনা নস্যাতের জন্য তার নিজ দলের নেতাকর্মীরাই দায়ী। ক্ষমতায় থেকে ও ক্ষমতার বাইরে থেকে এরশাদের বিশ্বস্ত-অনুগতরাই দল ও জোটের ক্ষতি করছে। সরকার গঠনের পর থেকে পদে পদে নেতাদের দ্বারা হোঁচট খাওয়া এরশাদ আগামী নির্বাচনে কতটা গুছিয়ে উঠতে পারবেন তা নিয়েও চিন্তিত জাপার ত্যাগী কর্মীরা। তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে পেছন থেকে টেনে ধরা হাজারো সমস্যা ঠেলে সামনে এগোনো সাবেক এই রাষ্ট্রপতির জন্য বেশ কঠিনই বটে।

গত তিন বছরে মোট ছয়বার সরকার থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এতে একবারও তিনি দলীয় মন্ত্রীদের সাড়া পাননি। উপরন্তু সেসব মন্ত্রীর রক্তচক্ষু হজম করতে হয়েছে তাকে। শুনতে হয়েছে নানা বাজে মন্তব্য। এসব বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা চেয়েও পাননি। বিষয়টিকে জাতীয় পার্টিতে ‘বাল্যখেলা’ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চলতি মাসের শুরুতে সেই চেষ্টায় আবারও ব্যর্থ হন এরশাদ। বারবার সরকার থেকে পদত্যাগের নিষ্ফল চেষ্টায় দলে এখন হাসির পাত্র তিনি।

দেশে সবচেয়ে বড় ৫৮-দলীয় জোট ‘ইউএনএ’ গঠন করে ব্যাপক প্রচারের আলোয় আসার অপেক্ষায় ছিলেন এরশাদ। কর্মপরিকল্পনাও নির্ধারণ করেন। ঈদের পর দেশব্যাপী লিয়াজোঁ কমিটি ও ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু জোট গঠনের মাত্র ৯ দিনের মাথায় ভাঙনের কবলে পড়েছে তার স্বপ্নের জোট। ইউএনএ জোটের ভেতর থাকা বিএনএ জোটের ১১টি দল এরশাদের নেতৃত্বাধীন দল থেকে বেরিয়ে গেছে। এতে নতুন হতাশায় ডুবলেন তিনি। এ ছাড়া জোটের ভেতরে পাওয়া-না পাওয়া নিয়েও একটা মৃদু ঝড় বইছে। শেষ পর্যন্ত জোটের ভাগ্যে কী ঘটে তা নিয়েও অস্বস্তিতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

জোট নিয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীদের প্রশ্নের সম্মুখীন তিনি। নামসর্বস্ব দল নিয়ে জোট করায় দলের অনেকেই ক্ষুব্ধ। জোট গঠনে দায়িত্বশীল নেতাদের একতরফা সিদ্ধান্তে এরশাদ সম্মতি দিয়েছেন বলে শ্রুতি আছে। এ কারণে জোট নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তেমন একটা উৎসাহ নেই।

ক্ষমতা হারানোর পর থেকে মামলা-হামলা নিয়েই পথ চলছেন সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ। ১৯৯১ থেকে ২০১৭। প্রতিটি নির্বাচনে, প্রতিটি ক্ষেত্রে বিএনপি-আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। তবে তার নামে থাকা মামলা থেকে রেহাই পাননি। চলতি বছর এরশাদ ২টি মামলায় খালাস পেলেও মেজর মঞ্জুর হত্যা মামলাসহ ২টি এখনো তার মাথার ওপর। মেজর মঞ্জুর হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ও হতে পারে। এ নিয়েও কম বেকায়দায় নন এরশাদ।

এদিকে সরকারের কাছাকাছি থাকায় জাতীয় পার্টির ৪০ জন এমপি বেশ সুবিধায় আছেন। এসব এমপির নেতৃত্বে আছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও এরশাদের সহধর্মিণী রওশন এরশাদ। এই এমপিরা বেশিরভাগই এরশাদের নির্দেশ মানেন না। নির্বাচনী এলাকায়ও তারা যান না। সংসদীয় বৈঠকেও সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন বিরোধীদলীয় সিদ্ধান্ত মানেন না জাতীয় পার্টির এসব এমপি। নিজ দলের এমপির এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে বেশ অস্বস্তিতে তিনি।

এরশাদের পারিবারিক রাজনৈতিক কলহের কারণে এরশাদ পরিণত হয়েছেন এক অসহায় লৌহখ-ে, যা কখনো স্ত্রীর চৌম্বক ক্ষমতায় বেশি আকর্ষিত হয় আবার কখনো ভাইয়ের চৌম্বক ক্ষমতার দিকে হেলে পড়ে। এদিকে সেই ভাই কিংবা স্ত্রীর চৌম্বক ক্ষমতা আবার সরকার কর্তৃক নির্ধারিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন পর বিরোধীদলীয় নেতা রওশনের সঙ্গে এরশাদের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হলেও পারিবারিকভাবে আলাদাই থাকছেন এই দম্পতি। বিদিশার ঘরে জন্ম নেওয়া পুত্র এরিককে নিয়ে বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে এরশাদ আর গুলশানের বাড়িতে বসবাস করছেন রওশন।

নেতাকর্মীরা জানান, গত ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয়ে দলে ও তৃণমূলে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অনেক জায়গায় দলীয় নেতাকর্মীরা অন্য দলে যোগদান করেছেন। দলকে এই বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে এরশাদ জেলা সফর শুরু করেছেন। কিন্তু ইউনিয়ন, উপজেলায় প্রার্থী সংকটে পড়া জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে কতটা যোগ্য প্রাথী দিতে পারবে তা নিয়েও চিন্তা করছেন দলটির চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থাকা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এরশাদ সরকার থেকে বেরিয়ে খাঁটি বিরোধী দল হতে চাইলেই মন্ত্রিত্ব পাওয়া নেতারা তা চান না। আবার সরকারে থেকে বিরোধী দলের রোল প্লে করলে সাধারণ মানুষের হাস্যরসের পাত্র হন তিনি। এ কারণে ইচ্ছে থাকলেও বারবার ঘোষিত খাঁটি বিরোধী দল বাস্তবায়ন করতে পারছেন না হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে