বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল

  রেজাউল করিম প্লাবন

১৭ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৭, ০০:১০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে শোক দিবস, বন্যা পরিস্থিতি ও বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দূরত্বের বিষয়টি আলোচনা ও সমাধান নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ সময় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সোমবার সকালে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানাতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বঙ্গভবনে যান এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি রায়ের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে তার যুক্তিগুলো তুলে ধরেন। তিনি সংবিধানের সূচনা বক্তব্যের আলোকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে রায়ের পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বলে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। একই দিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে দলের অবস্থানের কথা জানান।

বর্তমানে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায়ের পর্যবেক্ষণে আসা ‘অনভিপ্রেত’ বিষয়গুলো বাদ দেওয়াই আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য। এমন একটা সমাধানের পথ খুঁজছে সরকারি দল। গত ৩ জুলাই ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ১ আগস্ট প্রকাশিত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা দেশের রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দেন। এতে বেশ ক্ষুব্ধ হয় সরকার ও আওয়ামী লীগ। প্রথমদিকে রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা তেমন মন্তব্য করতে রাজি না হলেও গত ৭ আগস্ট মন্ত্রিসভায় রায় নিয়ে ক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিনি এ রায়ের অযাচিত অংশ বঙ্গবন্ধু, সংসদ ও অন্যান্য আপত্তিকর দিক নিয়ে জনমত গঠনের নির্দেশ দিলে কেন্দ্রীয় নেতারা রাজপথে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। রায়ের বিরুদ্ধে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ঘোষিত তিন দিনের কর্মসূচি চলছে।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়বস্তু ও রায় নিয়ে আওয়ামী লীগের ‘প্রকৃত’ অবস্থান রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন ওবায়দুল কাদের। গত ১৪ আগস্ট এক ঘণ্টা বঙ্গভবনে অবস্থান করেন তিনি। বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর পর্যবেক্ষণ বিষয় নিয়ে আমাদের দলের অবস্থানের কথা রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেছি। রায় নিয়ে দলের প্রকৃত অবস্থান কী সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছি। কাদের বলেন, যেহেতু রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক, প্রধান বিচারপতি তিনিই নিয়োগ দেন। তাকে আমি বিষয়টি জানিয়েছি। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে যেসব কথাবার্তা হয়েছে, সে বিষয়েও রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছি।

একই দিন ওবায়দুল কাদেরের সাক্ষাতের কিছুক্ষণ আগে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ করে বঙ্গভবন ছাড়েন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা হয়েছে কিনাÑ জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।

রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের এ মন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে, শেষ হওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।

এই চেষ্টার অংশ হিসেবে ১২ আগস্ট প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বাসায় যান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় অবস্থান করেন। তারা একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে বিষয়টি স্বীকার করেন কাদের।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের আগে ওবায়দুল কাদের দলীয়প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনে বিষয়টি অবহিত করেন। সাক্ষাতের পর রবিবার সকালে গণভবনে গিয়ে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীকে বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ষোড়শ সংশোধনী রায়ের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান প্রধান বিচারপতির কাছে তুলে ধরেন। তাদের মধ্যে দুই ঘণ্টা আলোচনা হয়। আলোচনা আরও হবে। সময় হলে সব জানানো হবে।

তবে আলোচনা ফলপ্রসূ হলেও এ নিয়ে পানি কম ঘোলা করেননি আওয়ামী লীগ নেতারা। রায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ মনোভাব ব্যক্ত করে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু দাবি করেন, সংসদ নিয়ে প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই। দেশের বর্তমান সংসদ যদি অবৈধ হয়, তবে প্রধান বিচারপতির নিয়োগও অবৈধ।

১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বৈধ সংসদ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে রায়ে যে পর্যবেক্ষণ রয়েছে, তা ১৪ দল প্রত্যাখ্যান করছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে রায়ে যা বলা হয়েছে, তা জনগণ মেনে নেবে না, ক্ষমা করবে না। সুতরাং এ রায়ের পুনর্বিবেচনা জরুরি।

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, এই দেশের মানুষ আপনাকে আর প্রধান বিচারপতি পদে দেখতে চায় না। একটি অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি নিজ থেকে পদত্যাগ না করলে শোকের মাস আগস্টের পর সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে তার অপসারণে আইনজীবীরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলন করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আপিল বিভাগ যে যুক্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করেছেন, সেই যুক্তি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। মন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয়, প্রধান বিচারপতির যে রায়, তা যুক্তিতাড়িত নয় বরং আবেগ ও বিদ্বেষতাড়িত। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির রায়ে আপত্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য আছে, সেগুলো এক্সপাঞ্জ করার উদ্যোগ আমরা নেব।

গত কয়েকদিন থেকে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে নিয়ে নানা মন্তব্য করলেও এই রায়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে, তা বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। তাই এখান থেকে বেরিয়ে আসা উচিত, সেটি যে করেই হোক। আওয়ামী লীগের অব্যাহত চেষ্টায় গত এক সপ্তাহে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সৌজন্য সাক্ষাতে সৌহার্দপূর্ণ আলোচনায় উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, ৬ আগস্ট সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুল মতিন খসরু প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় রায়ের পর্যবেক্ষণে থাকা ‘অনভিপ্রেত’ অংশ কীভাবে বাদ দেওয়া যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই আলোচনা আওয়ামী লীগের জন্য আশানুরূপ কোনো ফল বয়ে আনেনি। এর পর থেকে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা-সাংসদরা প্রকাশ্যে রায় ও প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করে বক্তব্য অব্যাহত রাখেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েক নেতা জানান, আমরা আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। আশার আলো দেখছি। বিশ্বাস করি এ সমস্যা স্থায়ী হবে না। অচিরেই সমাধান হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তেমনই ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, আকাশের মেঘ ক্ষণিকের, সূর্য চিরদিনের। ক্ষণিকের মেঘ কেটে যাবে, সূর্য উঠবে আবার। সোমবার জন্মাষ্টমীর এক অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ থাকতে পারে, কিন্তু শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে