দেশের এক-তৃতীয়াংশ পানিতে

১০৭ জনের মৃত্যু # ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানির সিদ্ধান্ত

  মো. মাহফুজুর রহমান

১৭ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৭, ০৯:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা। এবার মধ্যাঞ্চলের পদ্মা অববাহিকার জেলাগুলোর অনেক নিম্ন ও চরাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে রাজধানীর আশপাশের নদীগুলোর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে ঢাকা জেলাও রয়েছে বন্যার শঙ্কায়।

এদিকে বন্যা পরিস্থিতিতে খাদ্যঝুঁকি মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরে ১৫ লাখ টন চাল ও ৫ লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চালের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। গতকাল সচিবালয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আমাদের সময়কে জানান, বন্যা ও ধানের ব্লাস্ট রোগের কারণে বোরো ফসলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়নি। এখন যেভাবে বন্যা আসছে, তাতে বিপদের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ জন্য সার্বিক বিবেচনা করে ১৫ লাখ টন চাল ও ৫ লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সরকারি সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত বন্যায় ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, উত্তরের পর মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করায় বড় বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল বিকালে রাজধানীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৪৮ ঘণ্টায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যায় পানিতে ডুবে ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, উপদ্রুত ২১ জেলায় ১ হাজার ৮২৪টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও পানিশোধনের বড়ি মজুদ আছে।

সার্ক আবহাওয়া কেন্দ্রের সাবেক বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান গতকাল আমাদের সময়কে জানান, উত্তরের পর দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা আগামী ২ দিন বলবৎ থাকতে পারে। তবে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করেন তিনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস ছিল, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় শ্রাবণ মাসের শুরু থেকেই হবে ভারী বর্ষণ। কক্সবাজার, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলেও থাকবে টানা বৃষ্টি। এই বৃষ্টির প্রভাব থাকবে বেশ জোরালোভাবেই। ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলে ফের ভূমিধসের পাশাপাশি বন্যায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা ছিল।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকুল পয়েন্টেও পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির ক্রমে উন্নতি হচ্ছে এবং এটা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতিও উন্নতির দিকে যেতে শুরু করবে বলে জানিয়েছে সতর্কীকরণ কেন্দ্র। কেন্দ্র বলছে, প্রধান ২০টি নদীর পানি ২৯টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানিবৃদ্ধি স্থিতিশীল হয়ে কমতে থাকবে। সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য মতে, পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তে টঙ্গীবাড়ী, লৌহজং ও শ্রীনগর উপজেলার নদীতীরবর্তী বেশকিছু গ্রামে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করলেও তা এখনো বিপদসীমার নিচে রয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, টঙ্গী খাল, ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গার পানি সর্বোচ্চ ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়েছে। এসব নদীর পানি বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হলেও আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

যমুনার পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। সে পানি কয়েকদিন পর মধ্যাঞ্চল অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছেন সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন। বাহাদুরাবাদে যমুনার পানি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। তবে পানি কমতে শুরু করেছে।

এদিকে এ বছর বর্ষা মৌসুমের দ্বিতীয় দফার বন্যায় ২০টি জেলা এখন কবলিত বলে সরকার জানিয়েছে, এর অধিকাংশ জেলাই উত্তরাঞ্চলে। মোট ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। উত্তরের পানি মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে যাবে বলে মধ্যাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিল বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সেক্ষেত্রে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বুড়িগঙ্গার ঢাকা পয়েন্টে পানি ২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ডেমরায় বালু নদীর পানি ১২ সেন্টিমিটার, শীতলক্ষ্যার পানি নারায়ণগঞ্জে ১১ সেন্টিমিটার, মিরপুরে তুরাগ নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার, টঙ্গী পয়েন্টে টঙ্গী খালের পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এ ছাড়া কালীগঙ্গা নদীর পানি তরাঘাট পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার, ধলেশ্বরী জাগির পয়েন্টে ১৯ এবং রিকাবী বাজার পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার এবং বংশী নদীর পানি নয়ারহাট পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। তবে ঢাকায় বুড়িগঙ্গার পানি এখনো বিপদসীমার ১৩৮ সেন্টিমিটার নিচে বইছে। বালু বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার, শীতলক্ষ্যা ৫০ সেন্টিমিটার, তুরাগ ৮৮ সেন্টিমিটার, টঙ্গী খাল ৬৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে।

বগুড়া ও সারিয়াকান্দি প্রতিনিধি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া পরিচালন ও সংরক্ষণ বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন ৪৫ কিলোমিটার ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট হুমকির মুখে পড়েছে। এ কারণে বাঁধের সারিয়াকান্দি অংশের ওপর বসবাসকারী ১৩ হাজার পরিবার চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সরকারি হিসাবে মঙ্গলবার পর্যন্ত সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ১৯৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ২৬ হাজার পরিবারের সোয়া লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৮২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে।

কুড়িগ্রাম : ৯ উপজেলার ৬০ ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি। পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে এ পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। নিখোঁজ দুজন।

ইসলামপুর : বন্যাকবলিত এলাকায় দেড় লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ইসলামপুর স্টেশনের আউট সিগন্যালে রেললাইনে পানি ওঠায় জামালপুর থেকে দেওয়ানগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। যমুনার পানি গতকাল সকালে বিপদসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

নাটোর : বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে জরুরি সভা করেছেন। গতকাল সকালে সিংড়ায় আত্রাই নদীর পানি বেড়ে ফেরিঘাট পয়েন্টে বিপদ সীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে উপজেলার কলম ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে গেছে কমপক্ষে ১০০টি বাড়ি। এ ছাড়া চামারী, ইটালী ও ডাহিয়া ইউনিয়ন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

গাইবান্ধা : বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পানিতে ডুবে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুককানুপুর গ্রামের রিয়ামণি নামে আড়াই বছরের এক শিশু মারা গেছে। এদিকে পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চেরেঙ্গা এলাকায় করতোয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১০০ মিটার অংশ মঙ্গলবার ভেঙে যাওয়ায় ৮টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে।

টাঙ্গাইল : বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নিমজ্জিত হয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। বন্ধ হয়েছে অর্ধশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। টাঙ্গাইল অংশের যমুনা ও ধলেশ^রী নদীসহ কয়েকটি শাখা নদীর পানি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ আমাদের সময়কে জানান, যমুনা নদীর পানি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার যোকারচর পয়েন্টে গতকাল দুপুর পর্যন্ত বিপদসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার এবং গোপালপুরের নলীন পয়েন্টে ১২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বাসাইল উপজেলার একটি স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে।

ফরিদপুর : বন্যার পানিতে সদর উপজেলায় নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বেশ কয়েকটি গ্রাম। তলিয়ে গেছে কয়েকশ হেক্টর জমির ধান ও সবজিক্ষেত। মঙ্গলবার রাতে ফরিদপুর শহররক্ষা বাঁধের মোহাম্মদপুর বাজারের কাছে বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ায় শহরজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

নওগাঁ : ২৪ ঘণ্টায় আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর পানি বেড়ে নতুন করে মহাদেবপুর ও বদলগাছী উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে নওগাঁর ৮টি উপজেলা বন্যাকবলিত হলো। ছোট যুমনা নদীর পানি বেড়ে মঙ্গলবার বিকাল থেকে নতুন করে নওগাঁ শহরে পানি প্রবেশ করায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার রানীনগর উপজেলার ঘোষগ্রাম ও কৃষ্ণপুরে সড়ক-বাঁধের ৪টি স্থানে ভেঙে যাওয়ায় নওগাঁর সঙ্গে আত্রাই উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

লালমনিরহাট : পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও খাদ্য সংকটে পড়েছে বন্যার্ত মানুষ। এ পর্যন্ত ৪ লাখ পানিবন্দি মানুষের জন্য বারাদ্দ হয়েছে মাত্র ২৪২ টন চাল ও ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

সিরাজগঞ্জ : ৪৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০ হাজার পরিবারের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবৃদ্ধির ফলে ঝুঁকির মধে পড়েছে সিরাজগঞ্জের ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৭৬ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থান। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র হয়ে পানি প্রবেশ করছে বাঁধের ভেতরের অংশে।

জয়পুরহাট : তুলশীগঙ্গা নদীর পানিবৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় শতাধিক গ্রামের প্রায় ২০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি তলিয়ে গেছে। জয়পুরহাট-বগুড়া মহাসড়কের প্রায় ১ কিলোমিটার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিকল্প রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে ঢাকা ও বগুড়াগামী অধিকাংশ যানবাহন। বন্যায় ২ হাজার পুকুরের অন্তত ২ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে