বাইরে কঠোর, ভেতরে রিভিউ-প্রস্তুতি

  আলী আসিফ শাওন

১৮ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৭, ১২:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায় নিয়ে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। ৭৯৯ পৃষ্ঠার ওই রায়ে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে রাষ্ট্রের দুটি প্রধান স্তম্ভ নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে। প্রকাশ্যে বিচার বিভাগ ও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার পাশাপাশি ভেতরে ভেতরে রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ। ইতোমধ্যে সাবেক দুই আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ ও ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে রিভিউয়ের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র এমনটিই নিশ্চিত করেছে।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে থাকবে কি থাকবে না; এ নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হলেও এখন এটি বড় আকার ধারণ করেছে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কৌশলী পদক্ষেপে এগোতে চায় সরকার। কৌশলের অংশ হিসেবে রায়ের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে সরকার। রায়ের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক হার্ডলাইনের প্রতিফলন বলেই ভাবা হচ্ছে। অন্যদিকে রায়ের বিরুদ্ধে ভেতরে ভেতরে রিভিউয়ের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। এটিও সরকারের আরেকটি কৌশল।

সূত্র জানিয়েছে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা ধরেই নিয়েছিলেনÑ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে উচ্চ আদালতে করা মামলায় আপিল বিভাগের রায় সরকারি দলের বিপক্ষে যাবে না। এ ক্ষেত্রে রায় বিপক্ষে গেলেও এর পর্যবেক্ষণে যেসব রাজনৈতিক বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তা সরকারি দলের নেতারা কখনো ভাবতেই পারেননি। সরকারের জন্য এ ধরনের আপত্তিকর, রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি উচ্চ আদালত সৃষ্টি করতে পারে তা কেউ কখনো ধারণাও করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা জানি এ রায়ের ড্রাফট কোথা থেকে এসেছে। একটি ইংলিশ পত্রিকার সম্পাদক ড্রাফট করে দিয়েছেন।’

আওয়ামী লীগের সূত্র থেকে জানা যায়, এ রায়ের কিছু অংশ পেনড্রাইভে করে পৌঁছানো হয়েছে প্রধান বিচারপতির কাছে। রায়ের নেপথ্যে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর হাত রয়েছে বলেও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের আইনজীবী নেতারা।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের ওই সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জন্য খুবই অস্বস্তিজনক ও বিব্রতকর। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি দলের শীর্ষ নেতারা ধীরগতিতে এবং অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে রায়ের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছেন। রাষ্ট্রপক্ষের সামনে এখন একটিই রাস্তা, তা হলোÑ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ। রিভিউয়ে ইতিবাচক ফল পেতে সে জন্য দফায় দফায় বৈঠক করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। ১ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর থেকেই সরকারের মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রথমে আওয়ামী লীগের তিন আইনজীবী নেতা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একান্ত বৈঠক করেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে। পরে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আলোচনা করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে। ওই দিনই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আবার কথা বলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দফায় দফায় এ বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের এক মন্ত্রী নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে আমাদের সময়কে বলেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রধান বিচারপতির প্রতি আমরা আর আস্থা রাখতে পারছি না। কারণ আমরা কখনো ভাবতেই পারিনি, এমন একটি রায় তিনি লিখতে পারেন! সে কারণে বিষয়টি নিয়ে শুরুতে দলের প্রথম সারির নেতারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনা শুরু করলেও এখন সর্বোচ্চপর্যায়ে থেকে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশমতো রিভিউয়ের জন্য ‘হোমওয়ার্ক’ শুরু করেছেন সাবেক দুই আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জরিহুল হক, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন আইন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির দ্বন্দ্ব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই তিনজনকেই রিভিউয়ের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনা করে সময় নষ্ট না করে ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে বলা হয়েছে ওই তিনজনকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করতে পারে। আবার রিভিউ আবেদনেই রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লিখিত ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বিষয়গুলো ‘এক্সপাঞ্জ’ করার আবেদনও করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া রিভিউয়ের দায়িত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক এ আইনমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি আমি এখনো জানি না। তবে আপাতত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়, যা প্রকাশিত হয়েছে সেটি পড়ছি।

একই বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেন, আমি এখন ব্যস্ত। এ বিষয়ে পরে কথা বলব।

অন্যদিকে কৌশলের অংশ হিসেবে রায়ের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে সরকার। রায়ের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক ‘হার্ডলাইনের প্রতিফলন’ বলেই ভাবা হচ্ছে। এ বৈঠকের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে সরকার এবং দলীয় অবস্থান রাষ্ট্রপতিকে জানানো সরকারপ্রধান ও দলীয়প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার দায়িত্ব। তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়ে জানিয়েছেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন সরকারি দলের নেতারা। মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতারা প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে রায়ের সমালোচনা করছেন। গতকালও রায় নিয়ে কথা বলার সময় প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে রায়ের পর্যবেক্ষণে এস কে সিনহা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন অভিযোগ করে আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, তিনি প্রধান বিচারপতির পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এর আগে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আগামী সেপ্টেম্বরের আগেই প্রধান বিচারপতির স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার হুশিয়ারি দেন।

এ ছাড়া রায়ের প্রতিবাদে সারা দেশের সব আইনজীবী সমিতিতে টানা তিন দিন প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ। এ ফোরামের পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সন্ধ্যায় কোনো কিছু জানাতে পারেননি খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম। আইন সম্পাদক বলেন, এখনো পর্যন্ত নতুন কর্মসূচি ঠিক করা হয়নি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে শিগগিরই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে