মুখ থুবড়ে পড়ছে দরিদ্রবান্ধব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

  মো. মাহফুজুর রহমান

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একে একে মুখ থুবড়ে পড়ছে সরকারের জনবান্ধব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। ‘সংগ্রহের মৌসুম’ কারণ দেখিয়ে এর আগে স্থগিত করা হয়েছে দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি ওএমএস (খোলাবাজারে বিক্রি)। চালের অভাবে গত দুই ঈদে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির ধরনেও পরিবর্তন করতে হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় বরাবর চাল দেওয়া হলেও গত রোজার ঈদে চালের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে গম। আর কোরবানির ঈদে কিছুই দেওয়া হয়নি।

এদিকে এক মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে ১০ টাকায় চাল বিক্রির কর্মসূচি। অথচ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে এসবের প্রতি যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়েছিল। সরকারের গুদামে চালের মজুদ কমে আসায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করলেও সরকারের নীতিনির্ধারকরা বরাররের মতো তা অস্বীকার করে চলেছেন।

এই যখন অবস্থা, তখন প্রতিবেশী দেশ ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছেÑ আগামীকাল ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে চাল রপ্তানি না করার। এ বিষয়ে ভারতীয় কাস্টমস একটি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশকে। বেনাপোল শুল্ক বিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

অবশ্য খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, চালের অভাব নেই, যথেষ্ট মজুদ আছে। তাই দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। আর বাজার তদারকির দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। তবু আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভাগীয় কমিশনারদের টেলিফোন করে তদারকি বৃদ্ধি ও সক্রিয় হতে বলছি। তবে খাদ্যমন্ত্রী যা-ই বলুন না কেন, সরকারি তথ্য-উপাত্ত বলছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেখানে ন্যূনতম ১০ লাখ টন চাল মজুদ থাকার কথা, সেখানে সরকারের হাতে আছে মাত্র সোয়া ৩ লাখ টন। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বোরো চাল সংগ্রহে মাঠে নেমেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে। চাল রপ্তানিকারক কয়েকটি দেশ ও চাতাল মালিকদের সঙ্গে দফায়-দফায় চুক্তি করেও মজুদ বাড়ানো যায়নি এ পর্যন্ত।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট পর্যন্ত দুই মাসে ৩ লাখ ৬৩ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় ঈদের আগে সরকার দুই দফায় চাল আমদানির শুল্ক কমিয়ে ২৮ থেকে ২ শতাংশ এবং বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির জন্য বাকিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ দিলেও কাক্সিক্ষত ফল আসেনি। ফলে ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি খোলাবাজারেও।

এদিকে খোলাবাজারে চালের দাম যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, তখন কোনো কারণ না দেখিয়েই বন্ধ রাখা হয়েছে সরকারের দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি খোলাবাজারে বিক্রি বা ওএমএস। এ খাতে বরাদ্দ থাকা চাল সরবরাহ করা হচ্ছে সরকারের সদ্যপ্রসূত ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’তে। ১০ টাকা কেজিতে তালিকাভুক্তদের মধ্যেই বিক্রি করা হচ্ছে ওএমএসের চাল। অথচ ওএমএসসংক্রান্ত নীতিমালা ২০১৫-এ স্পষ্ট বলা হয়েছেÑ ‘খাদ্যশস্যের বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রবণতা রোধ করে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে মূল্য সহায়তা দেওয়া ও বাজারদর স্থিতিশীল রাখাই ওএমএস কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।’ বর্তমানে খুচরাবাজারে ৩৮ টাকার নিচে এক কেজি মোটা চালও মিলছে না। প্রধান খাদ্যশস্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস উঠেছে, তখন কী কারণে সরকারের এই দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে তা নিয়ে মুখ খুলছেন না খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কেউ।

এদিকে ওএমএসে চাল বিক্রি বন্ধ থাকায় নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্ন আয়ের মানুষের। প্রতিদিন এক লাখ ৮৬ হাজার ২০০ স্বল্প আয়ের মানুষ সরকারের দরিদ্রবান্ধব এ কর্মসূচির সুফল ভোগ করে থাকেন। এর জন্য তালিকাভুক্তির দরকার হয় না। যে কেউ নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে সুবিধা নিতে পারেন। আর ১০ টাকা কেজি দরে চাল কেনার সুযোগ পাচ্ছেন নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষ। গত মে মাসে গরিবের জন্য ওএমএসে চাল বিক্রি আকস্মিকভাবে স্থগিত করে খাদ্য বিভাগ। সব জেলায় দ্রুত এ নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া হয়। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এবার বোরো সংগ্রহ মৌসুম শুরুর অজুহাত দেখানো হয়। যদিও গত বছর একই মৌসুমে ওএমএসে চাল বিক্রি অব্যাহত রাখা হয়েছিল।

জানা গেছে, চালের দাম অস্থিতিশীল কিংবা মোটা চালের দাম ৩০ টাকার ওপরে উঠলেই দেশে ওএমএস কর্মসূচি চালু করা হয়। কিন্তু সরকারি চালের মজুদ ৫ মাস ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকার কারণে খাদ্য মন্ত্রণালয় এখনো ওএমএস চালু করতে পারেনি। নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো চালাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছে। চলতি সেপ্টেম্বরে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কর্মসূচি চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা এক মাস পিছিয়ে দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে