বিচারপ্রার্থী নারীকে রাতভর ধর্ষণ করলেন চেয়ারম্যান

প্রকাশ | ০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০১:০৭

নোয়াখালী প্রতিনিধি

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেনের বিরুদ্ধে এবার বিচারপ্রার্থী এক নারীকে রাতভর ইউপি অফিসে আটক রেখে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্ষণের ঘটনা ফাঁস করার কথা বলায় ওই নারীকে বেদম মারধর করেছেন তিনি। গত বুধবার রাত ১১টার পর থেকে এ অপকর্ম শুরু করেন চেয়ারম্যান। এ ঘটনায় মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে চরজব্বার থানায় মামলা হয়েছে। এর পর থেকে তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন। ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নির্যাতিতা নারীকে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগেও চেয়ারম্যান মোজাম্মেল এক স্কুলছাত্রীকে ইউপি অফিসে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া একই অফিসে মারধর করেন সাবেক এক নারী ইউপি সদস্যকে।

সর্বশেষ নির্যাতিতা নারী (২৭) একই ইউনিয়নের মধ্যম চরবাটা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতারণার বিচার করার কথা বলে তাকে ডেকে নেওয়া হয় ইউপি অফিসে। সেখানে বিচারের পরিবর্তে উল্টো চেয়ারম্যান তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করেন। রাতের ঘটনা ফাঁস করে দেওয়ার কথা বলায় রাতভর ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে আটক রেখে লাঠি দিয়ে তাকে বেদম মারধরও করেন তিনি। এতে তার শরীর রক্তাক্ত জখম হয়েছে। অমানবিক নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দুপুরের দিকে চরজব্বার থানায় অভিযোগ করতে গেলে প্রথমে পুলিশ মামলা নিতে রাজি হয়নি। পরে গণমাধ্যমকর্মী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চাপে পুলিশ মামলা রেকর্ড করে।

নির্যাতিতা আরও জানান, তিনি বিবাহিতা। তার এক ছেলে রয়েছে। কিন্তু স্বামী ভরণপোষণ দেওয়া তো দূরের কথা দীর্ঘদিন ধরে কোনো যোগাযোগও করছেন না। এরই মধ্যে হাতিয়া উপজেলার নঙ্গলিয়া গ্রামের ভূমিহীন বাজারসংলগ্ন রবিউল হোসেন নামে একজনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। শুরুতে রবিউল নিজেকে অবিবাহিত বললেও সম্প্রতি বিবাহিত বলে জানতে পারেন তিনি। পরে তার সঙ্গে বিয়ে তো দূরের কথা কোনো সম্পর্কই রাখতে রাজি হননি তিনি। বেশ কিছু দিন যোগাযোগ না করায় রবিউল বুধবার রাতে তাদের বাড়িতে আসেন। বিষয়টি তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে অবহিত করেন। রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে চেয়ারম্যান গ্রামপুলিশ পাঠিয়ে তিন ভাইবোনসহ তাকে (নারী) ও রবিউলকে ইউপি অফিসে ডেকে পাঠান। অভিযোগ শোনার পর চেয়ারম্যান উল্টো তাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন এবং রবিউলকেও মারধর করেন। পরে অন্য সবাইকে বের করে দিয়ে তাকে একটি কক্ষে আটক রেখে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা ফাঁস করার হুমকি দিলে চেয়ারম্যান লাঠি দিয়ে তাকে বেদম পেটান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে একাধিকবার ওই চেয়ারম্যানের মুঠোফোনে কল দেওয়া হয়। তবে মুঠোফোনে বন্ধ পাওয়া যায়। এর আগে দুপুরের দিকে চেয়ারম্যান অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের জানান, ওই নারী দুশ্চরিত্র। এর বেশি কিছু না বলে তিনি সংবাদকর্মীদের ফোন কেটে দেন।

চরজব্বার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইকবাল হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরের পরে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে থানায় ধর্ষণের অভিযোগে এক নারী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদনের পরই ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ওই নারীর শরীরে বিভিন্ন অংশে আঘাতের বেশকিছু চিহ্ন রয়েছে বলে নিশ্চিত করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত এর আগে গত বছরের আগস্টে এক স্কুলছাত্রীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে রাতে ইউপি অফিসে আটকে করে নির্যাতনের অভিযোগে আদালতে মামলা চলছে ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। স্কুলছাত্রীকে নির্যাতনের প্রতিবাদে জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হলে বেশ কিছু দিন গা ঢাকা দেন চেয়ারম্যান। সম্প্রতি একই অফিসে পরিষদের সাবেক এক নারী সদস্যকেও বেদম মারধর করেন তিনি। ওই ঘটনায়ও থানায় মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করা হয়। কয়েকদিন আগে এক মাছ ব্যবসায়ীকে রাতভর পরিষদে আটক রাখেন চেয়ারম্যান। একপর্যায়ে জেলা পুলিশসহ বিভিন্ন মহলের চাপে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।