রাখাইনে নিহত ও নিখোঁজের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই

প্রকাশ | ০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:২১

হাবিব রহমান, শরণার্থী ক্যাম্প (কক্সবাজার) থেকে ফিরে

আব্দুর রশিদ। পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু গত ১৫ দিনে একটি রাতও ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি তিনি। কারণ আব্দুর রশিদ তার দুই মেয়েকে রাখাইনে রেখেই চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। পালিয়ে আসার সময় তারা দুজন বাড়ির বাইরে ছিল। খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে মেয়েদের ছাড়াই প্রাণ বাঁচাতে টেকনাফে চলে আসেন।

রাখাইনের বুচিডং এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ আমাদের সময়কে বলেন, তারা বেঁচে আছে নাকি মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর মগদের হাতে জীবন গেছে, তা জানি না। নিজেরা বাঁচলেও দুই সন্তানের ভাগ্য চিন্তা করলে অস্থির

হয়ে পড়ি।

আব্দুর রশিদের ধারণা, রাখাইনে সেনাবাহিনী ও মগদের হাতে এতদিনে প্রাণ হারিয়েছে তার প্রিয় দুই সন্তান। শুধু আব্দুর রশিদ নয়, রাখাইন থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসার সময় রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকেই স্বজনকে রেখে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানেন

না তারা।

গত ২০ দিনে টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, অনেক রোহিঙ্গা পরিবারের সব সদস্য আসতে পারেননি। অনেকে শোনাচ্ছেন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে স্বজনের নিহত হওয়ার করুণ কাহিনি। অনেক পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই নিহত হয়েছেন। তবে কতজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন অথবা নিখোঁজ রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। অন্তত তিনটি মানমাধিকার সংস্থা নিহত ও নিখোঁজ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিরূপণে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষক ও স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা অনেক বড় হবে। এটা বের করা জরুরি।

২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী রাখাইনে তল্লাশি চৌকি ও সেনাঘাঁটিতে হামলার অভিযোগ এনে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করে। শুরু হয় সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট। সেনাবাহিনীর দোসর মগরাও যুক্ত হয় এতে। এর পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে থাকে।

সহিংসতা শুরুর এক সপ্তাহ পর বার্তা সংস্থা রয়াটার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সহিংসতায় এক সপ্তাহে রাখাইনে কমপক্ষে ৪০০ জন নিহত হয়েছে।

২৫ আগস্ট অভিযান শুরুর পর মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, সহিংসতায় ৭০ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২ জন নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য, আর বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে মাত্র ৪০ জন।

১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত জর্জ কোচেরি জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাতে ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছেন এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা জানান, রাখাইনে সহিংসতায় প্রাণ হারানোর সংখ্যা অনেক বেশি।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, মিয়ানমারের অনেক জায়গায় নির্বিচারে হত্যাকা- চলছে। হতাহতের সংখ্যা এখনই বলা সম্ভব নয়।

২৫ দিন আগে মিয়ানমারের মংডু থেকে পালিয়ে আসা হালিমা খাতুন টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। পরিবারের ১১ সদস্যের মধ্যে শুধু তিনিই বেঁচে আছেন। হালিমা খাতুন জানান, ৪ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের গ্রামে সেনাবাহিনী হামলা করে। সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে গ্রামের মগরাই। নির্বিচারে হত্যাকা-, ধর্ষণ ও লুটপাট চালায় তারা। রাত পৌনে ১১টার দিকে তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে সেনাবাহিনী। ৭ সন্তান ও স্বামী এবং ২ দেবর বাড়িতে ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেনাবাহিনী সবাইকে ঘরের ভেতর গুলি করে মেরে ফেলে। গুলি না লাগার কারণে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। রক্তমাখা শরীরে সারারাত লাশের ভেতরে পড়ে থাকেন। শেষ রাতে পালিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন। বন, জঙ্গল আর পাহাড় পেরিয়ে টেকনাফে পৌঁছেন।

কাঁদতে কাঁদতে হালিমা বলেন, আমি বেঁচে আছি সেটা মনে হয় না। কারণ মরেই গিয়েছিলাম। এভাবে বেঁচে থেকেইবা লাভ কী।

পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানো ২০ রোহিঙ্গার মুখে নির্মম গণহত্যার বর্ণনা ফুটে ওঠে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কক্সবাজার জেলার সিভিল সার্জন জানান, প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৭২ হাজার ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় এসেছে।