পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে

নিয়োগবাণিজ্যের সুবিধা নিতেই কর্মকর্তা পদে কর্মচারীরা

  তৈয়ব সুমন, চট্টগ্রাম

১৩ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ০১:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কৌশলে প্রথম শ্রেণির পদগুলোতে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছেÑ নিয়োগবাণিজ্যের সুবিধা নিতেই প্রচলিত নিয়ম ও গেজেট না মেনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের বিশ্বস্ত কর্মচারীদের এসব পদে দায়িত্ব দিচ্ছেন। অথচ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরির কোনো ক্ষেত্রে পদোন্নতির সুযোগ নেই। বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১৯৭৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে যোগ দেন সৈয়দ আবদুল খলিল। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সৈয়দ আবদুল খলিলকে পিএসসির অনুমোদন ছাড়াই ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি পূর্বাঞ্চল রেলের সেকশন অফিসার ১-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার পদ। তিন বছর ১০ মাস পর ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর তাকে বিভাগীয় সংস্থাপন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা এখন পর্যন্ত পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অনুমোদন পায়নি। এটি প্রথম শ্রেণির পদ, যেখানে সাধারণত বিসিএস কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

একইভাবে ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট চতুর্থ শ্রেণির ‘খালাসি’ পদে যোগদানকারী মোহাম্মদ আলীকে ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর সহকারী পার্সোনাল অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৪ বছর ৩ মাস ১২ দিন দায়িত্ব পালনের পর গত ২২ জানুয়ারি তাকে প্রথম শ্রেণির বিভাগীয় সংস্থাপন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে এসপিও মো. সিরাজ উল্লাহসহ বেশ কয়েকজন অনিয়মের মাধ্যমেই পদোন্নতি নিয়েছেন।

রেলওয়ের পিয়ন হিসেবে চাকরি নেওয়া আমজাদ হোসেন প্রথম শ্রেণির সহকারী মহাব্যবস্থাপক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ১ হাজার ৩৮ গেটকিপার, ১৮০ ট্রেড শিক্ষানবিশ, ১৮ মেটারিয়াল চেকার ও ১৭ সাঁটলিপিকার নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব। অর্থাৎ তার হাত ধরেই প্রায় ১ হাজার ২৫৩ জনের চাকরি হবে।

অন্যদিকে সৈয়দ আবদুল খলিল ২১ নিরাপত্তাপ্রহরী নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব। সিনিয়র পার্সোনাল কর্মকর্তা সিরাজ উল্লাহ ৬৬ অফিস সহকারী-কাম-মুদ্রাক্ষরিক নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব। একই সঙ্গে ২১২ পদে সুইপার নিয়োগ কমিটিরও সদস্যসচিব। তা ছাড়া প্রধান সহকারী ও উচ্চমান সহকারী পদোন্নতি পরীক্ষার বিষয়টিও তিনিই দেখভালের দায়িত্ব পেয়েছেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হাই আমাদের সময়কে বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষা কমিটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখন গেজেট না মেনে যদি কেউ পদোন্নতি পেয়ে থাকেন, তা হলে সেটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। এ রকম অনিয়ম যদি কেউ করে থাকে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশ গেজেট/১৯৮৫-এর তফসিল ৮ অনুযায়ী, ষষ্ঠ গ্রেডের বিভাগীয় পদগুলোয় পদায়নের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ বিসিএস ক্যাডার (রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং) ও বিসিএস রেলওয়ে (ট্রান্সপোর্টেশন ও কমার্শিয়াল) এবং ৫০ শতাংশ অ্যাসিস্ট্যান্ট পার্সোনাল অফিসার, জুনিয়র পার্সোনাল অফিসার ও সেকশন অফিসার থেকে নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা না করে পূর্ণ পদে সাত বছরের কম সময় চাকরি করা এবং বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অনুমোদন না নিয়েই চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তাদের শূন্য হওয়া পদগুলোতে বসানো হচ্ছে।

অন্যদিকে ২০১৪ সালের সরকারি অন্য একটি গেজেটে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মীদেরই উচ্চতর শ্রেণিতে নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ গেজেট ২০১৪-এর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখার প্রজ্ঞাপনের ধারা ৫-এর ১ উপধারায় বলা আছেÑ পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক গঠিত সংশ্লিষ্ট বাছাই বা নির্বাচন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো পদে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ করা যাবে। তবে শর্ত হচ্ছেÑ তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি অথবা দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণি অথবা তৃতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণির পদে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতি দিতে হবে। অর্থাৎ বিভাগীয় পর্যায়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনোভাবেই চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা দ্বিতীয় কিংবা প্রথম শ্রেণিতে পদায়িত হতে পারবেন না।

রেলের প্রায় ২১ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (বিসিএস ক্যাডার) দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত থাকলেও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের উচ্চপদে পদায়ন করা হচ্ছে বিভিন্ন দপ্তরে। পদায়নের ক্ষেত্রে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নিয়ম থাকলেও নিয়ম লঙ্ঘন করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ষষ্ঠ গ্রেডের বিভাগীয় পদে পদায়নের বিষয়টি অন্ধকারে রেখেছে রেলের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। নিয়োগবাণিজ্য করার ক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডাররা তাদের মতো করে অনিয়মের কাজ করবেন না। তাই নিজের লোককে বসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে রেলের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে কর্মী নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সুইপার, সিপাহি, খালাসি, ওয়েম্যান নিয়োগে কোটি কোটি টাকার নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে রেলের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তা চলমান রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অবসরে যাওয়া পূর্বাঞ্চলের সিনিয়র পরিসংখ্যান কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্যক্তিগত সহকারী মো. আবুল কাশেম, জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা (প্রকৌশলী) আবদুল গফুর মজুমদার, জ্যেষ্ঠ কল্যাণ পরিদর্শক শফিকুর রহমানসহ আরও কয়েকজন নিয়ম লঙ্ঘন করে পদোন্নতি নিয়েছেন।

অথচ বর্তমানে রেলের প্রথম শ্রেণির একাধিক গেজেটেড কর্মকর্তা পিএসসির অনুমোদন নিলেও দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন শ্রেণির পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম তিন কর্মকর্তা কালিকান্ত ঘোষ ১১ বছর ধরে, স্নেহাশীষ দাশগুপ্ত ৯ বছর ৮ মাস ও ওমর ফারুক ৯ বছর ৪ মাস ধরে একই পদে রয়েছেন।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ে আইন অনুযায়ী একটি পদে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করলে অতিরিক্ত বা চলতি দায়িত্ব হিসেবে একটি ঊর্ধ্বতন পদ দেওয়া যায়। কিন্তু অস্থায়ী বা চলতি দায়িত্ব পালনকারী নিম্নস্তরের বিভিন্ন কর্মীকে সিনিয়র স্কেল পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে। ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে এমন অন্যায্যভাবে দায়িত্বরতদের কারণে পিএসসির অনুমোদন পেয়ে গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও পদোন্নতি পাচ্ছেন না রেলের গুরুত্বপূর্ণ তিন কর্মকর্তা। এ ছাড়া সিনিয়র স্কেল পর্যায়ে তিনটি পদ অবসরজনিত কারণে শূন্য হলেও এসব পদে অনুমোদনহীন কর্মীদের নিয়োগের চেষ্টা করছে রেলভবন। এতে রেলের নিয়োগবিধি শতভাগ লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, রেলের নীতিনির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ পদে এর আগে এ ধরনের অনিয়ম হয়নি। তবে কয়েক বছর ধরে নিম্ন শ্রেণির কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে রেলের কর্মপরিবেশে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটানো হচ্ছে। মূলত বর্তমান মহাপরিচালক রেলের দুই অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ কর্মীদের একাধিক চলতি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে রেলের নিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, দরপত্র ও বাণিজ্যিক কর্মকা-কে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ২৭০ সহকারী স্টেশনমাস্টার (এএসএম) নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায় ১২ কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। সহকারী স্টেশনমাস্টার পদের বিপরীতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর ২০১৬ সালের ৩ জুলাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ২৫৭ জনের তালিকা ঈদের বন্ধের মধ্যে অনেকটা চুপিসারেই প্রকাশ করে নিয়োগ কমিটি। এমন ঘটনা ঘটাতে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের আস্থাভাজনদের নিয়মের বালাই না করে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে