অস্ট্রেলিয়ার গহিন মরুতে ১৮ শতাব্দীর বাংলা পুঁথি

  আমাদের সময় ডেস্ক

২১ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৭, ০২:১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলের প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার গভীর মরুভূমিতে বেশ কয়েক বছর আগে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল একটি প্রাচীন গ্রন্থ, যাকে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন মনে করে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। কিন্তু একজন অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশি গবেষক সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন এটি আসলে বাংলা ভাষায় লেখা শত বছরেরও আগের একটি পুঁথি। খবর বিবিসি বাংলা।

গবেষক ড. সামিয়া খাতুন এ গবেষণার সূত্র ধরে বিশ শতকের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ায় তৎকালীন বাংলা এবং ভারতবর্ষ থেকে মানুষের অভিবাসনের চমকপ্রদ এক ইতিহাসের সন্ধান পেয়েছেন, যা নিয়ে তার একটি বই শিগগিরই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে লন্ডন থেকে।

ড. সামিয়া খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ইতিহাসের বইয়ে যখন তিনি ওই কোরআনের কথা পড়েন, তখন তিনি তা দেখতে পাড়ি জমিয়েছিলেন সেখানে।

তার ভাষায়Ñ পাঁচশ কিলোমিটার পথ গিয়ে বইটি খুঁজে বের করার পর খুলে দেখি সেটি কোরআন নয়, বাংলা কবিতা।

ড. খাতুন তার গবেষণায় দেখেছেন, বহু বাঙালি সে সময় ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। উটের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বহু বাঙালি। অনেক বাঙালি সে সময় আয়ার কাজ করতে সেখানে গিয়েছিলেন বলে গবেষণায় তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথমে লেখাটি ছাপা হয়েছিল ১৮৬১ সালে। পরে এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে কয়েকবার পুনর্মুদ্রিত হয়ে যে কপিটি তিনি পান, সেটি ১৮৯৫ সালে ছাপা।

ড. খাতুন এসব মানুষের কাজ ও বসতির সূত্র ধরে অস্ট্রেলিয়ার ব্রোকেনহিল শহরে তাদের প্রথম অভিবাসী হয়ে আসার আগ্রহব্যঞ্জক তথ্য পেয়েছেন।

তাদের অনেকে উট নিয়ে কাজ করতে করতে সেখানে চলে গিয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি লোক অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিলেন জাহাজে কাজ নিয়ে। এর পর যে কোনো একটা কাজ জুটিয়ে নিয়ে মরুভূমি এলাকায় বা অস্ট্রেলিয়ার গহিন অঞ্চলে পৌঁছে যান।

ড. খাতুন বলছেন, সেখানে যে মসজিদগুলো ছিল, এই লোকরা ওই মসজিদগুলোয় ঈদের সময় জড়ো হতেন। এভাবেই ব্রোকেনহিলসহ আশপাশের দুর্গম এলাকাগুলোয় তখন বাঙালিদের একটা বসতি গড়ে ওঠে।

আঠারো ও উনিশ শতকে বিশ্বজুড়ে একটা ব্যাপক অভিবাসনের ইতিহাস রয়েছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের লোক সে সময় নানা জায়গায় গিয়ে বসতি গড়ে তুলেছেন।

ড. খাতুন বলছেন, ওই একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি বলছেন, এই বাঙালি অভিবাসীরা তখন অস্ট্রেলিয়ার গহিন এলাকায় পুঁথি পাঠ করতেন।

এ বইয়ে যে বাংলা কবিতাগুলো রয়েছে, সেগুলো সুর করে অন্যদের পড়ে শোনানো হতোÑ যেমনটা প্রাচীনকালে পুঁথিপাঠের ধারা ছিল। এ থেকে বোঝা যায়, ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে বাঙালিদের মধ্যে পুঁথিপাঠের একটা সংস্কৃতি চালু ছিল।

গবেষণায় ড. খাতুন দেখেছেন, সেখানে ওই সময় একটা বড়সড় বাঙালি জনগোষ্ঠী ছিল বলেই এই পুঁথিপাঠের চর্চা গড়ে উঠেছিল। এ ছাড়া অন্য দেশ থেকে সেখানে যাওয়া অনেক মানুষ সেই পুঁথিপাঠ শুনতে যেতেন, যারা বাঙালি ছিলেন না। তাদের জন্য অনুবাদ করে এসব কবিতা শোনানো হতো। সে সময় যেসব বাঙালি ওই দুর্গম অঞ্চলে বসতি করেছিলেন, তাদের বংশধররা এখনো আছেন।

তিনি বলছেন, সে সময় স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে এ রকম অনেক বাঙালির বিয়ে হয়েছিল। তারা অবশ্যই তখন ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে যাওয়া বাঙালি ছিলেন।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এ মিশ্র বিয়ের কারণে ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলের অ্যাবোরোজিন সম্প্রদায়ের ভাষায় ঢুকে গেছে বহু বাংলা শব্দ।

ড. সামিয়া খাতুন বলছেন, সে সময় যে মসজিদগুলো সেখানে ছিল, সেগুলোর কিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও কয়েকটা এখনো টিকে আছে। ওই মরু এলাকা খুবই শুষ্ক হওয়ায় যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোর ভেতরে সবকিছু এখনো খুব ভালোভাবেই টিকে আছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে